সাবস্টেশনের সঙ্গে ভোল্টেজের সমন্বয় না থাকায় সংসদে বিদ্যুৎবিভ্রাট

Send
সঞ্চিতা সীতু
প্রকাশিত : ২০:৫৫, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৫৮, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৮

 

জাতীয় সংসদ (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)চারটি সোর্স থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা থাকার পরও সাবস্টেশনের সঙ্গে বিদ্যুতের ভোল্টেজের সমন্বয় না থাকায় মঙ্গলবার (১১ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদ ভবনে বিদ্যুৎবিভ্রাট ঘটে। বিদ্যুৎ সরবরাহের সঙ্গে ভোল্টেজের সমন্বয় না থাকায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে জেনারেটর চালু হয়ে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তবে, বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় কোনও ত্রুটি ছিল না। অসামাঞ্জস্য ছিল সংসদের সাবস্টেশনেই। বুধবার (১২ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় তদন্ত কমিটির  দেওয়া প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।  ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে ৬ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।

গত মঙ্গলবার বিকেল পৌনে ৪টার পরে সংসদ ভবন এলাকায় বিদ্যুৎবিভ্রাট ঘটে। এ সময় সংসদ ভবনের অধিকাংশ ব্লক বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়ে। সংসদ অধিবেশন ৫টায় শুরুর কথা থাকলেও বিদ্যুৎবিভ্রাটের কারণে জেনারেটর চালিয়ে বৈঠক শুরু হয় ১০ মিনিট পর। এরপর সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে অন্যান্য কার্যসূচি স্থগিত করা হয়।এরপর সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে সংসদ ভবনের বিভিন্ন ব্লকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

এই ঘটনা তদন্তে বিদ্যুৎ বিভাগ, ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি (ডিপিডিসি), বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোডের (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) চারটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। প্রায় সব তদন্ত কমিটি বুধবার মন্ত্রণালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।

ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি যে প্রতিবেদন দিয়েছে তাতে বলা হয়েছে, সাবস্টেশনটিতে জাতীয় সংসদ ভবনের লোড, সিস্টেম ভোল্টেজ ও অন্যান্য প্যারামিটার ঠিকমতো সমন্বয় করা ছিল না। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সময়, লো ভোল্টেজের জন্য কতটা দেরিতে ব্রেকার পড়বে, কোন ভোল্টেজ লেভেলে আবার সরবরাহ শুরু হবে, তা ঠিক করা ছিল না। রিলে প্রটেকশন স্কিম যথাযথ থাকলেও লোড ও সোর্স ভোল্টেজের সঙ্গে সেটিং প্যারামিটার সামাঞ্জস্য না থাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহের ২য় সোর্স চালু হয়নি। ফলে জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎবিভ্রাট ঘটে।

প্রসঙ্গত, জাতীয় সংসদ ভবনে বর্তমানে চারটি ১১ কেভি ফিডারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।এরমধ্যে প্রথম সোর্স পিডব্লিউডির খেজুরবাগার ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্র, ডিপিডিসির আসাদগেট ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্র, ডিপিডিসির মগবাজার ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্র ও ডিপিডিসির কাওরান বাজার ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্র। এছাড়া বিকল্প হিসেবে পিডব্লিউডির নিজস্ব জেনারেটর রাখা হয়েছে।

কোনও কারণে প্রথম সোর্স বন্ধ হলে অটোচেঞ্জ ওভার সুইচের মাধ্যমে দ্বিতীয় সোর্স, দ্বিতীয় সোর্স ট্রিপ করলে তৃতীয় সোর্স দিয়ে অটোচেঞ্জ ওভার সুইচের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল রাখার ব্যবস্থা আছে। সর্বশেষ মগবাজার তৃতীয় সোর্স না থাকলে ম্যানুয়ালি ৪র্থ সোর্স কাওরান বাজার ফিডারের মাধ্যমে লোড শিফট করার ব্যবস্থা রয়েছে। এই চারটি বিদ্যুৎ সোর্স বন্ধ হলে ৫ম সোর্স হিসেবে স্ট্যান্ডবাই জেনারেটরের মাধ্যমে সংসদের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোয় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।

ডিপিডিসির মতো ঘটনার তদন্ত করে পিজিসিবিও বলছে, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থায় কোনও সমস্যা ছিল না। ফলে ঘটনা ঘটার জন্য সাবস্টেশনটির অসামাঞ্জস্যকে দায়ী করেছে কমিটি।

এ বিষয়ে পিজিসিবির তদন্ত কমিটির প্রধান চিফ ইঞ্জিনিয়ার (ট্রান্সমিশন -১) মো রফিকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আমরা তদন্ত করে দেখেছি, আমাদের সিস্টেমে মঙ্গলবার কোনও সমস্যা ছিল না। আমাদের কোথাও ট্রিপও করেনি। ফলে এ ধরনের সমস্যা হওয়ার কথা নয়। একই জিআইএস প্রযুক্তিতে বঙ্গভবন ও গণভবনে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। তাদেরও কোনও সমস্যা হয়নি। ফলে আমরা মনে করছি সমস্যা থাকলে সংসদ ভবনের সাবস্টেশনে কোনও অসামঞ্জস্য রয়েছে।’

ডিপিডিসির তদন্ত প্রতিবেদনে ৬টি সুপারিশ করা হয়েছে। ওই সুপারিশগুলোয় বলা হয়, আন্ডার ভোল্টেজ রিলে সেটিং যথাযথ করতে হবে। পিডব্লিউডি উপকেকেন্দ্রের ১১ কেভি ফিডার রিলে সেটিং যথাযথ করতে হবে। লোডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জেনারেটর বসাতে হবে। পিডব্লিউডি খেজুর বাগান সাবস্টেশনটি ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্রকে নতুন জিআইএস প্রযুক্তির করতে হবে। খেজুর বাগান উপকেন্দ্রের এভিআর (অটোমেটিক ভোল্টেজ রেগুলেটর) সচল করতে হবে। একইসঙ্গে একটি কারিগরি কমিটির মাধ্যমে সিস্টেম সুরক্ষার কাজ করাতে হবে।

সংসদে গ্যাস ইনস্যুলেটেড সাবস্টেশন (জিআইএস) বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সাবস্টেশনটি নির্মাণের সময় গণপূর্ত অধিদফতর (পিডব্লিউডি) বিদ্যুৎ সরবরাহকারী ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি)-এর কাউকে ক্রয়-প্রক্রিয়ার সঙ্গে রাখেনি।

বুধবার বিকেলে এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক প্রকৌশলী রমিজ উদ্দিন সরকার জানান, ‘সাবস্টেশনটি পিডব্লিউডি এককভাবে বসিয়েছে। আমাদের জানায়নি। কমিটিতেও রাখেনি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা ৩৩ কেভি থেকে ১১ কেভিতে সংসদে বিদ্যুৎ সরবরাহ করি। কিন্তু এরপর সাবস্টেশন নিয়ন্ত্রণ করে পিডব্লিউডি।’

এদিকে পিডিবি জানায়, মঙ্গলবার বিকেলে মেঘনাঘাট-৪৪০ মেগাওয়াট ও ঘোড়াশাল-১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যায়। সবমিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে ৫৫০ মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হয়। এতে পিজিসিবির সঞ্চালন লাইন ট্রিপ না করলে লাইনে লো ভোল্টেজের সূত্রপাত হয়।

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ