কাঁচা চামড়ার দাম বিপর্যয়, দায় কার ?

Send
শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত : ০৭:৪৭, আগস্ট ১৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৫৯, আগস্ট ১৬, ২০১৯

কাঁচা চামড়া

লাখ টাকা দিয়ে কেনা কোরবানির গরুর চামড়ার দাম এবছর মাত্র তিনশ’ থেকে চারশ’ টাকা। ২০ হাজার টাকা দিয়ে কেনা খাসির চামড়ার দাম ৬০ টাকা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেছে যে মসজিদ মাদ্রাসা বা এতিমখানা কর্তৃপক্ষের লোকজনও এখন আর কোরবানির পশুর চামড়া নেওয়ার জন্য তেমন আগ্রহ দেখায় না। বাড়ির পাশের গরিব লোকেরাও এখন আর সাহায্য বাবদ চামড়ার টাকা দাবি করেন না। কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে এতটা অনাগ্রহ আগে কখনোই ছিল না। আড়তদারদের দাবি, নগদ টাকা না থাকায় তারা এবছর বেশি দামে চামড়া কিনতে পারেননি। আর ট্যানারি মালিকদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় চামড়ার দাম কমে গেছে। এছাড়াও গত বছর যে পরিমাণ চামড়া কেনা হয়েছে, তার অর্ধেকই রয়ে গেছে। যেহেতু চাহিদা কম, সেহেতু চামড়ার দামও কম। যা গত ৩১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।    

জানা গেছে, কোরবানি করা পশুর কাঁচা চামড়া কেনাবেচা ও সংরক্ষণ করা না করা নিয়ে কেলেঙ্কারির অন্ত নাই। কাঁচা চামড়া ন্যায্য দামে কেনা না কেনা নিয়ে সিন্ডিকেটের অভিযোগও রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে কাঁচা চামড়ার দাম ঠিক করে দেওয়ার পরও সেই দামে ট্যানারি মালিকরা কেনেন না, সেই অভিযোগও পুরনো। কিনলেও সময়মতো টাকা পরিশোধ করেন না, এমন অভিযোগও কাঁচা চামড়ার আড়তদারদের। গত কয়েকবছর ধরেই চামড়া নিয়ে এই সংকট চলছে। কিন্তু এ নিয়ে এবছর পরিস্থিতি কঠিন আকার ধারণ করেছে।

ন্যায্য দাম না পেয়ে কাঁচা চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলা, রাস্তা বা ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। সংকট নিরসনে সরকার এই প্রথম কাঁচা চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর পরেও সমস্যার সুরাহা হয়নি। কাঁচা চামড়ায় এই বিপর্যয়ের কারণে মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছেন। পাশাপাশি কোরবানির পশুর চামড়ার ওপর নির্ভরশীল মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানার কর্তৃপক্ষ ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছেন। দেশে অনেক মাদ্রাসা ও এতিমখানার বছরের কয়েক মাসের খরচের টাকা এই চামড়া থেকে পাওয়া অর্থের ওপর নির্ভরশীল। কাঁচা চামড়ার এই বিপর্যয়ে দায় কার - প্রশ্ন সংশ্লিষ্টদের।

জানা গেছে, ১৯৮৯ সনে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা দিয়ে কেনা গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে ৭শ’ থেকে ৮শ’ টাকায়। ১৬শ’ থেকে ১৮শ’ টাকা দামের একটি খাসির চামড়া বিক্রি হয়েছে দেড়শ’ টাকায়। আর এ বছর এক লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকায় কেনা গরুর চামড়া এক হাজার টাকায় বিক্রি করতে পেরেছেন কোনও কোরবানিদাতা এমন সংবাদই শোনা যায়নি দেশের কোথাও। আর যত টাকা দিয়েই কেনা হোক একটি খাসির চামড়া এবছর একশ’ টাকায় কেউ বিক্রি করতে পেরেছেন এমন রেকর্ডও নেই।

রামপুরা নতুনবাগ জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম মাদ্রাদার মুহাদ্দিস মাওলানা ওয়ালিউল্লাহ আরমান বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোর বছরের ৩ থেকে চার মাসের খরচ যোগান হতো এই চামড়া দিয়ে। এ বছর তা হবে না। অতীতের ন্যায় এ বছরও কিছু চামড়া সংগ্রহ করেছিলাম। কিন্তু কম দামের কারণে তা বিক্রি করতে পারিনি। পরবর্তীতে পকেটের টাকা ব্যয় করে তা আড়তে দিয়ে এসেছি। কিন্তু টাকা পাইনি। আড়তদাররা বলেছেন টাকা পরে পৌঁছে দেবো।

পুঁতে ফেলা হচ্ছে কাঁচা চামড়া

জানতে চাইলে চামড়া শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, ‘বিশ্ববাজারে চামড়ার বিকল্প পণ্যের বাজার প্রশস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়াজাত পণ্যের বাজার ছোট হয়ে গেছে। এছাড়া চীনের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সম্পর্কে সমস্যা তৈরি হওয়ায় চামড়ার বাজারে বড় প্রভাব ফেলেছে। তাই চাহিদা কমে গেছে। গত বছর কেনা চামড়াও আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। সেখান থেকে রয়ে গেছে প্রায় অর্ধেক কাঁচা চামড়া। তাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী আমরা এবছর কাঁচা চামড়া কিনতে পারবো না, যা প্রায় চূড়ান্ত। আর চাহিদা কমে যাওয়ায় দামও কমবে, এটিই স্বাভাবিক।  এর দায় আমরা কিভাবে নেবো?’

শাহীন আহমেদ জানান, ‘শুধু বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়াই সমস্যা নয়। এর বাইরেও সমস্যা রয়ে গেছে, আর তা হলো এ শিল্পের কমপ্লায়েন্স। এখনও চামড়া শিল্পগুলোকে পুরোপুরি কমপ্লায়েন্স করা যায়নি। সাভারের হরিনধরার চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারটিকে শতভাগ কার্যকর করা যায়নি। সরকারের পক্ষ থেকে বিসিক এবং ট্যানারি পল্লির কর্তৃপক্ষ এই শোধনাগারটি ৭০ শতাংশের বেশি কার্যকর করা হয়েছে দাবি করলেও তা সঠিক নয়। যে কারণে বিদেশি বায়াররা অর্ডার কমিয়ে দিয়েছে।’

কাঁচা চামড়া আড়তদারদের সমিতির সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, ‘সরকার নির্ধারিত দামে আমরা ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়া বিক্রি করতে পারি না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে তারা প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে তা তারা রক্ষা করেন না। এছাড়া ট্যানারি মালিকরা কাঁচা চামড়ার দাম বকেয়া রাখেন। গতবছরের টাকা এখনও পাওনা রয়েছে। এই টাকা আদায় করার দায় তো কেউ নেয় না।’ 

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মফিজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, ‘পৃথিবীর যে কোনও দেশের তুলনায় বাংলাদেশে চামড়ার দাম কম। আর চামড়াজাত পণ্যের দাম বিদেশ দূরে থাক, দেশে কোন পণ্যটির দাম কমেছে? কাজেই ব্যবসায়ীদের ব্যাখ্যা সঠিক নয়। তাদের ব্যাখ্যার মধ্যে অসত্যতা রয়েছে।’

তার আশাবাদ, ‘চামড়া নিয়ে সংকট কেটে যাবে। সরকারের উদ্যোগে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা সরকার নির্ধারিত দামেই চামড়া কিনবেন এবং তারা শনিবার (১৭ আগস্ট) থেকেই কিনবেন। ’

তিনি জানান, ‘কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণে লবণ লাগোনোর কাজে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের সহযোগিতার অনুরোধ জানিয়ে ইতোমধ্যেই প্রতি জেলার ডিসি এবং ইউএনওদের নির্দেশ দেওয়ার পর বুধবার তাদের কাছে লিখিত চিঠিও পাঠানো হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, চামড়া জাতীয় সম্পদ। এটিকে মাটিতে পুঁতে ফেলা, বা রাস্তায় ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া গর্হিত কাজ। এটি যারা করেছেন, তারা ঠিক কাজটি করেননি।’

এদিকে, নির্ধারিত মূল্যে কাঁচা চামড়া ক্রয়-বিক্রয় নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা চেয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কাঁচা চামড়ার গুণগত মান যাতে নষ্ট না হয়, সেজন্য স্থানীয়ভাবে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে চামড়া সংরক্ষণের জন্য ব্যবসায়ী ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানানো হচ্ছে।

 

/টিএন/

লাইভ

টপ