বড়পুকুরিয়া দুর্নীতি: আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করলেই জ্বালানিতে বড় পরিবর্তন

Send
সঞ্চিতা সীতু
প্রকাশিত : ২০:১৫, জুলাই ২২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:১৭, জুলাই ২২, ২০১৯

দুদক-বড়পুকুরিয়াবড়পুকুরিয়া কয়লা খনির চুরির মামলায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দেওয়া অভিযোগপত্র আদালত গ্রহণ করলেই জ্বালানি খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। এরই অংশ হিসেবে অভিযুক্তদের সাময়িক বরখাস্তসহ বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি কর্তৃপক্ষ, রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি (আরপিজিসিএল) ও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আসতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

প্রসঙ্গত, রবিবার (২১ জুলাই)  ২৪৩ কোটি ২৮ লাখ ৮২ হাজার টাকার কয়লা চুরির মামলায় বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির ২৩ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) অনুমোদন করে দাখিল করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় দিনাজপুরে এই অভিযোগপত্র দাখিল করেন দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. শামছুল আলম। এরপর সোমবার (২২ জুলাই) ওই অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়। চার্জশিটভুক্ত আসামিদের মধ্যে অনেকেই এখনও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করছেন।

সূত্র জানায়, মামলার আসামি হওয়ায় এবার তাদের চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হবে। মামলা চলার সময়ে তারা আর চাকরিতে যোগ দিতে পারবেন না। দোষী সাব্যস্ত হলে চাকরি চলে যাবে।

এরআগে, ২০০৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের ১৯ জুলাই পর্যন্ত ১ লাখ ৪৩ হাজার ৭২৭ দশমিক ৯২ মেট্রিকটন কয়লা চুরি হয়। যার আনুমানিক মূল্য ২৪৩ কোটি ২৮ লাখ ৮২ হাজার ৫০১ টাকা ৮৪ পয়সা। এ ঘটনায় বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মোহাম্মদ আনিছুর রহমান বাদী হয়ে ১৯ জনের বিরুদ্ধে গত বছরের ২৪ জুলাই পার্বতীপুর থানায় মামলা করেন। মামলাটি দুদকের তফসিলভুক্ত হওয়ায় দুদকের কাছে মামলার নথি হস্তান্তর করে পুলিশ।

এই কয়লাচুরির ঘটনা অনুসন্ধান করতে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছিল দুদক। উপ-পরিচালক শামছুল আলমের নেতৃত্বে কমিটিতে আরও ছিলেন সহকারী পরিচালক এ এস এম সাজ্জাদ হোসেন ও উপ-সহকারী পরিচালক এ এস এম তাজুল ইসলাম। অনুসন্ধান কাজের তদারকি করেন দুদক পরিচালক কাজী সফিকুল আলম।

চার্জশিটভুক্ত আসামিদের মধ্যে রয়েছেন, বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান (অবসরপ্রাপ্ত), মো. আব্দুল আজিজ খান ( বর্তমানে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সদস্য), প্রকৌশলী খুরশীদুল হাসান (অবসরপ্রাপ্ত), প্রকৌশলী কামরুজ্জামান (বর্তমানে ব্যবস্থাপনা পরিচালক, রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড), মো. আমিনুজ্জামান (অবসরপ্রাপ্ত), প্রকৌশলী এস এম নুরুল আওরঙ্গজেব (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মতর্তা হিসেবে পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যানের দফতরে সংযুক্ত) ও প্রকৌশলী হাবিব উদ্দিন আহাম্মদ (সাময়িক বরখাস্ত), সাবেক মহাব্যবস্থাপক মো. শরিফুল আলম, (অবসরপ্রাপ্ত) মো. আবুল কাসেম প্রধানীয়া (মহাব্যবস্থাপক, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস বিতরণ কোম্পানি), আবু তাহের মো. নুর-উজ-জামান চৌধুরী (সাময়িক বরখাস্ত সাবেক মহাব্যবস্থাপক), ব্যবস্থাপক মাসুদুর রহমান হাওলাদার (বর্তমানে ম্যানেজার, সুন্দরবন গ্যাস বিতরণ কোম্পানি)।

এছাড়া বড়পুকুরিয়ার মো. আরিফুর রহমান (ম্যানেজার), সৈয়দ ইমান হাসান (ম্যানেজার), মোহাম্মদ খলিলুর রহমান (উপ-ব্যবস্থাপক), মো. মোর্শেদুজ্জামান (উপ-ব্যবস্থাপক) মো. হাবিবুর রহমান (উপ-ব্যবস্থাপক), মো. জাহেদুর রহমান (উপ-ব্যবস্থাপক),  সত্যেন্দ্র নাথ বর্মন (উপ-ব্যবস্থাপক), মো. মনিরুজ্জামান (সহকারী ব্যবস্থাপক), মো. শোয়েবুর রহমান (ব্যবস্থাপক), এ কে এম খালেদুল ইসলাম (উপ-মহাব্যবস্থাপক, সাময়িক বরখাস্ত), অশোক কুমার হালদার (ব্যবস্থাপক) ও মো. জোবায়ের আলী (উপ-মহাব্যবস্থাপক)।

অভিযুক্তরা সবাই পেট্রোবাংলার কর্মকর্তা হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদন প্রয়োজন হবে। এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার পরিচালক (প্রশাসন) মোস্তফা কামাল বলেন, ‘অভিযোগপত্র আদালত গ্রহণ করলে আমরা বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেবো। বড়পুকুরিয়া একটি আলাদা কোম্পানি। তাই বিষয়টি নিয়ে বড়পুকুরিয়াই সিদ্ধান্ত নেবে। আর পেট্রোবাংলায় যারা রয়েছেন, তাদের বিষয়ে আমরা ব্যবস্থা নেবো।’ তিনি বলেন, ‘চাকরি-বিধি অনুযায়ী আদালত চার্জশিট গ্রহণ করলে কর্মরতদের আমরা সাময়িক বরখাস্ত করবো।’

এই বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খুরশিদ আলম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুদকের চার্জশিট আদালতে গেছে। আদালত যদি মনে করে দুদকের দেওয়া তথ্য মামলা হওয়ার জন্য যথেষ্ট, তাহলে তারা চার্জশিট আমলে নিয়ে মামলাটির বিচার কাজ শুরু করবেন।’ তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, আমাদের চার্জশিটে আমলে নেওয়ার মতো যথেষ্ট তথ্য-উপাদান আছে। আমরা চাই এর বিচার প্রক্রিয়া শুরু হোক।’

দুদকের আইনজীবী আরও বলেন,  ‘সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট হয়ে গেছে, তারা আর কাজ করতে পারবেন না। আমলযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত  হিসেবে তারা যেকেনও সময় গ্রেফতার হতে পারেন। দুদক চাইলে এখন তাদের গ্রেফতার করতে পারে। আর চাকরি থাকবে কিনা, সেটা ঠিক করবে সরকার। তবে এই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘হঠাৎই জানতে পারলাম দুদক চার্জশিট দিয়ে দিয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে অনেকেই এখনও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করছেন। এখন আমরা দেখবো, আদালত কী করে? আর এসব অভিযোগ এলে স্বাভাবিকভাবেই কর্মকর্তাদের ওএসডি করা হয়।’ কর্মকর্তাদের মধ্যে যারা দায়িত্বে ছিলেন, তাদের বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ