ঋণ নিচ্ছে সরকার, পাচ্ছে না বেসরকারি খাত

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ২০:৫৬, জুন ০৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৫৯, জুন ০৩, ২০১৯





টাকাব্যাংক খাতে তারল্য সংকটের মধ্যেও বেড়েছে সরকারের ব্যাংক ঋণ। সে তুলনায় ব্যাংক থেকে ঋণ পাচ্ছে না বেসরকারি খাত। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ ছিল ১২ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। যা গত ৫৭ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০১৪ সালের আগস্টে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ ছিল ১১ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের ঋণ বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণে ব্যাংকের সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
বেসরকারি ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান বলেন, এডিআর বা ঋণ-আমানত অনুপাত কমানো নিয়ে ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরে এমনিতেই চাপে আছে। এর মধ্যে সরকারের ঋণ নেওয়া বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়া ব্যাংকগুলোর জন্য আরও কঠিন হবে। এতে ভবিষ্যতে সুদহার আরও বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, এই অর্থবছরে (গত জুলাই থেকে ২১ মে পর্যন্ত) ব্যাংক থেকে সরকার ১১ হাজার ৭০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এর অধিকাংশই নিয়েছে গত এক মাসে। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নিয়েছে ৭ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা। আর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নিয়েছে তিন হাজার ৮০৬ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে সরকার সবচেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছে গভর্নমেন্ট সিকিউরিটিজ ও ট্রেজারি বিল খাতে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, গত ২১ মে পর্যন্ত সরকারের কাছে ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে ৯৯ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে নেওয়া আছে ৭১ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা। আর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নিয়েছে ২৭ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা।
প্রসঙ্গত, গত অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে সরকার ৫ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে কোনও ঋণই নিতে হয়নি সরকারকে। বরং ওই অর্থবছরে আগের বাকি থাকা ১৮ হাজার ২৯ কোটি টাকা পরিশোধ করেছিল সরকার।
সরকারের প্রয়োজন মেটাতে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ঋণ নেওয়া হয়। যদি ৯১ দিন, ১৮২ দিন ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলের মাধ্যমে ঋণ নেয়, তাহলে সেটা স্বল্পমেয়াদি ঋণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই ধরনের ঋণের বিপরীতে সুদহার হচ্ছে সাড়ে ৪ থেকে ৫ শতাংশ। আর বন্ডের মাধ্যমে সরকার ২ বছর, ৫ বছর, ১০ বছর, ১৫ বছর ও ২০ বছর মেয়াদি ঋণ নেয়। এ ধরনের ঋণে সুদহার ৬ দশমিক ৩২ থেকে ৮ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে সরকারের যে পরিমাণ ব্যয় বেড়ে গেছে সেই হারে আয় বাড়েনি। একই সঙ্গে অর্থবছরের শেষ সময়ে উন্নয়ন কাজের গতি বেড়ে যাওয়ায় সরকারের ঋণ বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সরকারের রাজস্ব আদায় কমে যাওয়ার পাশাপাশি বৈদেশিক অনুদানও কমে গেছে।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, একদিকে বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত দিচ্ছে না। এর ফলে ব্যাংকের ঋণ আদায় কমে গেছে। আবার নতুন আমানত সেই তুলনায় আসছে না। এতে বেশির ভাগ ব্যাংকই নগদ টাকার সংকটে পড়েছে। এতে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য কমে গেছে। দেড় বছর আগে যেখানে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল সোয়া লাখ কোটি টাকা, সেটি এখন কমে দাঁড়িয়েছে ৬৩ হাজার কোটি টাকায়। এখান থেকে সরকার ঋণ পেলেও বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ করতে পারছে না ব্যাংকগুলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, টানা কয়েক মাস ধরে অব্যাহতভাবে কমছে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি। গত জানুয়ারিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ২০ শতাংশ। এরপর ফেব্রুয়ারিতে তা কমে ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশে দাঁড়ায়। মার্চে আরও কমে হয় ১২ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং সর্বশেষ এপ্রিলে কমে দাঁড়ায় ১২ দশমিক ০৭ শতাংশে। এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, এ বছরের এপ্রিলে বেসরকারি খাতের ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৯ কোটি টাকা। যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৮ লাখ ৮১ হাজার ৫১০ কোটি টাকা।

/এইচআই/

লাইভ

টপ