৪৫ টাকার চামড়া বিক্রি হয় কত টাকায়

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ১৯:৩৯, আগস্ট ২৭, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:০৫, আগস্ট ২৮, ২০১৮

চামড়া কেনা-বেচা (ফাইল ছবি)সরকারের নির্ধারিত দাম অনুযায়ী ট্যানারি ব্যবসায়ীরা এবার ঢাকায় লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া কিনবেন ৪৫-৫০ টাকায়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, চামড়া প্রক্রিয়াকরণের পর এ গ্রেডের (সবচেয়ে ভালো মানের) প্রতি বর্গফুট চামড়া রফতানি উপযোগী করতে তাদের খরচ করতে হয় প্রায় ৯৫ টাকার কাছাকাছি। আর্ন্তজাতিক বাজারের দর অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি বর্গফুট এ গ্রেডের চামড়ার দাম এক ডলার ৩০-৪০ সেন্ট। যা বাংলাদেশি টাকায় ১০০-১১৫ টাকা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চামড়া ব্যবসায়ীদের কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ ছাড়াও অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে চামড়া রফতানি উপযোগী হয়। এর মধ্যে এ গ্রেডের চামড়া পাওয়া যায় খুবই সামান্য।

তিনি বলেন, ‘মৌসুমি ব্যবসায়ীরা যে চামড়া ৫০০ টাকায় কেনেন তা তিন বা চার হাত বদল হয়ে আমাদের কাছে আসে। আমাদের সেই চামড়া এক হাজারের ওপরে দাম দিয়ে কিনতে হয়। চামড়া প্রক্রিয়াকরণের পর এ গ্রেডের চামড়া বিক্রয় বা রফতানি উপযোগী করতে প্রতি বর্গফুটে খরচ পড়ে গড়ে ৫৫ টাকারও বেশি। রফতানি করতে গেলে এর সঙ্গে আরও ৪ শতাংশ লোকাল এজেন্টকে কমিশন দিতে হয়। এছাড়া এ গ্রেডের চামড়া প্রক্রিয়াকরণের সময় ২০-৩০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। এর বাইরে ট্যানারি পরিচালনার জন্য বিশাল একটি ওয়ার্কার টিম কাজ করে। এ গ্রেডের চামড়া তৈরির জন্য আরও খরচ আছে। সব মিলিয়ে প্রতি বর্গফুটের জন্য খরচ পড়ে ৯৫-১০০ টাকার কাছাকাছি।’

সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ‘তিন ধরনের চামড়া আমরা রফতানি করি। ২৬ ফুটের বেশি হলে বড়, ১৫-২৬ ফুট মধ্যম মানের এবং ৯-১৫ ফুট পর্যন্ত ছোট চামড়া হিসাবে রফতানি করি। এই তিন ধরনের চামড়াই রফতানির সময় মান নির্ণয় করা হয়।চামড়ার বহু গ্রেডিং আছে। এর মধ্যে প্রধানত চামড়ার দুই ধরনের গ্রেড হয়। ভালো ও উন্নত মানের চামড়াকে এ, বি, সি, ডি গ্রেড এবং তুলনামূলকভাবে একটু কম মানের চামড়াকে ই, এফ, জি, এইচ গ্রেড ধরা হয়। এছাড়া আরও বিভিন্ন ধরনের গ্রেডও আছে।’

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন,  ‘বর্তমানে এ, বি, সি, ডি গ্রেডের চামড়া প্রতি বর্গফুট বিক্রি হয়েছে এক ডলার ৪০ সেন্ট পর্যন্ত। যা বাংলাদেশি টাকায় ১০০-১১৫ টাকা। এই গ্রেডের কোনও চামড়া প্রতি বর্গফুট বিক্রি হয়েছে এক ডলার ২০ সেন্ট। কোনও চামড়া বিক্রি হয়েছে এক ডলার ৩০ সেন্ট। বর্তমানে ই, এফ, জি, এইচ, গ্রেডের চামড়া প্রতি বর্গফুট বিক্রি হয়েছে এক ডলারেরও কম। ৭৫-৯০ সেন্ট পর্যন্ত। যা বাংলাদেশি টাকায় ৬২-৭৫ টাকা।’

প্রসঙ্গত, আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে এবার কোরবানির পশুর চামড়ার দাম কমে গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ৩০ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে কম দামে চামড়া বিক্রি হচ্ছে। এ বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও সরব। অনেকে চামড়া বিক্রি না করে মাটিতে পুঁতে রেখেছেন বলেও ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে জানাচ্ছেন।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সেক্রেটারি জেনারেল মোজাম্মেল হক চৌধুরী তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘৮২ হাজার টাকা দামের মহিষের চামড়া ৬০ টাকায় বিক্রি না করে মাটিতে পুঁতে রাখলাম। ভালো করলাম না মন্দ করলাম।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘গত পাঁচ বছরে ক্রমাগত চামড়ার দাম কমলেও জুতার দাম কিন্তু বেড়েই চলেছে। বিষয়টি সত্যি অবাক হওয়ার মতো। পশুর ক্রয়মূল্যের সঙ্গে তার চামড়ার দামের সামঞ্জস্য নেই। আবার চামড়ার সঙ্গে জুতার বিক্রির মূল্যের সঙ্গতি নেই। দেশে দিনে দিনে চামড়ার মূল্য কমলেও জুতার মূল্য বাড়ছে। এটি গরিব ঠকানোর উদ্দেশ্যেই হচ্ছে।’

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ ) সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ মাহিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,  ‘কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে ফিনিশড লেদার হিসেবে তৈরি করতে হয়। চামড়ায় বহু ধরনের গ্রেড আছে। একই সমান, একই রকম কিন্তু লবণ ঠিকমতো না লাগালে গ্রেডিং আলাদা হবে। ট্যানারিতে আসার পরও বোঝা যায় না কোনও চামড়া কোনও গ্রেডের। এটা বোঝা যায়, প্রক্রিয়াকরণের পর। কোরবানি দেওয়ার ৬ ঘণ্টার  মধ্যে লবণ না লাগালে পচন ধরে যায়। কিন্তু চোখে এটা ধরা পড়ে না। এটা ধরা পড়ে প্রক্রিয়াকরণের পর। অনেক সময় দেখা যায়, ১০০ চামড়ার মধ্যে ৪০টি চামড়া এরকম নষ্ট হয়ে যায়। এই ৪০টির কোনও দাম নেই। বাকি ৬০টি মধ্যে ১০টিতে আনাড়ি লোক দিয়ে চামড়া ছড়ানোর কারণে ফুটো হয়েছে। সেখানে গ্রেডিং ফল করবে। এভাবে নানাভাবে চামড়া বুচার ড্যামেজ হয়। ন্যাচারালি এমনিতেও সিলেকশন ফল করতে পারে। এছাড়া ছোট বড়, কাটা পড়া, রঙয়ের পার্থক্য দেখে গ্রেডিং হয়।’

সাখাওয়াত উল্লাহর মতো মহিউদ্দিন আহমেদ মাহিনও মনে করেন, ‘এবারে এই চামড়া বিক্রি হবে গড়ে এক ডলার ৪০ সেন্ট। ট্যানারি ব্যবসায়ীরা এবার ঢাকায় লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া কিনবেন ৪৫-৫০ টাকায়। এর মধ্যে ১০ শতাংশ চামড়া অতিরিক্ত গরম বা লবণ সময় মতো না লাগানোর কারণে নষ্ট হতে পারে। বিভিন্নভাবে নষ্ট হওয়া চামড়ার খরচ হিসাবে নিলে দাম পড়বে প্রতি বর্গফুটের ৫০-৫২ টাকা। এর সঙ্গে কেমিক্যাল খরচ, বিদ্যুৎ খরচ, শ্রমিকদের বেতন, ব্যাংকের সুদ ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম পড়ে বাংলাদেশি মুদ্রায় ১০০-১১৫ টাকা।’

জানা গেছে, পাইকারি চামড়া ব্যবসায়ীরা লবণসহ সব ধরনের খরচ মেটানোর পর কাঁচা চামড়া আড়তদারদের কাছে পৌঁছান। ট্যানারিতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এই চামড়া মূলত আড়তদারদের কাছে সংরক্ষিত থাকে। ট্যানারির মালিকরা সেই চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন পণ্য বানান। এসব পণ্য বিদেশেও রফতানি করা হয়।

 

/এসটি/

লাইভ

টপ