অবৈধ ও অপ্রদর্শিত আয় আলাদা হবে কীভাবে

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ১০:১৬, জুন ১৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:১৮, জুন ১৮, ২০১৯

টাকা

অবৈধ আয় আর অপ্রদর্শিত আয় যদি আলাদা করা সম্ভব হয়, তাহলে অবৈধ কালো টাকা জব্দ করা সহজ হবে বলে মনে  করেন  অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, অর্থনীতিতে কালো টাকা থাকার কারণে  সরকার যেমন রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে , তেমনই অর্থনীতি বঞ্চিত হচ্ছে  প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে। শুধু তাই নয়, কালো টাকার প্রভাবে কতিপয় গোষ্ঠীর কাছে অর্থনীতি জিম্মি হয়ে পড়ছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক ড. জায়েদ বখত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কালো টাকা অর্থনীতিতে থাকুক এমনটি আমরা না চাইলেও এটি অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে। তবে  অর্থনীতি থেকে কালো টাকা কমানো দরকার। সময় বেঁধে দিয়ে বিষয়টি শেষ করা উচিত।’  তিনি মনে করেন,  অবৈধ আয় আর অপ্রদর্শিত আয় যদি আলাদা করা সম্ভব হয়, তাহলে অবৈধ কালো টাকা জব্দ করা সহজ হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো— আমরা হয়তো কালো টাকাকে খুব বেশি খারাপভাবে দেখি না। যে কারণে এই টাকা জব্দ করার ঘটনাও নেই।

ড. জায়েদ বখত বলেন, ‘অনেকের কাছেই অবৈধভাবে বা অনৈতিকভাবে আয় করা টাকা আছে। অনেকেই অনৈতিকভাবে আয় করে বিদেশে বাড়ি করেছেন। এই ধরনের ব্যক্তিদের ব্যাপারে কোনও অভিযোগ উঠলে বা মিডিয়াতে আসলে, তখন তার ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া শুরু হয়। তার বিরদ্ধে মামলা হয়, তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়। কিন্তু এটা হয় মূলত দুনীর্তিকে কেন্দ্র করে।’

প্রসঙ্গত, অনৈতিক উপায়ে বা অবৈধ উপায়ে উপার্জিত সব অর্থই কলো টাকা। তবে বৈধ উপায়ে উপার্জিত কিন্তু অপ্রদর্শিত টাকাও এক অর্থে কালো টাকা। 

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কালো টাকা অর্থনীতিতে বিরাজমান। অপ্রদর্শিত টাকাও অর্থনীতি রয়েছে। আবার মাদকসহ অবৈধ ব্যবসার টাকা, ঘুষের টাকা অর্থনীতিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিভিন্ন ফর্মে, বিভিন্নভাবে এসব টাকা ব্যবহৃত হচ্ছে। এই কালো অর্থ দেশের ভেতরে আছে, আবার বাইরেও বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।’

সিপিডির এই গবেষক বলেন, ‘আমাদের ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেম এমনভাবে রয়েছে, তাতে এই দুটোর পার্থক্য করার সুযোগ খুবই কম। এই দুটোকে যদি পার্থক্য করা যায়, তাহলে দুটোর জন্য দুই রকম ট্রিটমেন্ট সরকার চিন্তা করতে পারে।’

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আরও  বলেন, ‘সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে  যুক্ত ব্যক্তিবর্গের সব ধরনের আয় চিহ্নিত করার পাশাপাশি এই আয় কর কাঠামোর ভেতরে আনার উপযুক্ত ফাইন্যান্সিয়াল ইন্সট্রুমেন্ট নেই।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যেভাবে লেনদেন হয় সেটার সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একটা সরাসরি যোগসূত্র থাকা দরকার ছিল। কিন্তু সেটা নেই। আবার পুঁজিবাজারে যে টাকা বিনিয়োগ হচ্ছে, তার তথ্য-উপাত্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় থাকলেও এনবিআরের কাছে থাকছে না। একইভাবে আন্তর্জাতিক ব্যবসা বাণিজ্যের লেনদেনের তথ্য সব পক্ষের কাছে থাকছে না। যাদও আন্তর্জাতিক ব্যবসা বাণিজ্যে যুক্ত ব্যক্তিরা ওভার ইনভয়েসিং বা আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমেও টাকা পাচার করছে, সেই লেনদেন সিস্টেমটাও এই ইন্টিগ্রেটেড সিস্টেমে নেই।

প্রয়োজন ইন্টিগ্রেটেড ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেম

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, কালো টাকা চিহ্নিত করা এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দেশে জরুরিভাবে একটা ইন্টিগ্রেটেড ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেম দরকার। যেটা এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে অনুপস্থিত।

তিনি উল্লেখ করেন, সব পক্ষের তথ্য এক সঙ্গে পাওয়া যায় এমন ধরনের ইন্টিগ্রেটেড ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেম ছাড়া ব্যবসায়ীদের কালো টাকা বিনিয়োগের যতই সুযোগ দেওয়া হোক না কেন (১০ শতাংশ কর দিয়ে সাদা করার সুযোগ)এতে অর্থনীতির খুব বেশি উপকার হবে না। এই সিস্টেম করতে খুব বেশি সমস্যা হওয়ার কথা নয়। যাতে আর্থিক লেনদেন একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। একটা জায়গায় সব রিপোর্টেড হবে। এতে সব পক্ষকে ঐকমত্য হতে হবে। সেই অনুযায়ী একটি প্রাতিষ্ঠানিক সেটআপ তৈরি করতে হবে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৭ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত ১০ বছরে  বিভিন্ন সরকার কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু এই সময়ে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা কালো থেকে সাদা হয়েছে। এর মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে সাদা হয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা। আর আওয়ামী লীগ সরকারের ২০০৯ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা সাদা হয়েছে।

কারা কলো টাকা সাদা করেন?

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘কালো টাকা তারাই সাদা করেন, যারা হয়তো নির্বাচনে দাঁড়াবেন, অথবা তারা ব্যাংকের শেয়ার কিনবেন, অথবা অন্য কোনও কারণেও কালো টাকা সাদা করেন। তবে বিনিয়োগের জন্য কেউ কালো টাকা সাদা করতে আসেন না।’

আবাসন খাতের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘এতদিন রিয়েল এস্টেট সেক্টরের জন্য কালো টাকা সাদা করার সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেখানে বিনিয়োগ হয়নি। যে কারণে এই সেক্টর আগের মতো এখনও রুগ্নই রয়ে গেছে।’

কী করা উচিত
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন,  সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত কালো অর্থনীতি  নিয়ন্ত্রণ করার। এ জন্য সরকারকে আগে কালো টাকা চিহ্নিত করতে ফিন্যান্সিয়াল ইন্সট্রুমেন্ট তৈরির জন্য  সচেষ্ট হবে।  কালো টাকা সাদা করার সময়কাল নির্দিষ্ট করে দেওয়া উচিত। তাহলে অনেকেই ভয়ে সাদা করতো। এছাড়া, ঘোষণার নির্দিষ্ট সময়ের পর সরকার  কলো টাকা জব্দ করার উদ্যোগ নিতে পারে।

তিনি উল্লেখ করেন, সাদা করার জন্য নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হয় না। আবার সাদা না করলে কোনও শাস্তির কথাও বলা হয় না। সে কারণে কালো টাকা সাদা করার ব্যাপারে অধিকাংশই আগ্রহ দেখায় না।

অবৈধ পথে আয়ের অর্থ বিনিয়োগের বিপক্ষে এফবিসিসিআই

বৈধ পথে আয় করা ‘কালো টাকা’ বিনিয়োগের পক্ষে থাকলেও অবৈধ পথে আয়ের অর্থ বিনিয়োগের বিপক্ষে রয়েছে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)।  শনিবার(১৫ জুন) এফবিসিসিআই কার্যালয়ে বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে ব্যবসায়ীদের এমন মনোভাবের কথা জানান সংগঠনটির সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম।

এসবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘কালো টাকা মানে যারা বৈধপথে আয় করেছে, কিন্তু কোনও কারণে কর পরিশোধ করেননি। ওইসব অর্থ বিনিয়োগের পক্ষে আমরা। এই ধরনের সুযোগ থাকলে বিনিয়োগ বাড়বে। কিন্তু অবৈধপথে আয়ের টাকা বিনিয়োগের বিপক্ষে আমরা।’

এদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে অঘোষিত বা অপ্রদর্শিত অর্থ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে শিল্প স্থাপনে বিনিয়োগ করার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, অঘোষিত অর্থের ওপর ১০ শতাংশ হারে কর দিলে ওই অর্থের উৎস সম্পর্কে আয়কর বিভাগ থেকে কোনও প্রশ্ন তোলা হবে না। জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয় এবং ভবন নির্মাণে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কর হার কমানোর প্রস্তাব করা হয়।

 

 

 

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ