১০ বছরেও গ্রাহকের কাজে আসেনি ‘গ্যাস উন্নয়ন তহবিল’

Send
সঞ্চিতা সীতু
প্রকাশিত : ১৯:৩০, আগস্ট ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৩২, আগস্ট ১৯, ২০১৯

গ্যাসদেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, উত্তোলন, উন্নয়ন ও সংস্কার কাজে অর্থ বিনিয়োগের জন্য ২০০৯ সালের ৩০ জুলাই  গঠন করা হয় ‘গ্যাস উন্নয়ন তহবিল’। গ্রাহকের কাছ থেকে প্রতি ঘনমিটারে ৪৬ পয়সা করে করে কেটে নিয়ে এই তহবিলের অর্থ সংগ্রহ করা হয়। কম মূল্যে ভোক্তাদের কাছে গ্যাস সরবরাহ করাই ছিল এই তহবিলের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভোক্তাদের অভিযোগ— দীর্ঘ ১০ বছরেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি এই তহবিল। তারা বলছেন, তহবিল গঠনের আসল উদ্দেশ্যই অধরা থেকে গেছে। গ্রাহক পর্যায়ের গ্যাসের মূল্য তো কমেইনি, বরং দিন দিন অসহনীয় মাত্রাই বেড়ে চলেছে।

বাংলাদেশে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের তথ্যমতে, ২০০৯ সালের ৩০ জুলাই গ্যাসের মূল্য ১১ দশমিক ২২ ভাগ বাড়ানো হয়। ওই সময় গঠন করা হয় এই তহবিল। যা ২০০৯ সালের ১ আগস্ট থেকে কার্যকর করা হয়।তহবিল গঠনের আদেশে কমিশন বলছে, ওই দিনই গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ফলে যে অতিরিক্ত অর্থ পেট্রোবাংলার তহবিলে জমা হওয়ার কথা, তার পুরো অর্থ থাকবে এই তহবিলে। যা থেকে পাওয়া সুদও জমা হবে তহবিলে। পরবর্তী সময়ে গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর সময়ও তহবিলে ইউনিট প্রতি নির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।এখন যার প্রতি ঘনমিটারের মূল্য ৪৬ পয়সা। চলতি বছরে জুন পর্যন্ত এ তহবিলে জমা আছে ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত যেখানে জমা ছিল ১ হাজার ৬৫০ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।

বিইআরসি সূত্র জানায়, এ তহবিল থেকে রিগ ও কম্প্রেসর কেনা, তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানসহ ৩৩টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৩টি প্রকল্প সমাপ্ত হয়েছে। যেখানে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় তিন হাজার ৮৫৯ টাকা। এছাড়া আরও ১০টি প্রকল্প এখন চলমান আছে। এজন্য ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা। গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের ৬ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা ইতোমধ্যে খরচ হয়েছে। কিন্তু গ্রাহকের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচের মূল্যায়ন করা হয়নি একবারও।

জ্বালানি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০০৯ সালের ৩০ জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুলাইয়ে এই তহবিলের বয়স  ১০ বছর পূর্ণ  হলো। যদিও তহবিল ব্যবহারের নীতিমালা প্রকাশে জ্বালানি বিভাগ দেরি করায় প্রথম তিন বছর কোনও অর্থই ব্যয় করা যায়নি।২০১২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জ্বালানি বিভাগ তহবিল ব্যয়ের নীতিমালার গেজেট প্রকাশ করে। ওই গেজেটে বলা হয়েছে, তহবিলটির বয়স হবে ১০ বছর। পরবর্তী সময়ে সরকার এই তহবিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। সেই হিসেবেও সাত বছর তহবিল ব্যয়ের সুযোগ পেয়েছে পেট্রোবাংলা।কিন্তু এতে দেশীয় অনুসন্ধান এলাকা সেভাবে তো বাড়েইনি বরং সংকটের কবলে পড়ে উচ্চদরের লিকুফায়েড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) আমদানির দিকে ঝুঁকতে হয়েছে। তহবিল গঠনের পরও  গ্যাসের মূল্য বেড়েছে।

সবশেষ, গত ৩০ জুন এলএনজি আমদানির ব্যয় নির্বাহ করার জন্য ভোক্তা পযায়ে ৩৮ দশমিক ২ ভাগ গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, যে ভোক্তাকে মূল্য বৃদ্ধির কবল থেকে মুক্তি দিতে তার কাছ থেকে ১০ বছর আগে থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হলো, এখন তার ওপরই কেন মূল্য বৃদ্ধির খড়্গ ঝুলছে?

এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সামসুল আলম বলেন, ‘গ্যাসের মূল্য বাড়িয়ে সেই টাকা দিয়ে তহবিল গঠন করা হয় ঠিকই। কিন্তু সেই তহবিলের টাকা কোন কোন খাতে কীভাবে খরচ করা হবে, তার একটি কংক্রিট পরিকল্পনা করার কথা ছিল। এখন এই খাত থেকে টাকা খরচ করা হচ্ছে, প্রকল্প হচ্ছে ঠিকই কিন্তু সেই প্রকল্পের মাধ্যমে গ্যাসের আদৌ উন্নতি হচ্ছে কিনা অথবা কী করলে প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে গ্যাসের সরবরাহ আসলেই বাড়বে, সে বিষয়ে কোনও পরিকল্পনা নেই।’

এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘তহবিলের টাকা কোথায় কোথায় খরচ হচ্ছে, সেই হিসাব দিতে চায় না জ্বালানি বিভাগ। আমরা বারবার হিসাব চেয়েছি কিন্তু তারা বলতে চায় না। এখন এই টাকা আসলে কোথায় যাচ্ছে, তা যাচাই করা প্রয়োজন। আর সঠিক খাতে খরচ হলে তো গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর প্রয়োজনই হতো না।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তহবিল গঠন করলেই হবে না। এর সঠিক ব্যবহারও করতে হবে। আগে বলা হতো এখাতে পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন করা যেতো না। সবসময় বহুজাতিক কোম্পানির ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন অর্থ থাকার পরও কেন গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন করা যাচ্ছে না—তা নিয়েও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক হোসেন মনসুর বলেন, ‘গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর সময় এই তহবিল গঠন করা হয়। এর লক্ষ্য ছিল গ্যাস অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও মেরামত বা সংস্কার কাজ করা। এখন কী পরিমাণ কাজ হচ্ছে, তার হিসাব দেবেন এখন যারা এই কাজের সঙ্গে যুক্ত আছেন, তারাই।’

এদিকে, জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ১০ বছরে দেশের স্থলভাগে ভোলা নর্থ ছাড়া আর বড় কোনও সাফল্য আসেনি। নতুন করে যেসব এলাকায় দ্বিতীয় মাত্রার ভূকম্পন জরিপ করা হয়েছে সেখানেও ইতিবাচক কোনও খবর দিতে পারেনি পেট্রোবাংলা। তবে, দেশের অনেক এলাকা এখনও অনুসন্ধানের বাইরে রয়ে গেছে, যেখানে নজর দেওয়া উচিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জ্বালানি সচিব আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম সম্প্রতি জ্বালানি নিরাপত্তা দিবসের সেমিনারে বলেন, ‘বিদেশি কোম্পানির পাশাপাশি জ্বালানি অনুসন্ধানে দেশীয় উদ্যোগের আরও সম্প্রসারণ করা হবে।’ এরমাধ্যমে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে বলেও তিনি জানান।

 

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ