প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানসম্মত বিদ্যুৎসেবা কতদূর

Send
সঞ্চিতা সীতু
প্রকাশিত : ১২:৪১, আগস্ট ২৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:১২, আগস্ট ২৮, ২০১৯




নেত্রকোনার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি এলাকায় একটি বিতরণ লাইনের মধ্যে নির্মাণ করা হয়েছে পাঁচটি সাবস্টেশন। বিতরণ এলাকার কোথাও ত্রুটি দেখা দিলে, একই সময়ে সাবস্টেশনগুলো বন্ধ হয়ে যায়। এতে ভোগান্তি বাড়ে গ্রাহকের। তবে সাবস্টেশনগুলোর জন্য আলাদা সঞ্চালন লাইন থাকার বিধান রয়েছে, যা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি নিশ্চিত করতে পারেনি।

অন্যদিকে শহরে কোনও শিল্প গ্রাহককে বিদ্যুৎ দিতে এক্সেপ্রেস ফিডার নির্মাণ করে আলাদা সাবস্টেশন দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। যাতে বিদ্যুতের কোনও ঘাটতি না হয়। সেখানে পল্লী এলাকায় এক লাইনের মধ্যেই রাখা হচ্ছে কয়েকটি সাবস্টেশন। একটি লাইন থেকে বহু শাখা লাইন বের করে দেওয়া হচ্ছে। আর এ কারণে শাখা লাইনের শেষ প্রান্তের গ্রাহক মানসম্মত বিদ্যুৎ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) সূত্র বলছে, দেশের এমন ২০টি এলাকায় একটি ৩৩ কেভি লাইনের মধ্যেই পাঁচটি করে সাবস্টেশন রয়েছে। তাই ওইসব এলাকায় গ্রাহকদের জন্য মানসম্মত বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়ে উঠছে না। কিন্তু এই আরইবির আওতায় দেশের উৎপাদিত বিদ্যুতের ৫৫ ভাগ সরবরাহ করা হয়। সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন না হওয়ায় গ্রাহকরা উন্নত সেবা পাচ্ছেন না।

তথ্যমতে, সারাদেশে মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকসংখ্যা ৩ কোটি ৪৫ লাখ। এরমধ্যে ২ কোটি ৬০ লাখ গ্রাহক পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি)। অন্য ৫ বিতরণ সংস্থার গ্রাহক মাত্র ৮৫ লাখ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৮৫ লাখ গ্রাহকের জন্য বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন হচ্ছে। তবে আরইবির গ্রাহকরা মানসম্মত সেবা থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছেন যুগের পর যুগ।

এদিকে সম্প্রতি আরইবির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) সম্মেলনে নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়, এখন সেখানে আরইবির চাহিদা রয়েছে ২৮ মেগাওয়াট। কোনও রকমে সরবরাহ চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও আগামী গ্রীষ্মে চাহিদা ২৮ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাবে। এতে করে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে না।

এর প্রেক্ষিতে আরইবি তড়িঘড়ি করে এখন নেত্রকোনার জন্য নতুন একটি বিতরণ লাইন নির্মাণ করছে। কাজ সম্পন্ন হলে একটি বিতরণ লাইনে দুটি এবং অন্যটিতে তিনটি সাবস্টেশন দেওয়া হবে। ফলে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরইবির পদস্থ একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অনেক জেলার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জিএমরা চৌকস। তারা নতুন সাবস্টেশন নির্মাণের সময় নিজের এলাকায় সাবস্টেশন লাইনের ক্ষমতা বৃদ্ধিরও প্রস্তাব দেন। কিন্তু অনেকেরই এ বিষয়ে খুব একটা নজর নেই। ফলে ওইসব এলাকার সেবার মান বৃদ্ধি পাচ্ছে না।

অভিযোগ রয়েছে, গ্রাহকসংখ্যা বৃদ্ধিতে যেমন নজর দেওয়া হয়, তেমন গ্রাহকসেবা বৃদ্ধিতে জোর দিচ্ছে না আরইবি। যে কারণে দিনের পর দিন বিদ্যুৎ বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন গ্রাহকরা।

নড়াইলের কালিয়ার নোয়াগ্রামের বাসিন্দা মামুন রেজা অভিযোগ করেন, গত পাঁচ বছর ধরে তার এলাকায় লো ভোল্টেজ তীব্র আকার ধারণ করেছে। তার এলাকায় দিনে-রাতে বিদ্যুৎ না থাকা ও লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণার সঙ্গে লো ভোল্টেজের কারণে মানসম্মত বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না তিনি। এই অভিযোগ নিয়ে স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে তিনি যোগাযোগ করে জানতে পেরেছেন, তার গ্রামটি আরইবির সাবস্টেশন থেকে অনেক দূরে। এ কারণে লো ভোল্টেজের সমস্যার সমাধান সম্ভব না।

আরইবির অধিকাংশ গ্রাহকের অভিযোগ, বর্ষা ও গ্রীষ্মকালে তাদের বিদ্যুতের সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করে। বিশেষ করে বছরের মার্চ থেকে জুলাই এই পাঁচ মাস খুবই নাজুক অবস্থা থাকে। গ্রীষ্মে তীব্র লোডশেডিং থাকে আর বর্ষায় একবার বিদ্যুৎ গেলে আর আসার খবর থাকে না।

আরইবিতে বর্তমানে এক হাজার ১০০টি সাবস্টেশন রয়েছে। এর ক্ষমতা ১২ হাজার এমভিএ। আরইবির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বলছে, ৩৩/১১ কেভির আরও ২২০টি সাবস্টেশন নির্মাণ, ৩৩/১১ কেভি ১৯৫টি সাবস্টেশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে। ক্রমান্বয়ে এইসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মানসম্মত বিদ্যুতের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে গ্রাহকের।

পাওয়ার সেলের পরিচালক আমজাদ হোসেন এ সম্পর্কে বলেন, আরইবির সবকিছু ঢেলে সাজানো উচিত। তাদের বিতরণ ব্যবস্থা খুবই নাজুক পরিস্থিতিতে রয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় যেমন লাইনের ক্ষমতা কম, তেমনি তাদের সাবস্টেশনের পরিমাণও কম। জরাজীর্ণ পুরাতন লাইন দিয়ে মানসম্মত বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব না।

তবে আরইবির সদস্য (পরিকল্পনা) আব্দুস সালাম বলেন, আমরা চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাই। কিন্তু তারপরও বিশাল এলাকা, বিতরণ লাইন এবং এসব লাইনে মেরামতের কাজ থাকায় বিদ্যুৎ বিতরণে নানা সমস্যা হয়। সেক্ষেত্রে বিদ্যুৎসেবা অব্যাহত রাখতে কোনও এক জায়গায় একদিন করলে, অন্যদিন অন্য জায়গায় কাজ করা হয়।

তিনি জানান, সাবস্টেশনের যেসব সমস্যা আছে সেগুলোর আপগ্রেডেশন করা হচ্ছে। সবমিলিয়ে প্রায় এক হাজার ১০০টি সাবস্টেশন আছে। এরমধ্যে কিছু সাবস্টেশনের ক্যাপাসিটি বাড়ানো হচ্ছে। অনেক জায়গায় লাইনের ক্যাপাসিটিও বাড়ানো হচ্ছে, ডুয়েল লাইন করা হচ্ছে। একটি লাইন বন্ধ থাকলে যাতে অন্য লাইন দিয়ে বিদ্যুৎ দেওয়া যায়, সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে। শিল্পের ক্ষেত্রে যেখানে মেজর লোড আছে, সেসব জায়গায় আলাদা লাইন করার ব্যবস্থা হচ্ছে।

তবে বিতরণ লাইনে মেরামত ও উন্নয়ন কাজের জন্য শতভাগ সেবা প্রদান সম্ভব হবে না বলে জানান তিনি। 

/টিটি/এমএমজে/

লাইভ

টপ