সুদ কমানোর আশ্বাসে ব্যাংক মালিকদের বড় ছাড়

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ২০:৪৫, জুন ১২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:২০, জুন ১৩, ২০১৮

ব্যাংক

সুদের হার কমানোর আশ্বাসে ব্যাংক মালিকদেরকে দেওয়া হচ্ছে নতুন নতুন ছাড়। শুধু তাই নয়, সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার কথা বলে এ পর্যন্ত চার ধরনের সুবিধা নিয়েছেন বেসরকারি ব্যাংকের মালিকরা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তারা ঋণের সুদহার কমাননি।  নতুন করে আরও তিন ধরনের সুবিধা পেতে যাচ্ছেন তারা। এরই মধ্যে প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংকের করপোরেট কর আড়াই শতাংশ কমিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এছাড়াও বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চাপে কমানো হচ্ছে সঞ্চয়পত্রের সুদ হারও। এমনকি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে পড়ে থাকা ‘অলস’ টাকাও পেতে যাচ্ছেন বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মালিকরা।

গত বৃহস্পতিবার (৭ জুন) বাজেট ঘোষণায় অর্থমন্ত্রী যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তা কার্যকর হলে ব্যাংকের পরিচালকেরা আগের চেয়ে বেশি মুনাফার ভাগ পাবেন। সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন ২০১৩ সালে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া নয়টি নতুন ব্যাংকের মালিকরা। কারণ, এসব ব্যাংক এখনও শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি। ফলে মুনাফা ভাগাভাগি করে নেবেন এসব ব্যাংকের পরিচালকেরা। অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাব অনুযায়ী, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ২০১৩ সালে অনুমোদন পাওয়া ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করহার ৪০ শতাংশ থেকে কমে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ হবে। এছাড়া শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করহার ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ৪০ শতাংশ হবে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাবে, এর ফলে এসব কোম্পানিকে অর্থের হিসাবে ছাড় দেওয়া হচ্ছে প্রায় ৮শ’ কোটি টাকা।

এ প্রসঙ্গে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ব্যাংক খাতে করহার কমানোর ফলে সুদহার নিয়ন্ত্রণে কিছুটা প্রভাব পড়লেও আমানতের সুদহার আগে কমতে হবে। তা না হলে ঋণে সুদহার কমবে না। এ ছাড়া ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাথাপিছু খরচ ও ঝুঁকি প্রিমিয়ামের ওপরও সুদহার নির্ভর করে।

এদিকে, ব্যাংক খাতকে একের পর এক নানাভাবে ছাড় দেওয়াকে ভালোভাবে দেখছেন না ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদরা।

এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংকের করপোরেট কর কমানোর সুবিধা কার্যত গ্রাহকরা পাবে না। বরং এই পরিমাণ টাকা ভাগবাটোয়ারা করে নেবেন ব্যাংক মালিকরা।

তিনি বলেন, যেসব ব্যাংক ঋণে সুদ হার ৯ শতাংশের মধ্যে রাখতে পারবে তাদেরকে এই সুবিধা দেওয়া হলে ব্যাংকের গ্রাহকরাও উপকার পেতো।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ব্যাংকের আমানতকারীদের স্বার্থ দেখা হলেও বাংলাদেশে হচ্ছে তার উল্টো। এখানে ব্যাংকের আমানতে যাদের অংশগ্রহণ মাত্র ১০ শতাংশ, অথচ তাদের চাপে আইন পরিবর্তন হয়েছে। তিনি বলেন, ব্যাংক পরিচালকেরা যা যা চাচ্ছেন, তাই তাদেরকে দেওয়া হচ্ছে। সরকারি আমানত বেশি নিয়েছেন তারা, নগদ জমার হারও কমিয়েছে। 

গত শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের জানান, ব্যাংকঋণের সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার জন্য তাদের করপোরেট করহার কমানো হয়েছে।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের শুরুতে সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার কথা বলে চার ধরনের সুবিধা নিয়েছেন বেসরকারি ব্যাংকের মালিকরা। বিএবির চাহিদা অনুযায়ী সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখা; সিআরআর ১ শতাংশ হ্রাস; ঋণ আমানতের হার (এডিআর) সমন্বয়সীমার সময় বাড়ানো এবং রেপো রেট ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশ করা হয়েছে। তারপরও ঋণের সুদহার বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকেই সুদের হার বৃদ্ধি করা শুরু করেছে ব্যাংকগুলো। সাত-আট মাস আগে ব্যাংকগুলো ৩ থেকে ৬ শতাংশ সুদে আমানত পেলেও এখন ১২ শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহ করছে। কোনও কোনও ব্যাংক ১২ শতাংশেরও বেশি সুদে আমানত সংগ্রহ করছে। ফলে ওই ব্যাংক বাধ্য হয়েই  উচ্চ সুদে ঋণ সুদ বিতরণ করছে।

একইভাবে ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, তারল্য সংকটের কারণে উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহের কারণে তারা ঋণে সুদের হার কমাতে পারছেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, গত ফেব্রুয়ারির চেয়ে মার্চে সুদের হার বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি, বেসরকারি বা বিদেশি সব খাতের ব্যাংকই ঋণের সুদ বাড়িয়ে দিয়েছে। মার্চ মাসে ৪৪টি ব্যাংক ঋণের সুদ বাড়িয়েছে। দেশের ৫৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে সবক’টিতেই এখন দুই অঙ্কের সুদ গুনছেন ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে শিল্পঋণ পেতে ব্যবসায়ীদের ২২ শতাংশ পর্যন্ত সুদ গুনতে হচ্ছে।

/টিএন/

লাইভ

টপ