চামড়া ‘সিন্ডিকেটে’ কারা?

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ২৩:১০, আগস্ট ১৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:৫৭, আগস্ট ১৬, ২০১৯

কাঁচা চামড়াগত ৩১ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে কম দামে বিক্রি হয়েছে পশুর চামড়া। দাম এতটাই কমেছে যে কাঁচা চামড়ার দাম না পাওয়ায় কোরবানিদাতাদের অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়ে চামড়া মাটিতেও পুঁতে দিয়েছেন। মৌসুমি ব্যবসায়ী অনেকে দাম না পেয়ে কাঁচা চামড়া রাস্তায়ও ফেলে দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে চামড়ার দাম কমে যাওয়ার বিষয়ে ‘চামড়া সিন্ডিকেট’কে দায়ী করে অনেকেই স্ট্যাটাস দিয়েছেন। এমনকি বিএনপির পক্ষ থেকেও অভিযোগ করা হয়েছে, কাঁচা চামড়ার দাম কমানোর পেছনে ‘ক্ষমতাসীন দলের এক নেতার সিন্ডিকেট’ কাজ করেছে। এদিকে কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে সিন্ডিকেটের কারসাজির বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তাহলে আসলেই কি কাজ করেছে চামড়া সিন্ডিকেট? কারা আছেন এই সিন্ডিকেটে? নাকি রয়েছে আরও অন্য কোনও কারণ?

চামড়ার বাজারের এই পড়তি দশা বা ধসের সঙ্গে ‘সিন্ডিকেট’ শব্দটা উড়ছেই। কোরবানিদাতা থেকে শুরু করে ট্যানারি মালিক সব পক্ষই এজন্য কথিত ‘সিন্ডিকেট’ কে দুষছেন। ঈদের দিন মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সরকার ঘোষিত চামড়ার দাম না পাওয়ায় কোরবানিদাতারা প্রথম ‘সিন্ডিকেট’ অভিযোগটি তোলেন। তাদের কাছ থেকে চামড়া কিনে আড়তদার বা পাইকারি চামড়া ব্যবসায়ীদের সামনে এসে দাম শুনে অক্কা পাওয়ার দশা হয় মৌসুমি ব্যবসায়ীদের। তারাও অভিযোগ করেন আড়তদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা ‘সিন্ডিকেট’ করে এবার চামড়ার বাজার কমিয়ে দিয়েছে। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে কাঁচা চামড়া আড়তদারদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন। এই সংগঠনের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন দাম করার নেপথ্যে থাকা ‘সিন্ডিকেট’কে খুঁজে বের করার জন্য গত মঙ্গলবার একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠনে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কাঁচা চামড়ার দাম কেন কমলো? কারা সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম কমালো তা খুঁজে বের করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ট্যানারি মালিকরা ‘সিন্ডিকেট’ করে বকেয়া পরিশোধ করেননি। ফলে হাতে টাকা না থাকায় তারা কাঁচা চামড়া কিনতে পারেননি।

আবার, কাঁচা চামড়ার দাম কমানোর নেপথ্যে আড়তদারদেরই দায়ী করেছে ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনও। ট্যানারি মালিকরা বলছেন, আড়তদারদের ‘সিন্ডিকেট’ চামড়ার দাম কমাতে ভূমিকা রেখেছে। সংগঠনটির চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ বলেছেন, আড়তদাররাই ‘সিন্ডিকেট’ করে মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের ঠকাচ্ছে।

চামড়া ব্যবসায়ী

প্রসঙ্গত, সরকার দাম নির্ধারণ করলেও ঈদের দুদিন আগে থেকেই বেশি দামে চামড়া না কেনার জন্য মৌসুমি ব্যবসায়ীদের একের পর এক পরামর্শ দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন চামড়া খাতের সব নেতারা। এ সময় ‘বেশি দামে চামড়া কিনলে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতি হতে পারে’, ‘আড়তদারদের হাতে চামড়া কেনার টাকা নেই’, ‘আড়তদাররা এবার সব চামড়া কিনতে পারবেন না,’ ‘কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ করতে হতে পারে’, ‘লবণ ব্যবসায়ীরা ঈদের আগেই লবণের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে, এজন্য কাঁচা চামড়া কম দামে কিনতে হবে’-এমন মন্তব্য করেছেন তারা। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কোরবানিদাতাদের কাছ থেকে কাঁচা চামড়া কেনার ক্ষেত্রে। অতিরিক্ত সতর্ক হয়ে তারা ৮০ হাজার টাকা দামের গরুর চামড়ার দাম ২০০ টাকার বেশি বলেননি। কিন্তু, এত কম দামে চামড়া কিনেও তা আড়তদারদের কাছে বিক্রি করতে গিয়ে তারাই উল্টো ক্ষতিগ্রস্ত হন। লাভ তো দূরে থাক, অনেক স্থানে চামড়াই কিনতে চাননি আড়তদাররা। কেউ কেউ কিনলেও দাম যা বলেছেন তাতে গাড়ি ভাড়ার খরচও ওঠেনি বেশিরভাগ মৌসুমি চামড়া ক্রেতার। ফলে যারা সংরক্ষণের কথাও ভেবেছিলেন তারা উল্টো পথে গাড়ি ভাড়ার খরচ, লবণ কেনা ও মাখিয়ে সংরক্ষণের খরচ, এরপর আবারও গাড়িভাড়া দিয়ে পরে এরচেয়ে বেশি দাম পাবেন কিনা বা সেই দামে পোষাবে কিনা এসব ভেবে রাস্তাতেই কাঁচা চামড়া ফেলে চলে যান। অনেকে চামড়ার দামের কথা শুনে সেগুলো মাটিতেই পুঁতে ফেলেন। চামড়া নিয়ে দেশব্যাপী এই অসন্তোষের কারণে ঈদের একদিন পর কাঁচা চামড়া বিদেশে রফতানি করার অনুমতি দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন চামড়া বিদেশে রফতানি করলে এ শিল্পে ধস নেমে আসবে এমন মন্তব্য করে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সিদ্ধান্তটি বাতিলের দাবি জানায় সরকারের কাছে। কথা চালাচালির এই খেলা এখনও অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু, মাঝখান থেকে দাম একেবারেই পড়ে যাওয়ায় চরমভাবে বঞ্চিত হয়েছে এতিম-গরিব ও দুস্থরা। কারণ, রেওয়াজ অনুযায়ী কোরবানিদাতারা চামড়া বিক্রির টাকা এমন অসহায় মানুষদের হাতেই সাধারণত তুলে দিয়ে থাকেন। এসব কারণে সবাই দুষছেন অদৃশ্য ‘সিন্ডিকেট’কে।

পুঁতে ফেলা হচ্ছে কাঁচা চামড়াঅদৃশ্য সিন্ডিকেটের নাম প্রকাশ করতে কোনও পক্ষ রাজি না হলেও ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ বলেছেন, ‘চামড়ার দাম না পাওয়া ও বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী আড়তদাররা। বকেয়া টাকা আদায় হয়নি এমন দোহাই দিয়ে কোরবানির কাঁচা চামড়ার দাম কমিয়ে ফায়দা লুটেছেন অসাধু আড়তদাররা। ’

তবে কাঁচা চামড়া আড়তদারদের সংগঠনের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বলেন,‘‘ চামড়ার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করেন ট্যানারি মালিকরা। কাজেই ‘সিন্ডিকেট’ হলে সেখানেই হয়েছে। চামড়ার দাম কমে যাওয়ার পেছনে মূলত তারা দায়ী।’’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রতি বছর তারা আমাদের টাকা দিতো, আমরা চামড়া কিনতাম, এবার তারা টাকা দেয়নি, এ কারণে চামড়া কিনতে পারিনি। ফলে কাঁচা চামড়ার দাম পড়ে গেছে।’

কাঁচা চামড়ার দাম কমার নেপথ্য কারণ ‘টাকা’:
কাঁচা চামড়ার দাম এতটা কমে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা, পাইকারি ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা পরস্পরকে দায়ী করলেও এই দুই সংগঠনের নেতাদের একটি বক্তব্য অভিন্ন। উভয়পক্ষই বলছেন, ব্যাংক থেকে এ বছর ‘টাকা’ না পাওয়াটাই কাঁচা চামড়ার দাম কমার অন্যতম প্রধান কারণ।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ব্যাংক আমাদের এবার নগদ টাকা দেয়নি। যে কারণে এবার আমরা আড়তদারদের অন্যান্য বছরের মতো টাকা দিতে পারিনি। গত বছরগুলোর মতো এবার যদি ব্যাংক আমাদের টাকা দিতো তাহলে এই সমস্যা হতো না। সাভারে স্থানান্তর হতে গিয়ে আমাদের হাতেও কোনও টাকা নেই। ব্যাংক থেকে আগের নেওয়া টাকাগুলোও সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরে বিনিয়োগ হয়েছে।’

তবে চামড়ার দাম কমে যাওয়ার জন্য তিনি আন্তর্জাতিক বাজারের দামকেও আরেকটা কারণ হিসেবে মনে করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ব্যাংকের কাছে চামড়া কেনার জন্য টাকা চাইলাম। কিন্তু ব্যাংক এবার টাকা না দিয়ে আমাদের আগের ঋণগুলো রি-শিডিউল করে দিলো। ফলে ব্যাংকের খাতা-কলমে আমরা ৬শ’ কোটির বেশি টাকাও নিয়েছি বলা হলেও বাস্তবে আমরা তেমন কোনও টাকাই পাইনি। যে কারণে আড়তদারদের বিগত বছরগুলোর মতো কাঁচা চামড়া কেনার টাকা দেওয়া সম্ভব হয়নি। এতে এবার চামড়ার দাম পড়ে গেছে।’

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক টিপু সুলতানও বলছেন, টাকা না থাকাটাই কাঁচা চামড়ার দাম কমার অন্যতম প্রধান কারণ। তার বক্তব্য, ‘ট্যানারি মালিকদের কাছে আমাদের বকেয়া প্রায় সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা। প্রতি বছর কম-বেশি টাকা পেলেও এবার আমরা অনেকেই টাকা পাইনি। আমাদের প্রায় আড়াইশ আড়তদারের মধ্যে মাত্র ২০ থেকে ৩০ জন চামড়া কিনতে পারছেন। ফলে চামড়ার দাম পড়ে গেছে।’

চামড়ার দাম কমে যাওয়ার আরেকটি কারণ ‘লবণ’:

ট্যানারি ও আড়তদার ছাড়াও এর সঙ্গে এবার আরও একটি ‘সিন্ডিকেট’ যোগ হয়েছে। সেটি হচ্ছে ‘কতিপয় লবণ ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেট’। ঈদের রাতে এক বস্তা (৬০ কেজি) লবণের দাম ১২৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা হয়েছে। অথচ এক সপ্তাহ আগে এর দাম ছিল অর্ধেক। হুট করে লবণের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই সংরক্ষণের জন্য চামড়া কিনতে সাহস পায়নি। চামড়ার বাজারে বড় ধরনের বিপর্যয়ের এটাও একটি কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।

ছাত্রলীগ যুবলীগের দাপট:

চামড়া খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তিন-চার বছর আগেও চামড়ার বাজার ভালো ছিল। তবে ওই সময়গুলোতে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় ছাত্রলীগ যুবলীগের দাপটে সাধারণ ব্যবসায়ীরা সুষ্ঠুভাবে চামড়া কিনতে পারেননি। তারা চামড়া কিনে তাদের নির্ধারিত দামে আড়তদার বা পাইকারি ব্যবসায়ীদের কিনতে বাধ্য করতেন- চামড়ার বাজারে এমন অভিযোগ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশিরভাগ ব্যবসায়ীর। ফলে এর একটা বৈরী প্রভাব তৈরি হয়েছে গত দুই বছর ধরে। এ বছর দলীয় কর্মীরা মাঠে ছিলেন না। কিন্তু, এর একটা নেতিবাচক প্রভাব আগেই ব্যবসায়ীদের মধ্যে পড়ে। এ কারণে পাইকারি ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগই চামড়া কেনার ক্ষেত্রে আগ্রহ দেখাননি।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক টিপু সুলতান বলছেন, ‘আগের বছরগুলোর নৈরাজ্যের প্রভাব এবারের বাজারে পড়েছে।’

তিনি বলেন, ‘গত বছরও কোরবানিদাতারা চামড়ার দাম কম পেয়েছেন। গতবারও এই সমস্যা হতো পারতো। তবে সেটি এবার এসে পড়েছে।’

ফলে চামড়ার বাজারে ‘সিন্ডিকেট’ আছে কী নেই এর জবাব শেষ পর্যন্ত খুঁজে বের করতে হবে সরকারকেই। তবে আশার কথা হচ্ছে, ট্যানারি মালিকরা বলেছেন আগামী শনিবার থেকে তারা চামড়া কেনা শুরু করবেন।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে সারা বছর যে সংখ্যক পশু জবাই হয়, তার অর্ধেক হয় এই কোরবানির মৌসুমে। সরকারি হিসাবে এবারও প্রায় সোয়া কোটি পশু জবাই করা হয়েছে। কোরবানি যারা দেন, তাদের কাছ থেকে কাঁচা চামড়া কিনে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বিক্রি করেন পাইকারদের কাছে। পাইকাররা সেই চামড়ায় লবণ দিয়ে সংরক্ষণের প্রাথমিক কাজটি সেরে বিক্রি করেন ট্যানারিতে। এ সময়ই সবচেয়ে বেশি চামড়া সংগ্রহ করেন ট্যানারি মালিকরা। বাংলাদেশের ২২০টি ট্যানারি থেকে বছরে প্রায় ২৫০ কোটি বর্গফুট কাঁচা চামড়া (হাইড ও স্কিন) প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এরমধ্যে ৬৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ গরুর চামড়া।

/টিএন/এমওএফ/

লাইভ

টপ