তৈরি পোশাকশিল্প: চীনের পড়ন্ত বাণিজ্য কি ধরতে পারবে বাংলাদেশ

ইব্রাহীম হুসাইন অভি
০৫ নভেম্বর ২০১৭, ১৯:১৭আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০১৭, ২১:১৫

 বিশ্বজুড়ে তৈরি পোশাক রফতানি বাণিজ্যে চীনের অবস্থা তুলনামূলকভাবে পড়তির দিকে। তারপরও তাদের অবস্থানে যেতে হলে অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে বাংলাদেশকে। চীন থেকে পোশাক তৈরির যে অর্ডারগুলো বাতিল করে দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা, সেগুলো বাংলাদেশে আনতে হলে অনেক ধরনের প্রতিবন্ধকতা পেরোতে হবে।

ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে চীনের তৈরি পোশাক রফতানিতে দরপতন হতে শুরু করেছে। এ সুযোগ লুফে নিতে উঠে পড়ে লেগেছে বেশ কয়েকটি দেশ। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ তৈরি পোশাক রফতানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ খুব স্বাভাবিকভাবেই এ দৌড়ের অন্যতম প্রতিযোগী। তবে দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে এজন্য কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে হবে বাংলাদেশকে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনও বিনিয়োগবান্ধব ব্যবসার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) একটি প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।

বিশ্ব বাণিজ্য পরিসংখ্যান পর্যালোচনা ২০১৭ অনুসারে, বিশ্বের তৈরি পোশাকশিল্পের বাজারে বাংলাদেশের অংশ বাড়ছে। ২০১৫ সালের পাঁচ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে এখন তা ছয় দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে, চীনের শেয়ার পড়তির দিকে। ২০১৫ সালে যা ৩৯ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল, তা কমে এখন ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে।

‘স্টিচেস টু রিচেস: দক্ষিণ এশিয়ায় পোশাক খাতে কর্মসংস্থান, বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন’ শিরোনামে বিশ্বব্যাংকের একটি গবেষণায় দেখা যায়, চীনে পোশাক খাতের পেছনে এক শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধির ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি এ পণ্য রফতানির সুযোগ বাড়বে এক দশমিক ৩৬ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার। এদিকে, পোশাক খাতের শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি উঠেছে বাংলাদেশেও। সে অনুযায়ী এক শতাংশ মজুরি বাড়ানো হলে শ্রমখাতে নারীদের প্রবেশের সম্ভাবনা বেড়ে ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছাবে। 

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চীনে শতকরা ১০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের জন্য নতুন করে আরও চার দশমিক ২২ শতাংশ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে বাংলাদেশে। বিশ্বব্যাংকের ‘ডুয়িং বিজনেস’ র‌্যাংকিং অনুযায়ী ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের ক্ষেত্রে গত বছরের তুলনায় বাংলাদেশ এক ধাপ পিছিয়েছে। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের তালিকায় গত বছর ১৭৬তম অবস্থানে থাকলেও এ বছর বাংলাদেশে রয়েছে ১৭৭ নম্বরে।

দেশের ব্যবসায়ীরা বলেছেন, চীনের পোশাকশিল্পের বাজার দখল করতে হলে বাংলাদেশকে প্রথমেই যে বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে হবে তাহলো বিশ্ববাজারে এখন কোন পণ্যের চাহিদা বেশি তা খুঁজে বের করা এবং এসব পণ্যের ক্রেতা কারা সেটি নির্ধারণ করা।   

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বিশ্ববাজারে শ্রমিকদের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের সম্ভাবনা বেড়ে গেছে। তৈরি পোশাক খাতের ছোট পর্যায়ের কাজের অর্ডার বাড়ার সম্ভাবনা আছে বাংলাদেশের। এ সুযোগ সমানভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, ভারত ও পাকিস্তানের সামনেও। ’

তিনি আরও বলেন, ‘ক্রেতা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করার জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ প্রয়োজন কিন্তু বাংলাদেশে তার ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া, সম্ভাব্য ভালো ক্রেতাদের সঙ্গে সংযোগ তৈরিতেও আমরা দুর্বল।’ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন অদক্ষতার কারণে আমদানি-রফতানি পণ্য পরিবহনে অধিক সময়ের প্রয়োজন হয়, এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। যেসব বিনিয়োগকারী চীন ছেড়ে যাচ্ছেন তাদের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের জন্য আমাদের এখন একটি কৌশল থাকা প্রয়োজন।’

এ ব্যাপারে বিজিএমইএর সহসভাপতি ফারুক হাসান বলেন, ‘বৈশ্বিক ক্রেতাদের কাছে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নিরাপদ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ কারখানা নিয়ে বাংলাদেশ এখন প্রস্তুত। এখন তৈরি পোশাকশিল্পের উন্নতির জন্য যা প্রয়োজন তাহলো সঠিকভাবে ও ঠিক সময়ে পণ্যের চালান লেনদেন করতে উন্নত অবকাঠামো নিশ্চিত করা।

এছাড়া, কারখানাগুলোতে সুলভ মূল্যে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতি প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি। বিজিএমইএর এই সহসভাপতি আরও বলেন, ‘বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সুবিধার কারণ হলো তরুণ শ্রমশক্তি ও স্বল্প মজুরি। আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলতে যদিও উৎপাদন খরচ কিছুটা বেড়ে গেছে।’ রফতানি শিল্পের প্রবৃদ্ধির জন্য শ্রমিকদের ভালো প্রশিক্ষণ ও শিক্ষাসহ নীতিগত সমর্থন প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ইএবি) সভাপতি সালাম মুর্শেদি বলেন, ‘উৎপাদন খরচ কমানোর জন্য শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা ও কর্মদক্ষতা খুব গুরুত্বপূর্ণ, এটি আমাদের দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।’ তিনি আরও বলেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে অধিকাংশ কারখানা মালিকই উৎপাদন প্রক্রিয়া উন্নত করেছেন। কিন্তু মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনার অদক্ষতার কারণে শ্রমিকরা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারছে না।’ 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি মাল্টিন্যাশনাল সুইডিশ কোম্পানির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘তুলনামূলভাবে কম মজুরি হওয়ার পরও বাংলাদেশের একটি বড় অসুবিধা আছে। তাহলো কালক্ষেপণ করা। সময় বেশি লাগে এখানে। স্বল্প সময়ে কাজ করার জন্য ক্রেতারা চীনসহ অন্যান্য দেশকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

এদিকে, আন্তর্জাতিক অর্ডার বৃদ্ধির জন্য কারখানায় কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের গ্রুপগুলো এবং ট্রেড ইউনিয়নের নেতারা। সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, ‘বাংলাদেশ যদি তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য হটস্পট হতে চায় তাহলে মালিকদের উচিত শ্রমিকদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ করা।’

রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় সমালোচিত হওয়ার পর বিদেশি প্রতিনিধিদের দিয়ে পোশাক কারখানাগুলো পরিদর্শন করানোর পর উপকৃত হয়েছে বাংলাদেশ। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে কারখানার পরিবেশের উন্নয়ন ঘটানো হয়েছে। এ ব্যাপারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বিদেশি প্রতিনিধিদের কারখানা পরিদর্শন সম্পূর্ণভাবে শেষ হলে বাংলাদেশ আরও লাভবান হবে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রফতানি বৃদ্ধিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’

বন্দরগুলোর আধুনিকায়নে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। এছাড়া, সময় নষ্টের সমস্যা সমাধানের জন্য উন্নত অবকাঠামো ও গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কথাও বলেছেন তিনি। 

তৈরি পোশাক খাত ও চীনের দুর্বলতা ছাড়াও অন্যান্য সুবিধা

তৈরি পোশাক খাত ছাড়াও রফতানি বাণিজ্যে বাংলাদেশের সামনে আরও বেশকিছু ভালো পণ্য নিয়ে ব্যবসা করার সুযোগ রয়েছে। যেমন– চামড়ার জুতা, জাহাজ নির্মাণ, কৃষিজাত পণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধ শিল্প ও ছোটখাট যন্ত্রপ্রকৌশলের ক্ষেত্রেও বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।

ফরচুন গ্রুপের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার এম আবু তাহের বলেন, ‘কম খরচে পণ্য তৈরিতে চীন অবস্থান হারানোর সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনা দুয়ার খুলে যাচ্ছে। বিশ্ববাজার দখলের জন্য বাংলাদেশের সামনে এখন অপার সুযোগ। এজন্য দক্ষ শ্রমশক্তি প্রয়োজন। চীনে শ্রমমূল্য বেড়ে যাচ্ছে। তাই বিশ্ববাজারে পণ্য সরবরাহকারীদের কাছে আমরা এখন বিভিন্ন পণ্য তুলে দিতে পারি।’ 

আবু তাহের আরও বলেন, ‘চীনের তুলনায় বাংলাদেশে সস্তায় শ্রমিক পাওয়া যায় কিন্তু শ্রমিকদের উৎপাদন ক্ষমতাও তেমনই। বিশ্ববাজারে চীনের জায়গা নেওয়ার চেষ্টা করার আগে শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নজর দিতে হবে আমাদের।’

শুধু যে চীনেই মজুরি বাড়ছে তা নয়, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামেও সমানতালে মজুরি বাড়ছে। বাংলাদেশ এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্যাপক পরিসরে লাভবান হতে পারে। কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা ২০১৮ সাল থেকে বাস্তবায়ন হবে। কম্বোডিয়া সরকার পোশাক শ্রমিকদের মাসিক বেতন ১৪০ ডলার থেকে ১৫৩ ডলারে উন্নীত করেছে। এখন ভিয়েতনামের শ্রমিকদের মাসিক বেতন ১৭৫ ডলার। তা ছয় দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে ভিয়েতনামের জাতীয় মজুরি কমিশন।

জাপানের বৈদেশিক বাণিজ্য সংস্থার (জেইটিআরও) মতে, ২০০৮ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ব্যবসাখাতে জাপানের বিনিয়োগ বেড়েছে তিনগুণ। ২০১৭ সালে এসে বাংলাদেশে ২৫৩টি ব্যবসা আছে জাপানের।

এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘জাপান ও অন্যান্য পূর্ব এশিয়ার দেশের তুলনায় বাংলাদেশে শ্রমিক খরচ কম হওয়ায় জাপানের বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশকে পছন্দ করছে।’ দ্রুতগতিতে বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়াতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে আকর্ষণীয় প্যাকেজ ঘোষণা করার জন্য সরকারকে আহ্বান জানান  তিনি।

(ঢাকা ট্রিবিউন থেকে অনূদিত)

আরও পড়ুন:
বাংলাদেশি ডেনিমের জয়যাত্রা

‘বাংলাদেশি ডেনিমের জন্য প্রয়োজন আরও গবেষণা’

 

 

/এএইচ/এএম/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
প্রবাসীসহ সব বাংলাদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রণোদনা দেবে সরকার
প্রবাসীসহ সব বাংলাদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রণোদনা দেবে সরকার
সব দলকে রাজনীতি করতে দিতে চায় বিএনপি, এর মধ্যে আ.লীগ কি আছে?
সব দলকে রাজনীতি করতে দিতে চায় বিএনপি, এর মধ্যে আ.লীগ কি আছে?
ইকরার মৃত্যু: জামিন পেলেন অভিনেতা জাহের আলভীর মা
ইকরার মৃত্যু: জামিন পেলেন অভিনেতা জাহের আলভীর মা
কৃষিকে আধুনিক ও জলবায়ু-সহিষ্ণু করতে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা জরুরি: প্রধানমন্ত্রী
কৃষিকে আধুনিক ও জলবায়ু-সহিষ্ণু করতে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা জরুরি: প্রধানমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী