বাংলা ট্রিবিউনকে ড. জাহিদ হোসেন বিশ্ব অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে

Send
শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত : ১৪:৩০, জুন ২৮, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪২, জুন ২৮, ২০১৬

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা বাড়তে শুরু করেছে। ৩২ ডলারে নেমে আসা প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ৫০ ডলার অতিক্রম করেছে। তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় হয়তো মধ্যপ্রাচ্য থেকে রেমিটেন্স প্রবাহ আগামীতে অনেকটা বাড়বে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে আসার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ব অর্থনীতিও ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। উভয় কারণেই বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। সম্প্রতি বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন ড. জাহিদ হোসেন।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনবিশ্বব্যাংকের এই কর্মকর্তার সঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনের কথা হয় সরকারের ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেট, জিডিপি প্রবৃদ্ধি, সরকারের কর কাঠামো, রাজস্ব আদায়ের টার্গেট, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ সম্ভাবনা, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সরকারের বিদ্যমান সম্পর্ক,  প্যাকেজ ভ্যাট প্রসঙ্গ ও কর ফাঁকি রোধসহ বিবিধ বিষয়ে।
জানতে চাইলে ড. জাহিদ বলেন, আগের যে কোনও সময়ের তুলনায় বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে। উদাহরণ দিয়ে ড. জাহিদ বলেন, গত এক অর্থবছরে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ ছাড়া সম্প্রতি প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ ঋণ সহায়তা ছাড় করেছে বিশ্বব্যাংক। বাংলাদেশের জন্য বিশ্বব্যাংকের এই সহায়তা একটি মাইলফলক। এটি বিশ্বব্যাংকের ইতিহাসে রেকর্ড পরিমাণ সহায়তা বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ সরকারের ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব নয় বললেও ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এ ক্ষেত্রে কর জিডিপি বাড়াতেই হবে। ফলে যারা কর দেবে তাদের ওপর করের বোঝা বাড়বে। এ ক্ষেত্রে করের অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যদি ব্যয় হয় তাহলে ব্যালেন্স হবে বলে জানান তিনি।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা জানিয়ে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বর্তমানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলেও অনিশ্চয়তা কাটেনি। তবে এটি বিনিয়োগে বাধা নয়, যদি বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টিতে অন্যান্য বিষয়গুলো ঠিক থাকে।
জানতে চাইলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের রেমিটেন্সে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে রেমিটেন্স কমলেও এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য থেকে বড় অঙ্কের রেমিটেন্স আসছে। পাউন্ড যেভাবে দর হারাচ্ছে তাতে রেমিটেন্সে বড় ধাক্কা লাগবে। ইইউতে শুল্কমুক্ত সুবিধা এখন আর যুক্তরাজ্য দিতে বাধ্য নয়। রফতানি বাণিজ্য স্বাভাবিক রাখতে হলে বাংলাদেশকে সতর্কতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় শুল্কমুক্ত বাণিজ্যিক সুবিধা নিয়ে বাংলাদেশকে নতুন করে সমঝোতা করতে হবে। নতুন করে আইনকানুন করারও প্রয়োজন পড়তে পারে।

২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট সম্পর্কে ড. জাহিদ বলেছেন, এ বাজেটে বেতন-ভাতা, ভর্তুকি ও সুদের বোঝা বাড়ছে। বাড়ছে অপরিবর্তনজনিত ব্যয়। এ ব্যয় কমানোর সুযোগ নেই। সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বৃদ্ধি এ ব্যয় বৃদ্ধিও কারণ। এজন্য সুদের হার সংস্কারের সময় এসেছে। এ জন্য সুদহার নীতিমালা সংস্কার করতে হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে ড. জাহিদ বলেন, বাজেট ঘাটতি পূরণে ২২ বিলিয়ন ডলারের বেশি পাইপলাইনের অর্থ ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সুযোগ কাজে লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্র সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে ড. জাহিদ বলেন,কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে কাজের ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে হবে। ফলে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সেটি হতে হবে শ্রমঘন শিল্পে। বাজেটে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কিছু বলা হয়নি বলেও জানান বিশ্বব্যাংকের এই কর্মকর্তা।

সরকারের পক্ষ থেকে আগামী ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ২ শতাংশ ধরা হলেও ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বিশ্বব্যাংক মনে করে আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের চেয়ে প্রবৃদ্ধি দশমিক ৫ শতাংশ বাড়বে। এর কারণ হলো রফতানি কিছুটা বাড়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। 

ড. জাহিদ জানান, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু সরকার বলছে, প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ০৫ শতাংশ। সরকারের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের পার্থক্য শূন্য দশমিক ৭ শতাংশের বেশি।

কর কাঠামো প্রসঙ্গে ড. জাহিদ বলেন, বাজেটে প্রত্যাশা ছিল কর কাঠামোয় পরিবর্তনসহ বিভিন্ন নীতি সহায়তার মাধ্যমে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে প্রভাবিত করা। বিনিয়োগ বাড়াতে সংস্কারের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব জরুরি ছিল। কিন্তু সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে যে নীতি নেওয়া হয়েছে, তাতে ওই প্রস্তাবগুলো নেই। এছাড়া করের তিনটি খাতেই ব্যবসায়ীদের ওপর বোঝা চাপানো হয়েছে। উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে কর্পোরেট কর হার কমানোর প্রস্তাব এসেছিল। কিন্তু বাজেটে তার প্রতিফলন নেই। উল্টো অনেক খাতেই ন্যূনতম কর বাড়ানো হয়েছে।

জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের এই প্রধান অর্থনীতিবিদ বলেন, ভ্যাট নিয়ে ব্যবসায়ীদের আন্দোলনের মুখে প্যাকেজ ভ্যাট পদ্ধতি বহাল রাখলেও পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।  যা ব্যবসায়ীদের চাপে ফেলবে বলে মনে হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্যাকেজ ভ্যাট দ্বিগুণ করা হয়েছে। শুল্ক খাতের বেশ কিছু জায়গা অস্পষ্ট রাখা হয়েছে। বিশেষ করে সম্পূরক শুল্কের অনেক কিছুই পরিষ্কার নয়।এগুলো পরিস্কার হওয়া প্রয়োজন।

সরকারের বিভিন্ন সংস্কার প্রসঙ্গে ড. জাহিদ জানিয়েছেন, সংস্কারের মাধ্যমে কর ফাঁকি বন্ধ করেও রাজস্ব আয় বাড়ানো যায়। এছাড়া টাকা পাচার বন্ধ করা হলেও রাজস্ব আয় বাড়বে। কিন্তু এসব খাতে সরকারের খুব বেশি উৎসাহ দেখা যাচ্ছে না।

এবারের বাজেটে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে উত্থাপিত তিন চ্যালেঞ্জের বিষয়ে ড. জাহিদ বলেন, শিল্প খাতে বিনিয়োগে স্থবিরতা কাটিয়ে কর্মসংস্থান বাড়ানো, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর কৌশল পরিবর্তন এবং প্রবৃদ্ধিতে সমাজের সব শ্রেণির মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়ানো। গত কয়েক বছরের রেকর্ড খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে অতীতের ন্যায় এ বছরও এ চ্যলেঞ্জগুলোর  লক্ষ্য অর্জিত হবে না।

/এসআই /এপিএইচ

আরও পড়ুন:

এডিপি’র ৯০ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে: পরিকল্পনামন্ত্রী

রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়ালো

৪ জুলাই কিছু ব্যাংক শাখা খোলা থাকবে

ব্রেক্সিট: শুল্কমুক্ত সুবিধা না পেলে প্রভাব পড়বে তৈরি পোশাক খাতে

 

 

লাইভ

টপ