সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান: ভারত-মিয়ানমার থেকে পিছিয়ে বাংলাদেশ

Send
সঞ্চিতা সীতু
প্রকাশিত : ০৯:১৬, নভেম্বর ০৯, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:২৬, নভেম্বর ০৯, ২০১৮

সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান (ছবি:সংগৃহীত)সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে মাল্টি ক্লায়েন্ট সার্ভে করা হচ্ছে না। বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ অংশে বহুজাতিক কোম্পানি অনুসন্ধান উত্তোলনে রাজি না হওয়ায় বিডিং রাউন্ড (দরপত্র) এর আগে মাল্টি ক্লায়েন্ট সার্ভে করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বছর তিনেক সেই উদ্যোগ ঝুলিয়ে রাখার পর এখন এসে মাল্টিক্লায়েন্টকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলা হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনুসন্ধান উত্তোলনে দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত এবং মিয়ানমার থেকে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। বঙ্গোপসাগরে গভীর অগভীর মিলিয়ে ২৬ ব্লকের মাত্র তিনটিতে কাজ হচ্ছে, বাকিগুলো পড়ে রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক ই ইলাহী চৌধুরী বীর বিক্রম বলেন, ‘দরপত্র আহ্বান করে কাজ দেওয়া হলে উৎপাদন বন্টন নীতির (পিএসসি) মধ্যেই জরিপের বিষয়টি থাকে। সঙ্গত কারণে আলাদা করে মাল্টি ক্লায়েন্ট সার্ভে করার কোনও প্রয়োজন নেই।’

জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়,  মাল্টি ক্লায়েন্ট সার্ভের মূল বিষয় ছিল দরপত্রের আগেই কোনও কোম্পানিকে দিয়ে বঙ্গোপসাগরের বিশাল এলাকায় জরিপ করানো। এই জরিপের ফলাফল অর্থের বিনিময়ে দরপত্র কাজ পাওয়া কোম্পানিকে কিনে নিতে হবে। জরিপের খরচ উঠে আসবে দরপত্রে কাজ পাওয়ার কোম্পানির কাছ থেকে। এতে সরকারের কোনও আর্থিক ক্ষতি হবে না। বরং দ্রুততার সঙ্গে কাজ হবে।

২০১৫ সালে বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে দ্বিমাত্রিক জরিপ (মাল্টিক্লায়েন্ট সিসমিক সার্ভে) করতে পাঁচটি দরপ্রস্তাব জমা পড়েছে। এর মধ্যে নরওয়েভিত্তিক সিসমিক সার্ভে প্রতিষ্ঠান টিজিএস-স্কালম বার্জার জেভিকে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্তও করা হয়। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এত দিন বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখার পর এখন উদ্যোগটি বাদ দেওয়া হচ্ছে বলে পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে, শুধু মাল্টি ক্লায়েন্টই নয়, সাগরের অন্য কাজগুলোও ঝুলে যাচ্ছে। ভারত ও মিয়ানমার সাগর থেকে গ্যাস তুলছে। সেখানে অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। সাগরের ২৬টি ব্লকের মধ্যে মাত্র তিনটি ব্লকে বাংলাদেশ কাজ শুরু করেছে। বাকি ব্লকগুলোতে কাজের কোনও উদ্যোগই নেই।

২০১২ সালের ১৪ মার্চ মিয়ানমারের কাছ থেকে বঙ্গোপসাগরের এক লাখ ১১ হাজার ৬৩১ বর্গকিলোমিটার এবং ২০১৪ সালের ৮ জুলাই ভারতের কাছ থেকে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা পায় বাংলাদেশ। এরপর সব মিলেয়ে ব্লক পুনর্বিন্যাস করে ২৬টি ব্লকে ভাগ করা হয় গোটা সমুদ্রসীমাকে। কিন্তু এখন এর মধ্যে মাত্র তিনটি ব্লকে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বাকি ২৩ ব্লক অলস পড়ে আছে।

এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেশের সাগরে ২৬টি ব্লক রয়েছে। কিন্তু কাজ হচ্ছে মাত্র তিনটি ব্লকে। সরকার উদ্যোগী হলে সাগরে আরও বেশি পরিমাণ গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। মিয়ানমার তাদের সমুদ্রবক্ষে যেভাবে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে এবং করে যাচ্ছে, সে তুলনায় বাংলাদেশ যথেষ্ট পেছনে পড়ে রয়েছে।’ বেশি দামের গ্যাস আমদানি না করে দেশের গ্যাস উত্তোলনে সরকারকে আরও মনোযোগী হওয়া দরকার বলে মত দেন তিনি।

গত বছরের ১৪ মার্চ পেসকো দাইয়ু করপোরেশন নামের দক্ষিণ কোরিয়ার একটি কোম্পানির সঙ্গে সাগরের ১২ নম্বর ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) সই করে পেট্রোবাংলা। সমুদ্র উপকূল থেকে ব্লকটির দূরত্ব ১৮০ কিলোমিটার, অর্থাৎ এটি বঙ্গোপসাগরের ১৮০ কিলোমিটার গভীরে। ব্লকটির ওপর পানির গভীরতা গড়ে এক হাজার ৭০০ মিটার। অন্যদিকে ভারতীয় কোম্পানি অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস করপোরেশন (ওএনজিসি) অগভীর সমুদ্রে ৪ ও ৯ নম্বর ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ করছে।

নতুন বিডিং রাউন্ড সম্পর্কে পেট্রোবাংলার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছে আমাদের পিএসপির সুপারিশ পাঠিয়েছি। সুপারিশগুলো জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে মতামতের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। আইনের অনুমোদন পেলে মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করা হবে। এরপর অনুমোদন পেলে সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী নতুন বিডিং রাউন্ডে যাওয়া হবে। আর সব মিলিয়ে এই প্রক্রিয়া শেষ হতে আরও এক বছর লাগতে পারে। সেই হিসেবে চলতি শুষ্ক মৌসুম তো দূরে থাক, আগামী শুষ্ক মৌসুমে নতুন কোনও কোম্পানি কাজ শুরু করবে এমনটা আশা করা কঠিন। আর যেহেতু শুষ্ক মৌসুম ছাড়া অনুসন্ধান করা যায় না, তাই বিডিং রাউন্ড শেষ করে নতুন কোম্পানিকে সাগরে নামানোর জন্য ঠিক কত দিন প্রয়োজন তা এখনই বলা সম্ভব নয়।’

২০১২ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির পর মিয়ানমার দ্রুত গ্যাস ব্লকগুলোতে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। ২০১৬ সালে থালিন-১ নামক ব্লকে এ গ্যাসপ্রাপ্তির ঘোষণা দেয় মিয়ানমার। থালিন-১-এ সাড়ে চার ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আছে। এখান থেকে গ্যাস তোলা শুরু হয়েছে।

সাগরে তেল গ্যাস অনুসন্ধানে পিছিয়ে নেই ভারতও। বঙ্গোপসাগরের ভারতীয় অংশের কৃষ্ণা-গোদাভরী বেসিন এলাকায় ভালো পরিমাণ গ্যাসের মজুদ থাকতে পারে বলে আশা করছে ভারত। দেশটির সরকারি প্রতিষ্ঠান ওএনজিসি, গুজরাট এস্টেট পেট্রোলিয়াম করপোরেশন, বেসরকারি গ্রুপ রিলায়েন্স এই এলাকায় জোরালো অনুসন্ধান কাজ করেছে।

এর আগে বাংলাদেশের সাগর থেকে শুধুমাত্র সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস তোলা হয়েছে। এই গ্যাসক্ষেত্রটি ১৯৯৬ সালে আবিষ্কার করে ব্রিটিশ তেল-গ্যাস কোম্পানি কেয়ার্ন এনার্জি। ১৯৯৮ সালে সেখান থেকে গ্যাস উৎপাদন শুরু করে কোম্পানিটি। সাঙ্গু আনুষ্ঠানিকভাবে নিঃশেষ ও পরিত্যক্ত হয় ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর। এরপর সাগরের আর কোনও ক্ষেত্রে তেল-গ্যাসের অনুসন্ধান করা হয়নি।

এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার সাবেক চেয়ারম্যান হোসেন মনসুর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাল্টিক্লায়েন্ট সার্ভের প্রয়োজন আছে। যেকোনও বিদেশি কোম্পানি বঙ্গোপসাগরে তেল গ্যাস অনুসন্ধানে আগ্রহ দেখালে তাকে যদি সেখানে কী আছে সে বিষয়ে একটি ধারণা দেওয়া যায়, তাহলে কাজের অনেক সুবিধা হয়। এছাড়া এই ধরনের জরিপ করা গেলে নিজেদেরও ধারণা হবে যে আসলে আমাদের সাগরে কী ধরনের সম্পদ আছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যদিও এই জরিপের মাধ্যমে মজুদের বিষয়ে কোনও ধারণা পাওয়া যাবে না। কিন্তু কিছু আছে কি না, অথবা তা কোন এলাকায় থাকতে পারে, সে বিষয়ে একটি ধারণা পাওয়া যাবে।’ তিনি সাগরে অনুসন্ধান কাজের বিষয়ে বলেন, ‘আমরা ভারত ও মিয়ানমারের তুলনায় পিছিয়ে পড়েছি। কিন্তু এটাও ঠিক যে এখন এই মুহূর্তে সাগরে অনুসন্ধানের কাজটি খুবই ব্যয়বহুল। আর এই ব্যয়বহুল, ঝুঁর্কিপূর্ণ কাজ আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো খুব ভেবেচিন্তে করে থাকে। সব মিলিয়ে আমাদের উচিত কোম্পানিগুলো যাতে আকৃষ্ট হয় সে ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা। সেক্ষেত্রে মাল্টিক্লায়েন্ট জরিপ একটি বিষয় হয়ে উঠতে পারে।’ 

 

/এফএস/

লাইভ

টপ