সব সূচকে পিছিয়ে জনতা ব্যাংক

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ১২:২৪, মে ১৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:১৯, মে ১৬, ২০১৯

জনতা ব্যাংকের লোগো

সব সূচকে পিছিয়ে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক।ব্যাংকটিতে একদিকে খেলাপি ঋণ বেড়েছে, অন্যদিকে বেড়েছে মূলধনের ঘাটতি। একইসঙ্গে বেড়েছে পরিচালন ব্যয়ও। গত বছরে ব্যাংকটির পরিচালন ব্যয় বেড়েছে ১০৬ কোটি টাকা। শুধু তাই নয়,  রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকটি গত অর্থ বছরে নিট লোকসান দিয়েছে ৬ হাজার ৬৩ কোটি টাকা । বাংলাদেশ ব্যাংকের এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতি বছর চার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ডিসেম্বরভিত্তিক তথ্য নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করে। সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে ২০০৭ সাল থেকে সমঝোতা চুক্তি (এমওইউ) করে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এমওইউতে খেলাপি ঋণ আদায়, ঋণ প্রবৃদ্ধি যথাযথ রাখা, লোকসানি শাখা ও পরিচালন ব্যয় কমানো, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরভিত্তিক আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

শীর্ষ আট ঋণখেলাপির কাছে আটকে আছে রাষ্ট্রীয় খাতের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাংক জনতা ব্যাংকের প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু দুটি গ্রুপের কাছেই ব্যাংকটির পাওনা প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল অঙ্কের ঋণ আদায়ের জন্য ব্যাংকটির ডিএমডি ও জিএমদের সমন্বয়ে একটি ‘বিশেষ মনিটরিং কমিটি’ গঠন করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, গত কয়েক বছর নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে এই ঋণগুলো দেওয়া হয়েছে।জনতা ব্যাংকের শীর্ষ আট ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুটি গ্রুপ ২০১৮ সালে নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে।

জানা গেছে, শীর্ষ আট ঋণখেলাপির মধ্যে শীর্ষে অবস্থান করছে ‘এ্যানটেক্স গ্রুপ’। বহুল আলোচিত এই গ্রুপের কাছে ব্যাংকের পাওনা ৪ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা। এর পরেই রয়েছে ক্রিসেন্ট গ্রুপ। এই কোম্পানির কাছে জনতা ব্যাংকের আটকে আছে ৩ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা।

এ প্রসঙ্গে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুছ ছালাম আজাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ক্রিসেন্ট গ্রুপ ও অ্যাননটেক্স গ্রুপের কাছ থেকে টাকা আদায়ে আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু আমরা তাদের সহযোগিতা পাচ্ছি না।’

জানা গেছে,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড.আবুল বারাকাত জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় ক্রিসেন্ট গ্রুপ ও অ্যাননটেক্স গ্রুপকে বড় অংকে ঋণ দেওয়া হয়। ২০০৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাঁচ বছর জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন ড. বারাকাত।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, এক বছরের ব্যবধানে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে সাড়ে তিন গুণ। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে এই ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৮১৮ কোটি। এক বছরের ব্যবধানে গত বছর (২০১৮) ডিসেম্বরে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ১৭ হাজার ৩০৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। ফলে এক বছরেই জনতার খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১১ হাজার ৪৮৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী,২০১৭ সালে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ১৪ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে ১৮ শতাংশ কমে তা ১২ হাজার ১৮৮ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। অন্যদিকে, ২০১৭ সালে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। ১৩৭ শতাংশ বেড়ে তা ১৭ হাজার ৯৯৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ২০১৭ সালে অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৫ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে ২৬ শতাংশ বেড়ে তা ৬ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ২০১৭ সালে রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৪ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে ৩ শতাংশ কমে তা ৪ হাজার ৪২৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত এই চার ব্যাংকের ৩টি প্রভিশন ঘাটতিতে ছিল। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের ৩ হাজার ৮৭ কোটি, অগ্রণী ব্যাংকের ৫৯৩ কোটি এবং রূপালী ব্যাংকের ৮৩৪ কোটি টাকা প্রভিশন ঘাটতি ছিল।

সূত্রমতে, ২০১৮ সালে শীর্ষ-২০ খেলাপির কাছ থেকে নগদ আদায় পরিস্থিতিও সন্তোষজনক ছিল না ব্যাংকগুলোর। এ সময়ে সোনালী ব্যাংক নগদ আদায় করেছে ১১৯ কোটি টাকা। জনতা করেছে ৯৯ কোটি, অগ্রণী করেছে মাত্র ১ কোটি ৭৪ লাখ এবং রূপালী ব্যাংক করেছে ৫ কোটি টাকা নগদ আদায়। অন্যান্য খেলাপিদের কাছ  থেকে সোনালী ব্যাংক ৮৮৮ কোটি, জনতা ব্যাংক ৩৮৪ কোটি, অগ্রণী ব্যাংক ৩১৭ কোটি ও রূপালী ব্যাংক ১৮০ কোটি টাকা আদায় করেছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী,পরিচালন ব্যয় আগের বছরের তুলনায় গত বছরে বেড়ে গেছে জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকের। ২০১৮ সালে পরিচালন ব্যয় প্রায় একই ছিল রূপালী ব্যাংকের ৭৭০ কোটি টাকা। জনতা ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় আগের বছরের চেয়ে ১০৬ কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় ২৮ কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। তবে সোনালী ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় প্রায় ৫২ কোটি টাকা কমে হয়েছে ১ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা।

পরিচালন ব্যয় কমে যাওয়া এবং পরিচালন আয় বেড়ে যাওয়ায় সোনালী ও রূপালীর নিট মুনাফা বাড়লেও নিট লোকসানের মুখে পড়েছে অগ্রণী ও জনতা। জনতার লোকসান হয়েছে ৬ হাজার ৬৩ কোটি টাকা এবং অগ্রণীর ২২৫ কোটি টাকা।

এদিকে ঋণ বিতরণে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে সোনালী ব্যাংকে। এই বছরের মার্চ পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকের আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছ ১ লাখ ৬ হাজার ৪৩১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঋণ বিতরণ করেছে ৪১ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা, যা সংগৃহীত আমানতের মাত্র ৩৯ দশমিক ২৯ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো সোনালী ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণের পরিমাণ ছিল ৪০ হাজার ১১৮ কোটি টাকা। মার্চে তা বেড়ে হয়েছে ৪১ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা। অর্থ্যাৎ তিন মাসে ব্যাংকটির ঋণ বিতরণ বেড়েছে মাত্র এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা বা ৪ শতাংশ। মার্চ পর্যন্ত বিতরণকৃত ঋণের মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে ১২ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা। মার্চ পর্যন্ত অবলোপন করা হয়েছে ৭ হাজার ৮৯ কোটি টাকা। অবলোপন যোগ করলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৯ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ঋণের ৪৬ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ। দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে খেলাপি ঋণে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে সোনালী ব্যাংক।

এ প্রসঙ্গে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, সোনালী ব্যাংকের যেসব শাখা লোকসানি ছিল ওইসব শাখা লোকসান হওয়ার কারণ চিহ্নিত করে তা থেকে উত্তরণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর ফলও পাওয়া যাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, সব শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীকে খেলাপি ঋণ আদায়ে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এতে খেলাপি ঋণ আদায় বেড়েছে। একইসঙ্গে কমেছে লোকসানি শাখা। সুফল হিসেবে পরিচালন মুনাফাসহ নিট মুনাফা বেড়েছে।

/টিএন/

লাইভ

টপ