একান্ত সাক্ষাৎকারে বাণিজ্যমন্ত্রী এ বছর রাজনৈতিক হানাহানি হবে না

Send
শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত : ২২:৫৬, জানুয়ারি ২৪, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪৫, জানুয়ারি ২৫, ২০১৭

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদপ্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ‘আওয়ামী লীগের নেতা বা মন্ত্রী নন একজন কর্মী’—এই পরিচয়েই স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে পরিচিত তোফায়েল আহমেদ । ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকারের চলতি মেয়াদে বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। সরকারের তিন বছর পূর্তি উপলক্ষে সম্প্রতি বর্ষীয়ান এই নেতা মুখোমুখি হন সচিবালয়ে নিজ দফতরে বাংলা ট্রিবিউনের। একান্ত এই সাক্ষাৎকারে তিনি মন খুলে বলেছেন দেশের কথা, দলের কথা এবং নিজের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা। করেছেন বর্তমান পরিস্থিতির রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। এসময় তিনি মন্তব্য করেন ‘এ বছর রাজনৈতিক হানাহানি হবে না।’
বাংলা ট্রিবিউনের পক্ষ থেকে নতুন বছর কেমন যাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি আশাবাদী, নতুন বছর ২০১৭ সাল হবে রাজনৈতিক হানাহানিমুক্ত বছর। ২০১৬ এর ন্যায় ২০১৭ সালও হবে উন্নয়নের বছর, সফলতার বছর, অর্জনের বছর। এ বছর বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। রফতানির পরিমাণ দাঁড়াবে ৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২১ সালে বাংলাদেশের রফতানি আয় হবে ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, সরকার সে লক্ষ্যেই কাজ করছে।
এ বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন হতে পারে বলে মনে করেন?
এর উত্তরে তোফায়েল আহমেদ বলেন, আমার মনে হয়, অতীতের ব্যর্থতা থেকে বিএনপি শিক্ষা নেবে। তারা আর মাঠে নেমে রাজনৈতিক হানাহানি করবে না। তাই আমি আশাবাদী ২০১৭ সাল হবে রাজনৈতিক হানাহানিমুক্ত বছর।
২০১৭ সালের ১২ জানুয়ারি সরকারের ৩ বছর পূর্তি হল। বর্তমান সরকারের শাসনামল নিয়ে মূল্যায়ন জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, স্মরণকালের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে বৃহৎ অবকাঠামো পদ্মাসেতু প্রকল্পের কাজের উদ্বোধনের মধ্যদিয়ে বর্তমান সরকার ২০১৫ সাল শেষ করেছে। ২০১৬ সাল জুড়ে চলেছে পদ্মাসেতু নির্মাণ কাজ। ২০১৭ সালের শেষ নাগাদ পদ্মাসেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে মানুষের মনে শিহরণ জাগানো অগ্রগতি দৃশ্যমান হবে। ২০১৫ সালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। ২০১৬ সাল জুড়ে চলেছে এর বাস্তবায়ন। মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প উদ্বোধন করা হয়েছে। কর্ণফুলি নদীর নিচ দিয়ে হবে কর্ণফুলি টানেল। তাই আমরা আশা করছি ২০১৭ সাল হবে বর্তমান সরকারের জন্য উজ্জ্বল ও সফলতার বছর। সরকারের মেগা প্রকল্পগুলো এ বছর সমাপ্তির দিকে এগুবে।

অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ এখন কোন পর্যায়ে আছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এক সময় বাংলাদেশে ৭ কোটি মানুষ বসবাস করতো। তখন দেশে খাদ্য ঘাটতি ছিল। অথচ আজ ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। বাংলাদেশ এখন খাদ্য রফতানি করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। বাংলাদেশ থেকে এখন চাল রফতানি হচ্ছে। এক সময় যারা তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের সুরে বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলতেন, আজ তারা বাংলাদেশকে ‘মিরাকল’ বলছেন। বিদেশিরা বলছেন, বাংলাদেশের বিস্ময়কর উত্থান হয়েছে। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশও অনুসরণীয় বলে মন্তব্য করেছে বিশ্বব্যাংক। অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে, কয়েকটি সূচকে ভারতের তুলনায়ও বাংলাদেশ এগিয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সময়ে বিশ্ববাসী মনে করে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিস্ময়কর উত্থান ঘটেছে। বিশ্ববাসী আজ বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্প শুনতে চায়। বাংলাদেশের অর্থনীতি যে গতিতে এগুচ্ছে সেই গতিকে ‘উড়ন্ত পাখি’ বলে মন্তব্য করেছেন সদ্য বাংলাদেশ সফর করা বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ও সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. কৌশিক বসু। বাংলাদেশের অর্থনীতির এগিয়ে যাওয়ার গতিকে তিনি শুধু উড়ন্ত পাখিই বলেননি, বলেছেন বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি এখন সারা বিশ্বে মডেল হিসেবে দৃষ্টান্ত হতে পারে। ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তব বলেও মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অগ্রগতির চিত্র কি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের ৬৮টি দেশে মাত্র ২৫টি পণ্য রফতানি করতো। আজ সেই বাংলাদেশ, বিশ্বের ১৯৬টি দেশে ৭২৯টি পণ্য রফতানি করছে। বাংলাদেশ থেকে বর্তমানে বিশ্বের ১২২টি দেশে ওষুধ রফতানি হচ্ছে। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশে চা উৎপাদন হতো মাত্র ২৫ মিলিয়ন কেজি। তা বিদেশে রফতানিও হতো। কিন্তু আজ বাংলাদেশে ৭৫ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদন হলেও রফতানি করা যায় না। বাংলাদেশের মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বেড়েছে। মানুষের জীবন যাত্রার মান বদলেছে। মানুষ আজ চা খায়। তাই আমাদের দেশে উৎপাদিত চা সবই আমাদের দেশে বিক্রি হয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে এক সময় রেমিটেন্স ছিল না। ছিল না উল্লেখ করার মতো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। আজ বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিটেন্স আসে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আশা করছি চলতি অর্থবছর শেষে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার হবে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় এখন ১৪৬৫ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। আসলেই বাংলাদেশের অর্থনীতির বিস্ময়কর অগ্রগতি হয়েছে, যা নতুন ২০১৭ সালেও অব্যাহত থাকবে- দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন তোফায়েল আহমেদ।
২০১৫ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অর্থনীতির অগ্রযাত্রাকে ব্যহত করেছে উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, ২০১৫ সালে বিএনপি ৯৩ দিন হরতাল অবরোধ করে বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে চেয়েও পারেনি। এ সময়ে দেশে রফতানি আয় বেড়েছে। রেমিটেন্স প্রবাহ বেড়েছে। রিজার্ভ বেড়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধিও বেড়েছে। ঠিক একইভাবে ২০১৬ সালেও দেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে কেউ ব্যাহত করতে পারেনি। ইনশাল্লাহ ২০১৭ সালেও তা পারবে না।
আওয়ামী লীগের এই ঝানু রাজনীতিক বলেন, জঙ্গি বা আইএস নামের কোনও সন্ত্রাসী সংগঠনের অস্তিত্ব বাংলাদেশে নাই। জামাত শিবিরের সন্ত্রাসীরাই বিভিন্ন নামে নাশকতা বা অরাজকতা সৃষ্টি করে বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করার চেষ্টা করে। যা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করে তাদের সেই পরিকল্পনা ভেঙে দিয়েছে।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন,এই সংসদের স্পিকার ড.শিরীন শারমিন চৌধুরী কমনওয়েলথ পার্লামেন্ট এসোসিয়েশন (সিপিএ) ও সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা ভোট দিয়ে তাদের নির্বাচিত করেছেন। কাজেই বাংলাদেশকে এখন আর পেছনে তাকানোর সময় নেই।
২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ডাকা লাগাতার হরতাল-অবরোধ প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সেই অবরোধ কিন্তু তিনি এখনও তোলেননি। অবরোধ তিনি প্রত্যাহারও করেননি। খালেদা তখন বলেছিলেন সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত তিনি ঘরে ফিরে যাবেন না। সরকারের কিন্তু পতন হয়নি। কিন্তু খালেদা জিয়া আদালতে আত্মসমর্পণ করে অবরোধ না তুলেই ঘরে ফিরে গেছেন। সেই অবরোধ কিন্তু এখনও চলছে। কিন্তু তা কেউ মানছে না। ওই সময় আন্দোলনের নামে ২৪ জন পুলিশকে হত্যা করেছে বিএনপি। আগুন দিয়ে পেট্রোল বোমা মেরে মানুষ হত্যা করেছে। সেই বিভীষিকাময় দিনে কেউ ফিরে যেতে চায় না। অগ্নিদগ্ধ ও পেট্রোল বোমায় ক্ষত-বিক্ষত ভাই বা সন্তানের মরদেহ কেউ আর দেখতে চায় না। আর চায় না বলেই সদ্য সমাপ্ত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবি হয়েছে। যে নির্বাচন দেশব্যাপী মানুষের কাছে সমাদৃত ও প্রশসিত হয়েছে।
একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় অটল ও অবিচল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধের বিচার করেছেন। বিচারের রায় বাস্তবায়ন করছেন। যারা বিচারের আওতায় আছে তাদেরও বিচার হবে এবং রায় বাস্তবায়ন হবে বলে জানান সরকারের এই নীতি নির্ধারক।

/এসআই/টিএন/আপ-এমও/

লাইভ

টপ