বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন স্থাপনেও ধীর গতি!

Send
সঞ্চিতা সীতু
প্রকাশিত : ১২:৩০, মার্চ ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪২, মার্চ ১৭, ২০১৯

বিদ্যুৎ

২০০৮ সালে সরকার গঠনের পর প্রথমবারের মতো ২০১২ সালকে বিদ্যুতের ‘নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের বছর’ হিসেবে ঘোষণা দেয় সরকার। কিন্তু ওই ঘোষণা পরে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এর তিন বছর পর আবারও ২০১৫ সালকে বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের বছর ঘোষণা করা হয়। তখন বছরজুড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন আগের তুলনায় বাড়লেও তা চাহিদার সমান না হওয়ায় নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এখন ২০১৯-এ এসে বলা হচ্ছে, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের জন্য আরও সময়ের প্রয়োজন। নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ না দিতে পারার জন্য আগে বিতরণ ব্যবস্থাকে দায়ী করা হতো। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, সঞ্চালন লাইনেই গলদ রয়ে গেছে।

জানা গেছে, বড় প্রকল্পগুলোর কাজ এখনও শেষ হয়নি। বেশিরভাগ প্রকল্পের কাজ আগামী বছর বা তারও পরে শেষ হবে বলে জানিয়েছে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)। আবার কোনও কোনও প্রকল্পের নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও এখনও শেষ হয়নি।

পিজিসিবি সূত্র জানায়, আমিনবাজার-মাওয়া-মংলা ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানো হবে। ২০১৬ সালের জুনে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটি আগামী বছর জুনে শেষ হওয়ার কথা। পৌনে তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এ প্রকল্পের কাজ হয়েছে মাত্র ১৭ ভাগ। আর বরাদ্দকৃত অর্থ খরচ হয়েছে ৪ ভাগ। ৩৩ মাসে ১৭ ভাগ কাজ হওয়া প্রকল্পটি শেষ করতে হলে আগামী ১৫ মাসে ৮৩ ভাগ কাজ করতে হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন যা আদৌ সম্ভব নয়।

ওয়েস্টার্ন গ্রিড নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের মেয়াদ আছে মাত্র দুই মাস। জানুয়ারি ২০১৬-তে কাজ শুরু হওয়া প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ৪৩ ভাগ এবং আর্থিক অগ্রগতি ২৭ ভাগ দেখাচ্ছে পিজিসিবি। তবে আগামী দুই মাসের মধ্যে ৫৭ ভাগ কাজ শেষ করা অনিশ্চিত। এই প্রকল্পের মাধ্যমে রাজশাহী এবং ঈশ্বরদীর মধ্যে ২৩০ কেভি সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে সংযোগ দেওয়া, গোল্লামারি ও গোপালগঞ্জের মধ্যে ১৩২ কেভি সঞ্চালন লাইন, ভাঙ্গুরা এবং বাঘাবাড়ির মধ্যে ১৩২ কেভি, ভাঙ্গুরা, সাতক্ষীরা ও মাদারীপুর এলাকায় সরবরাহ বাড়ানো, রাজশাহী ও নাটোরে লোডশেডিং কমানো, রংপুরের চাহিদা পূরণ করার কথা।

গ্রামীণ বিদ্যুতায়নের জন্য গ্রিড সাবস্টেশন ও ট্রান্সমিশন লাইনের সক্ষমতা বাড়ানো বিষয়ক প্রকল্পটির কাজ গত ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত কাজ হয়েছে ৮৫ ভাগ। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ১৩২/৩৩ কেভি সাবস্টেশনের উৎপাদন বাড়ানো, ঢাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও ভালো করা এবং কিছু পুরনো সঞ্চালন লাইনের মেরামত করা হবে। ৪০০/২৩০/১৩২ কেভি গ্রিড নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের কাজ চলতি বছর জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু এর ভৌতিক অগ্রগতি ৬৭ ভাগ আর আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ২১ ভাগ। এই প্রকল্পের কাজ আগামী জুনের মধ্যে শেষ করা কঠিন হবে।

একই অবস্থা পটুয়াখালী-পায়রা ২৩০ কেভি ট্রান্সমিশন লাইন প্রজেক্টেরও। এর মাধ্যমে পায়রা এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ সরবরাহে সঞ্চালন লাইন করার কথা। এটি চলতি বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত কাজ হয়েছে ৩১ ভাগ। বিপরীতে টাকা খরচ হয়েছে ১৮ ভাগ।

পিজিসিবির সব মিলিয়ে বর্তমানে চলমান প্রকল্প আছে ২৬টি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যগুলোর কাজের অগ্রগতি শ্লথ।

অন্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে-

পটুয়াখালী (পায়রা)-গোপালগঞ্জ ৪০০ কেভি ট্রান্সমিশন লাইন ও গোপালগঞ্জ ৪০০ কেভি গ্রিড সাবস্টেশন: এই প্রকল্পের মাধ্যমে পায়রার ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুতের লাইন নির্মাণ করা হবে। এটি চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এর মাত্র ৩২ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। ২৬ ভাগ টাকা খরচ হয়েছে।

মাতারবাড়ি আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফায়ার্ড পাওয়ার প্রজেক্ট ৪০০ কেভি ট্রান্সমিশন লাইন: প্রকল্পের মাধ্যমে মাতারবাড়ির এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুতের লাইন নির্মাণ করা হবে। এর মেয়াদ ২০২০ সালের ডিসেম্বর। এর মাত্র ৫ ভাগ কাজ হয়েছে। টাকা খরচ হয়নি।

বাকেরগঞ্জ-বরগুনা ১৩২ কেভি ট্রান্সমিশন লাইন এবং বরগুনা ১৩২/৩৩ কেভি সাবস্টেশন: প্রকল্পের মাধ্যমে বরগুনা ও এর আশেপাশের এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানো হবে। মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বর। কাজ হয়েছে মাত্র ১৯ ভাগ। এর বিপরীতে টাকা খরচ হয়েছে ১৩ ভাগ।

ভেড়ামারা-বহরামপুর দ্বিতীয় ৪০০ কেভি ট্রান্সমিশন লাইন: এ প্রকল্পের মাধ্যমে ভারত থেকে আরও এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির সক্ষমতা বাড়ানো হবে। এর মেয়াদ চলতি বছরের জুন। কাজ হয়েছে ৩৮ ভাগ। টাকা খরচ ২১ ভাগ।

মিরসরাই ইকোনমিক জোনে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহের জন্য ট্রান্সমিশন অবকাঠামো উন্নয়ন: প্রকল্পের মাধ্যমে মিরেরসরাইয়ের অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। এ প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা রয়েছে চলতি বছরের জুনে। কাজ হয়েছে মাত্র ২১ ভাগ। এর বিপরীতে টাকা খরচ হয়েছে মাত্র ৯ ভাগ।

আশুগঞ্জের পুরনো ১৩২ কেভি সাবস্টেশন পরিবর্তন:  প্রকল্পের মাধ্যমে আশুগঞ্জের পুরনো উপকেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়ানো হবে।  এর মেয়াদ ২০২০ সালের ডিসেম্বর।  কোনও কাজ এখনও শুরু হয়নি।

রূপপুর নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিত্যক্ত অংশের অবকাঠামোর উন্নয়ন: এই প্রকল্পের মাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। এর মেয়াদ ২০২২ সালের ডিসেম্বর। কোনও কাজ শুরু হয়নি।

ত্রিপুরার সূর্যমনিনগর থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির জন্য কুমিল্লা উত্তরে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ: এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের পূর্বাঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন করা এবং ত্রিপুরা থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির জন্য সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হবে৷ এর মেয়াদ ২০২১ সালের জুন। ডিসেম্বর পর্যন্ত কোনও কাজ হয়নি।

সাউথইস্ট ট্রান্সমিশন গ্রিড বর্ধিত প্রকল্প: এই প্রকল্পের মাধ্যমে বরিশালের অর্থনৈতিক জোন এবং রাজশাহীর বিশাল কৃষিক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। এর মেয়াদ ২০২৩ সালের ডিসেম্বর।কোনও কাজ করা হয়নি।

এদিকে,নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের বিষয়ে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন,‘নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। এ জন্য সময় দিতে হবে। কোরিয়ার মতো দেশের সময় লেগেছিল ৩০ বছর।’

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমত উল্লাহ বলেন, ‘যেকোনও দেশ যখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেয় তখন সেই বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন তৈরি করে। আমাদের দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে অনেক টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। এর পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনেও বিনিয়োগের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সেই বিনিয়োগের টাকা যাচ্ছে কোথায়। যদি টাকা খরচই হয় তাহলে এখনও মানুষ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাচ্ছে না কেন?’

তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, কোন প্রকল্প কখন আসবে তা তো আগে থেকেই ঠিক করা আছে। তাহলে বাস্তবায়ন হচ্ছে না কেন?’  তিনি প্রকল্পের কাজে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনা জরুরি। তা না হলে উৎপাদন বেশি হওয়া সত্ত্বেও সঞ্চালন ও বিতরণের কারণে পিছিয়ে যাবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। দুর্নীতি আমাদের একটি বড় সমস্যা, আর এই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসতে হলে স্বচ্ছতা আনা জরুরি। উৎপাদন, বিতরণ ও সঞ্চালন লাইনের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে সমন্বয় থাকা জরুরি। না হলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের লক্ষ্য অনেক দূরে চলে যাবে।’

এদিকে এসব বিষয়ে পিজিসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুম আলবেরুনী বলেন, ‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ড শুল্ক আইনের কয়েকটি ধারার পরিবর্তন এনেছে। এই ধারা পরির্ব্তনের কারণে আগে পুরো টাকা ব্যাংকে জমা করতাম, এখন টাকা ব্যাংককে যায় না, এখন অ্যাডভাইজ যায়। আর সেই অ্যাডভাইজ বুঝতে বুঝতে ওদের সময় লেগে যাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘নতুন যে কোনও আইন হলে তা বুঝতে সময় লাগতেই পারে। এই কারণে আমাদের পণ্য আমদানিতে দেরি হয়েছে। তবে আমরা কাজের গতি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছি। আগামী জুনের মধ্যে যেসব প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা সেগুলো মে মাসের মধ্যেই শেষ করতে হবে। আর ডিসেম্বরেরগুলো প্রায় শেষের দিকে আছে বলে তিনি জানান।

/এমএএ/টিএন/

লাইভ

টপ