বাজেট ২০১৯-২০ গুরুত্ব পাচ্ছে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি

Send
শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত : ২২:২৮, মার্চ ২২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৪০, মার্চ ২৪, ২০১৯

54424803_2400891806815049_7416561428087177216_nদেশের সর্বত্র বা সর্বস্তরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে আসন্ন ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট। বর্তমানে মূল্যস্ফীতির চাপ তেমন না থাকলেও বাজেট ভাবনায় সেটিকেও আমলে রেখে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে আশাবাদী সরকার। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে বাজেট তৈরির কাজ শুরু করেছেন সরকারের নতুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। গত সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে বাজেট তৈরির প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এটি হবে অর্থমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম বাজেট। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানিয়েছে, আগামী অর্থ বছরের বাজেটের আকার হতে পারে পাঁচ লাখ ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকার মধ্যে। বাজেট প্রণয়নের অংশ হিসেবে শুরু হয়েছে প্রাক বাজেট আলোচনা। অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে আগামী মে মাস পর্যন্ত নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে এ আলোচনা চলবে। অন্যদিকে জুনের প্রথম সপ্তাহে ঈদুল ফিতর অনুষ্ঠিত হবে। তাই এ বছর বাজেট কোন তারিখে উপস্থাপন করা হবে সে বিষয়টি নিয়েও সরকারের শীর্ষ মহলে চিন্তাভাবনা চলছে বলে জানিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, আগামী বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ধরা হতে পারে ৮ শতাংশ। আর মূল্যস্ফীতির হার ধরা হতে পারে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির হার ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকেই ৬ শতাংশের কম ধরে বাজেট করা হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের গত তিন মেয়াদে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি ছিল ২০১০-১১ অর্থবছরে। ওই বছর এ হার ছিলো ১০ দশমিক ৯ শতাংশ।

সূত্র জানিয়েছে, সরকারের ‘রূপকল্প-২০২১’সহ অন্যান্য অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নে প্রয়োজন দক্ষ ও কার্যকর একটি জনপ্রশাসন। এজন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো দরকার বলে মনে করে সরকার। তাই চলতি (২০১৮-১৯) বাজেটে তিন হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জন্য। গত বছর অর্থ ব্যয়ের একটি রূপরেখা তুলে ধরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব ড. মোজাম্মেল হক খান অর্থ মন্ত্রণালয়কে আধা-সরকারি পত্র (ডিও) দিয়েছিলেন। সেই ডিও অনুযায়ী সরকার চলতি বাজেটে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে এ অর্থ বরাদ্দ দেয়।

সূত্রগুলো বলছে, প্রতিবছর বাজেটের আকার বাড়ে ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ হারে। গত ১০ বছরে তা বেশ কয়েকবার ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ হারেও বেড়েছে। আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা বাড়ছে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ হারে। চলতি অর্থ বছরের বাজেট ছিল চার লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বাজেটের আগে সরকার অনেকটাই স্বস্তিতে রয়েছে। অর্থবছর ২০১৮-১৯ শেষ না হতেই মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৯০৯ ডলার। এর আগে, গত ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে মাথাপিছু আয় ছিল এক হাজার ৭৫১ মার্কিন ডলার। গত ছয় মাসের ব্যবধানে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে ১৫৮ মার্কিন ডলার।

চলতি অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ কম হয়েছে। তবে আগামী বছর থেকে এটি বাড়বে বলে সরকার আশা করছে। বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা যাতে আবার ফিরে আসেন সেজন্য সরকার সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল জানান, অর্থবছর শেষে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশে। গত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির এই হার ছিল ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। মূলত শিল্প খাতের হাত ধরে প্রবৃদ্ধির আকার বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির আকার দাঁড়াবে ২৫ লাখ ৩৬ হাজার ১৭৭ কোটি টাকা। গত অর্থবছর এটি ছিল ২২ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধি সাধারণত তিনটি খাতের ওপর নির্ভর করে। এর মধ্যে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ, যা গত অর্থবছরে ছিল ৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ। সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ, যা গত অর্থবছরে ছিল ৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ। এ ছাড়া কৃষি খাতে চলতি অর্থবছর প্রবৃদ্ধি হবে ৩ দশমিক ৫১ শতাংশ, যা গত গত অর্থবছর ছিল ৪ দশমিক ১৯ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী আহম মুস্তাফা কামাল বলেছেন, ‘চলতি অর্থবছর সামষ্টিক অর্থনীতি খুব ভালো ছিল। তাই প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। যেমন– রফতানি, বিনিয়োগ, ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে অবস্থা ভালো ছিল।’ তিনি জানান, ২০২০ সালের পর পরবর্তী চার বছরে প্রবৃদ্ধি ডাবল ডিজিটে পৌঁছাবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, গত ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকেই প্রবৃদ্ধিতে সুবাতাস বইতে শুরু করে। ওই অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির প্রকৃত অর্জন ছিল ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত দুই বছরে খাদ্য উৎপাদনের দিক থেকে তেমন সাফল্য না এলেও বেড়েছে মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পের উৎপাদন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩৪৭ দশমিক ০৮ লাখ টন ধান উৎপাদন হলেও ২০১৬-১৭তে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৩৩৮ দশমিক ০২ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ উৎপাদন কম হয় ২ দশমিক ৬ শতাংশ। এ সময় আউশের উৎপাদন বেশ কমে যায়। আগের বছরের তুলনায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এই চালের উৎপাদন কমে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। এছাড়া আমনের উৎপাদন কমে ১ দশমিক ৩ শতাংশ এবং বোরোর উৎপাদন কমে যায় ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। যদিও ২০১৮তে এসে এ অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। দেশে ধানের ফলন ভালো হয়েছে।

অপরদিকে ডিসেম্বর ২০১৬-এর তুলনায় ২০১৭-তে বেড়েছে মাঝারি ও বৃহৎ শিল্প উৎপাদন। দেখা যায়, এই দুই খাতে প্রবৃদ্ধির হার ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। বিগত বছরের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি হয় ৯ দশমিক ২ শতাংশ। এই সময় পরিধেয় বস্ত্র উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি হয় ১৫ দশমিক ০৬ শতাংশ। এছাড়া খাদ্যপণ্যে ৩৪ দশমিক ০৫ শতাংশ, ওষুধ শিল্পে ১৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ, চামড়া ও চামড়াজাত শিল্পে ৬৭ দশমিক ৫১ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, একটি দেশের ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে এক বছরে যে পরিমাণ দ্রব্যসামগ্রী উৎপাদন হয় এবং সেবা জোগান দেওয়া হয় তার বাজার মূল্যই জিডিপি বা প্রবৃদ্ধি। যাকে বলা হয়, মোট দেশজ উৎপাদন বা (জিডিপি)। গত কয়েক বছরে উৎপাদনের দিক থেকে অন্য এক কাতারে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশ। ছয় শতাংশের বৃত্ত ভেঙে বাংলাদেশে এখন গড় প্রবৃদ্ধির হার সাড়ে ৮ ভাগের কাছাকাছি। যদিও অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছিলো ৭ দশমিক ৮ শতাংশ।

অন্যদিকে, অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচকের নাম মূল্যস্ফীতি। পণ্যের প্রকৃত যে দাম তার চেয়ে বেশি দামে পণ্য কেনার অর্থই মূল্যস্ফীতি। বাজারে পণ্যমূল্য বাড়লেই তৈরি হয় অস্বস্তি, তখন নির্দিষ্ট মূল্যের চেয়ে বেশি দামে কিনতে বাধ্য হয় ক্রেতা। চলতি বাজেটে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণ হলেও বছরের মাঝামাঝিতে এসে সংশোধন করে লক্ষ্য নির্ধারণ হয়েছে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ পণ্যের দাম বেড়েছে, তাই মূল্যস্ফীতির পারদ ঊর্ধ্বমুখী। তবে, সবদিক বিবেচনা করে আগামী অর্থবছরের জন্য মূল্যস্ফীতি ৫ থেকে সাড়ে ৫ শতাংশের মধ্যেই আটকে রাখতে চায় সরকার।




/এসআই/এমএএ/

লাইভ

টপ