বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা: তিন সঞ্চালনে আর্থিক ঘাটতি পূরণ, বিতরণে দ্বৈত লাইন দরকার

Send
সঞ্চিতা সীতু
প্রকাশিত : ০৬:৩৮, এপ্রিল ১৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৩৪, এপ্রিল ১৮, ২০১৯

বিদ্যুৎ

সঞ্চালনে আর্থিক ঘাটতি মেটাতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি অংশগ্রহণ আর উন্নত বিতরণব্যবস্থা গড়তে দরকার দ্বৈত সরবরাহ লাইন। বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ দুই কাজ করতে পারলে সঞ্চালন ও বিতরণের সংকট দূর হবে। গ্রাহকের ঘরে যাবে মানসম্মত বিদ্যুৎ।

উন্নত বিতরণব্যবস্থায় একসঙ্গে দুটি লাইন থাকে। এ পদ্ধতিকে বলা হয় ‘এন মাইনাস ওয়ান’ বিতরণব্যবস্থা। কোনও কারণে একটি লাইন চলে গেলে অন্য লাইনটি সঙ্গে সঙ্গে চালু হয়ে যাবে। গ্রাহক তার বিদ্যুতের লাইনের এই পরিবর্তন বুঝতেও পারবে না। বিতরণ কোম্পানির প্রকৌশলীরা এর মধ্যে গ্রাহকের ক্ষতিগ্রস্ত লাইনটি সংস্কার করে ঠিক করে রাখবেন। উন্নত দেশের এমন বিতরণব্যবস্থা এখানে চালু করতে পারলে বিতরণের ক্ষেত্রে গ্রাহক ভোগান্তি কমানো সম্ভব।

পাওয়ার সেলের পরিচালক আমজাদ হোসেন বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদন এখন অনেক বেশি, কিন্তু বিতরণ ও সঞ্চালন লাইনের কারণে সেই বিদ্যুতের সুবিধা পাচ্ছে না গ্রাহকরা। বিশেষ করে শিল্প গ্রাহকরা চায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। আর নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে হলে দুটি লাইন পাশাপাশি স্থাপন করতে হবে, যাতে এক মিনিটের জন্যও বিদ্যুৎ না যায়।’

তিনি বলেন, “বিশ্বের অনেক দেশে ‘এন মাইনাস ওয়ান’ পদ্ধতি বা ডুয়েল ফিডিং ব্যবস্থা, অর্থাৎ একটা গেলে আরেকটা চালু হবে, এমন পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। প্রথমত, বিতরণব্যবস্থার মধ্যে বিতরণ লাইন থেকে সঞ্চালন লাইন পর্যন্ত ডুয়েল ফিডিং ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিল্প গ্রাহক এলাকা যেমন, জিরাবো, আশুলিয়ায় অনেক শিল্প কারখানা, সেসব জায়গায় মূলত আরইবিকে (পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড) বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হবে।”

আমজাদ হোসেন বলেন, ‘যদি সেখানে ডুয়েল ফিডিং সিস্টেমে অর্থাৎ দুইটি লাইন পাশাপাশি থাকবে, একটায় বিদ্যুৎ চলে গেলে সঙ্গে সঙ্গে যাতে অন্যটিতে বিদ্যুৎ চলে আসে। এভাবে বিদ্যুৎ দেওয়া গেলে শিল্পগ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়া যাবে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ বিতরণ ও সঞ্চালনের উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ দরকার, যা সরকারের একার পক্ষে জোগাড় করা কঠিন। ইতোমধ্যে সরকার দেশের বেসরকারি খাতকে সঞ্চালন লাইনে বিনিয়োগের জন্য উদ্বুদ্ধ করছে। তবে এখনও এ-সংক্রান্ত নীতিমালা চূড়ান্ত হয়নি।

১৯৯৬ সালে আইপিপি নীতিমালা চূড়ান্ত করা হয়। এতে বেসরকারি খাত বিদ্যুৎ উৎপাদনে অংশ নেয়। তবে এখনও সঞ্চালন ও বিতরণের পুরোটা সরকারের হাতে রয়েছে।

এই খাতের সংস্কারে কী করা প্রয়োজন, এমন প্রশ্নের জবাবে পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান এএসএম আলমগীর হোসেন বলেন, ‘সঞ্চালন ও বিতরণের ক্ষেত্রে আর্থিক সমস্যা একটি বড় বিষয়। এ কারণে বিওওটি (বিল্ড ওন অপারেট ট্রান্সফার) পদ্ধতিতে সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন করা যেতে পারে। বিশেষ করে পিজিসিবি (পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ) প্রাইভেট পার্টনারশিপে যেতে পারে। জয়েন্ট ভেঞ্চার করার ক্ষেত্রে তাদের আকর্ষণীয় অফার দিতে হবে। বেসরকারি কোম্পানি হুইলিং চার্জ নিতে পারে, এখন যেমন পিজিসিবি নেয়।’

বিতরণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের আসলে কোয়ালিটি বিদ্যুতের দিকে নজর দেওয়া দারকার। এখন মূলত করা হচ্ছে এক্সপানশন। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ। বেশিরভাগ এলাকা আরইবি। সেখানে মানসম্মত বিদ্যুৎ দেওয়া জরুরি। এলাকাভিত্তিক স্মার্ট গ্রিড করে দেখা যেতে পারে। আর শহর এলাকায় আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবল করা জরুরি। এখন ঝড়বৃষ্টি হলেই বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে না। আন্ডারগ্রাউন্ড হলে এসব সমস্যা থাকবে না।’

জানতে চাইলে বুয়েটের অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ‘উৎপাদনে যেভাবে বিনিয়োগ আসে তেমনভাবে সঞ্চালন ও বিতরণ প্রকল্পে বিনিয়োগ আসে না।’

তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছরের বাজেটে উৎপাদনের ওপর জোর দিয়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যথেষ্ট উৎপাদনক্ষমতা হয়েছে আমাদের। এখন সঞ্চালন ও বিতরণে মনোযোগ দেওয়া দরকার। এজন্য আগামী বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি বিতরণ ও সঞ্চালন প্রকল্পে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন।’ এখন বিতরণ ও সঞ্চালনকে সামনে রেখে বাজেটের বরাদ্দ দেওয়া উচিত বলে মত দেন ইজাজ হোসেন।

বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সমস্যা কোথায় তা সরকার নিজেই জানে না। কোথায় কেন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব নয়, তার খবর কেউ রাখে না। কোনও কোনও ক্ষেত্রে উদাসীনতার কারণে এমন হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা শামসুল আলম বলেন, ‘সরকার বলছে তার উৎপাদনের অবস্থা ভালো, কিন্তু সঞ্চালন ও বিতরণের অবস্থা ভালো না। কিন্তু বিতরণ বা সঞ্চালনের কোথায় ভালো, কোথায় খারাপ, তা সে নিজেই জানে না। এজন্য এখন পর্যন্ত কোনও স্টাডি করা হয়নি। কোন সার্কিটের কত ক্ষমতা, কতটুকু বাড়ানো দরকার।’

তিনি বলেন, ‘ঢাকায় প্রায় ২০-২৫টা পয়েন্ট আছে, যেসব পয়েন্ট দিয়ে ঢাকায় বিদ্যুৎ পাঠানো হয়। সেই পয়েন্টে ঢাকায় কত ‍বিদ্যুৎ দরকার আর কত সরবরাহ করা হচ্ছে তার কোনও হিসাব নেই। সব সময় তো একইরকম চাহিদা থাকে না। চাহিদা আর বিতরণব্যবস্থার কোনও হিসাব নেই। সরকার ঢালাওভাবে যা বলছে তা গ্রহণযোগ্য নয়।’

শামসুল আলম বলেন, ‘২০১৫ সালের পর বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল। সেই সময়ও বলা হয়েছিল, বিতরণ ও সঞ্চালনের অবস্থা ভালো না। এখনও তা-ই বলছে।’

তিনি বলেন, এখন অনেক সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন আছে যেগুলোর ব্যবহার কম। এজন্য স্টাডি করা জরুরি।

 আরও পড়ুন: বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা-দুই: মানসম্মত সঞ্চালন-বিতরণে বড় বাধা বিনিয়োগ

                  বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা-এক: উৎপাদন বাড়লেও সঞ্চালন ও বিতরণ পদ্ধতি মানসম্মত নয়

 

/এইচআই/এমএমজে/

লাইভ

টপ