বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা: এক উৎপাদন বাড়লেও সঞ্চালন ও বিতরণ পদ্ধতি মানসম্মত নয়

Send
সঞ্চিতা সীতু
প্রকাশিত : ০৮:০০, এপ্রিল ১৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২৮, এপ্রিল ১৬, ২০১৯

 

বিদ্যুৎ

সব সূচকেই দেশের বিদ্যুৎ খাতের পরিবর্তন দাবি করা হচ্ছে। গত ১০ বছরে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন যেমন বেড়েছে, বেড়েছে সঞ্চালন ও বিতরণ সক্ষমতার সঙ্গে গ্রাহকসংখ্যাও। তবে খোদ রাজধানীতেই একটু-আধটু ঝড়বৃষ্টিতে এখনও বিদ্যুৎ চলে যায়। কারণে-অকারণে হয় লোডশেডিংও। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মানসম্মত সঞ্চালন আর বিতরণব্যবস্থায় এখনও গলদ রয়ে গেছে।

প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেছেন, আগের চেয়ে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি এখন অনেক ভালো। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ গেলেও তা লোডশেডিং নয়, বিদ্যুৎবিভ্রাট। উৎপাদন যথেষ্ট পরিমাণ হলেও কেবল বিদ্যুতের সঞ্চালন এবং বিতরণের উন্নয়ন করা হচ্ছে। এ কারণে বিদ্যুৎবিভ্রাট হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

গত ১০ বছরে দেশে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য তিন হাজার ৪৯৩ সার্কিট কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন বেড়েছে। এর আগে ২০০৯ সালে সঞ্চালন লাইনের পরিমাণ ছিল আট হাজার সার্কিট কিলোমিটার, যা এখন হয়েছে ১১ হাজার ৪৯৩ সার্কিট কিলোমিটার।

একই সময়ে গ্রিড সাবস্টেশনের ক্ষমতা বেড়েছে ২৪ হাজার ১০৬ এমভিএ (মেগা ভোল্ট অ্যাম্পিয়ার)। ২০০৯ সালে যা ছিল ১৫ হাজার ৮৭০ এমভিএ, এখন বেড়ে হয়েছে ৩৯ হাজার ৯৭৬ এমভিএ।

বিদ্যুৎ বিতরণ লাইনের পরিমাণও এই সময়ে দুই লাখ ৪৮ হাজার কিলোমিটার বেড়েছে। ২০০৯ সালে যা ছিল দুই লাখ ৬০ হাজার কিলোমিটার, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ আট হাজার কিলোমিটারে।

কিন্তু এরপরও মানসম্মত বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা কেন অধরাই থেকে যাচ্ছে? এমন প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ বিতরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমাদের আগের লাইনগুলোর বেশিরভাগই পুরনো। এই পুরনো লাইনে বিদ্যুৎ সরবরাহ করলে এমন হবেই।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, গত মাসের শেষের দিকে এ বছরের প্রথম কালবৈশাখীর আঘাতে ঢাকা শহরের কোনও কোনও এলাকার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল ছয় থেকে ২১ ঘণ্টা পর্যন্ত। বিতরণ কোম্পানি বলছে, এই ঝড়ের গতিবেগ অস্বাভাবিক ছিল, যা থেকে বিতরণব্যবস্থাকে তারা রক্ষা করতে পারেনি।

তবে আবহাওয়াবিদ আবদুল মান্নান জানান, সেদিন বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৭০ কিলোমিটার। এই ধরনের গতিবেগের ঝড় বাংলাদেশে খুবই স্বাভাবিক। এর চেয়ে বেশি গতিবেগেও বাংলাদেশে কালবৈশাখী হয়।

অন্যদিকে, গ্রামাঞ্চলে সামান্য ঝড়বৃষ্টিতেই ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকাকে এখনও স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখা হয়।

জানতে চাইলে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী এটিএম হারুন অর রশীদ বলেন, ‘আমাদের অধিকাংশ বিতরণ লাইন পুরাতন। এ ছাড়া লাইনের ওপর গাছপালা রয়েছে। ঝড় এসে ডালপালাগুলো লাইনের ওপর পড়ে, যাতে বিদ্যুৎবিভ্রাট তৈরি হয়। তবে আমরা তা মেরামতের চেষ্টা করি।’

তিনি বলেন, ‘অটোমেটিক না হওয়ার কারণে আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা খুঁজে পেতে অনেক সময় লেগে যায়। এতে কখনও কখনও গ্রাহক ভোগান্তির মধ্যে পড়ে। তবে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করি গ্রাহকের সন্তুষ্টির জন্য।’

হারুন অর রশীদ আরও বলেন, ‘এই ভোগান্তি কাটাতে আমরা মাটির নিচ দিয়ে বিদ্যুতের তার নেওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু এটি একটি ব্যয়বহুল প্রকল্প। ফলে পাইলট প্রকল্প হিসেবে আমরা কাজ শুরু করেছি।’

বিদ্যুতে নিজেদের অর্জনের পরিসংখ্যান থাকলেও গ্রাহক সন্তুষ্টির বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের মূল্যায়ন নেই বললেই চলে। গত বছর পরিসংখ্যান ব্যুরোর মাধ্যমে গ্রাহক সন্তুষ্টির বিষয়ে জরিপ করা হলেও সেটি করা হয় শীতকালে। এ সময় এমনিতেই বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকে। গ্রীষ্মকালে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকলেও এই সময়ের কোনও জরিপ করা হয়নি।

একাধিক গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখনও বিতরণ পরিস্থিতি নিয়ে তারা সন্তুষ্ট নন। বিশেষ করে আবাসিক গ্রাহকদের ভোগান্তি চলছেই।

উত্তরার বাসিন্দা ইভা সুলতানা বলেন, “আগের চেয়ে বিদ্যুতের অবস্থা ভালো। লোডশেডিংও আগের তুলনায় কম হয়। তবে ঝড়বৃষ্টি শুরু হলে বিদ্যুৎ একবার গেলে আর আসার নামই নেয় না। এরপর স্থানীয় অফিসে ফোন দিলে বেশিরভাগ সময় ফোনই ধরে না। আর ধরলেও জানায়, ‘আমরা বিষয়টি দেখতেছি’।”

একই অভিযোগ মোহম্মদপুরের বাসিন্দা শামসুল হক বিপুর। তিনি বলেন, ‘মার্চের শেষদিকে কালবৈশাখী ঝড়ের রাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ঠিক ২১ ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা হয়।’

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের এত কথা বলা হলেও বাস্তবে সেই ভোগান্তি কিছু রয়েই গেছে। ঝড়বৃষ্টি হলেই বিদ্যুৎ নেই।

/এইচআই/এমএমজে/

লাইভ

টপ