বিদ্যুৎখাত সংস্কার: সেবার মান বাড়াতে মূল্য নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ

Send
সঞ্চিতা সীতু
প্রকাশিত : ২১:০৮, সেপ্টেম্বর ০৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:১০, সেপ্টেম্বর ০৪, ২০১৯



বিদ্যুৎবিদ্যুৎখাত এখন নতুন রূপ পেয়েছে। আগের মতো বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এককভাবে উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ করতে পারছে না। পুর্নগঠনের ফলে এখন উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণের কাজ করছে ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানি। দশ বছর মেয়াদি এই পুনর্গঠন-প্রক্রিয়া আগামী বছর শেষ হচ্ছে। টানা নয় বছরের এই কার্যক্রমকে মোটামুটি সফল বললেও মূল্য নিয়ন্ত্রণে প্রতিষ্ঠানিক দক্ষতা উন্নয়নে আরও জোর দেওয়া উচিত ছিল মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানায়, দেশের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিন্তা করা হয়েছে বিপিডিবি এককভাবে আর সব কিছু করতে পারবে না। তখনই সংস্কারের কথা চিন্তা করা হয়। অনেক আগে থেকে পল্লী এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণে পৃথকভাবে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড কাজ শুরু করে। তবে, একসময় শহরেও আলাদা কোম্পানিকে দিয়ে বিদ্যুৎ বিতরণের প্রয়োজন দেখা দেয়। এই সংস্কারের অংশ হিসেবে দেশের বিতরণকে পুরোপুরি পিডিবির হাত থেকে নিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও দেশের বেশ কিছু এলাকায় এখনও পিডিবি বিদ্যুৎ বিতরণ করছে।

অন্যদিকে, উৎপাদনেও নতুন কোম্পানি এসেছে। তবে, এসব কোম্পানির সব ক’টির দক্ষতা সমান কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পরিচলন দক্ষতার উন্নয়ন না ঘটালে শুধু আলাদা করলেই উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে মনে করা হচ্ছে।

এই প্রসঙ্গে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ‘বিদ্যুৎখাত সংস্কারের ক্ষেত্রে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এর বেশিরভাগই বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তবে, সংস্কারের ফলে বিদ্যুৎখাতের উন্নয়ন কতখানি হয়েছে, তা পর্যালোচনা প্রয়োজন। এই সংস্কারে সব ক্ষেত্রে উন্নয়ন ঘটেনি বলেই মনে করি। যদি, তাই হতো, তাহলে বিদ্যুতের মূল্যের ক্ষেত্রে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ করা যেতো।’ তিনি বলেন, ‘সংস্কারের অংশ হিসেবে তাদের আরও একটু যত্নবান হওয়া উচিত ছিল। আমাদের জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা থাকার পাশাপাশি বাধা দেওয়ার প্রবণতা যদি না থাকে, তাহলে তো সমস্যা। বিদ্যুতের মূল্য বাড়লে জিনিসপত্রের মূল্য বেড়ে যাবে। বিদ্যুতের মূল্য নিয়ন্ত্রণ এখন সবচেয়ে বড় বিষয়। সংস্কারে সাশ্রয়ী হওয়ার বিষয়ে একেবারে নজর দেওয়া হয়নি। এতে বিদ্যুতের মূল্য বেড়ে গেছে।’

এই সংস্কারের শুরুতেই উৎপাদন, বিতরণ ও সঞ্চালন ব্যবস্থা আলাদা করতে আলাদা কোম্পানি গঠন করা হয়। সঞ্চালনের জন্য পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)  গঠন করা হয়। বিতরণের জন্য ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি), ঢাকা পাওয়ার সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো), ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো), সর্বশেষ নর্দার্ন পাওয়ার সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) গঠন করা হয়। এর আগে গঠন করা হয়পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড।

সংস্কারের সব কাজ শেষ করতে ২০১১ সাল থেকে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এজন্য ১৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। প্রকল্পটির মেয়াদ আগামী জুনে শেষ হচ্ছে। প্রকল্পটিতে শুধু বিতরণ নয় উৎপাদনেও নতুন নতুন কোম্পানি গঠন করা হয়।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি ও কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি গঠন করা হয়। এর আগে গঠন করা হয় ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি (ইজিসিবি), আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি (এপিএসিএল) ও রুরাল পাওয়ার কোম্পানি (আরপিসিএল)।

সম্প্রতি দেখা গেছে, বিদ্যুৎখাতের প্রসার বাড়লেও দক্ষ জনবল গড়ে উঠছে না। দেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাস করা শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে পাওয়ার ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট নামে প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়েছে।

দেশের বাইরেও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জলবিদ্যুৎ নিয়ে আলাদা কোম্পানি গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ নেপালের সঙ্গে জল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সমঝোতা স্মারক সই করেছে। ভুটানের সঙ্গেও এ ধরনের সমঝোতা হতে যাচ্ছে।

পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক রহমত উল্লাহ বলেন, ‘সংস্কার কাজের অংশ হিসেবে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আসাটা দরকার ছিল। কিন্তু সেটি কতটুকু তার পরিমাণ নির্ধারণ করে দেওয়া দরকার ছিল। সংস্কার করতে গিয়ে বেসরকারি নির্ভরশীলতা বেড়ে যাওয়ার কারণেই বিদ্যুতের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে।’

রহমত উল্লাহ আরও বলেন, ‘সাশ্রয়ী বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির কথা বলা হলেও এখনই মাত্র সে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংস্কার করতে গিয়ে শুরুতেই এই উদ্যোগগুলো নিলে আজকের বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ এতটা বাড়তো না।’

জানতে চাইলে বিদ্যুৎ সচিব ড. আহমদ কায়কাউস বলেন, ‘সংস্কারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর বাস্তবায়ন কাজ প্রায় শেষের দিকে। কিন্তু এই কাজই শেষ নয়। এখন নতুন করে আরও বেশ কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন একদিকে বিতরণ ও সঞ্চালন লাইন সংস্কার করতে হচ্ছে। অন্যদিকে গ্রাহকসেবার মান উন্নত করা ছাড়াও, সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ দিতে কী কী করা যায়, এরমধ্যে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আরও কিছু বেসরকারি করণ করা যায় কিনা, সেটা নিয়ে আমরা চিন্তা-ভাবনা করছি। এই সংস্কারই শেষ নয়, আরও অনেক কাজ বাকি। বিদ্যুৎখাত বড় হচ্ছে, কাজের পরিধিও বাড়ছে। ফলে এই ধরনের সংস্কার কাজ চলমান থাকবে সব সময়।’

বিদ্যুতের মূল্যের বিষয়ে ড. আহমদ কায়কাউস বলেন, ‘কম দামে ভাল সেবা সবাই চায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে মূল্যস্ফীতির কারণেও মূল্য বাড়বে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই চাচ্ছি, বিদ্যুতের মূল্য যেন না বাড়ে। এজন্য জ্বালানি বৈচিত্র্য আনা হচ্ছে। যেন আমরা কম মূল্যে বেশি বিদ্যুৎ-উৎপাদন করতে পারি। অনেক বিশেষজ্ঞ অদক্ষ কেন্দ্র বন্ধ রাখার পরামর্শ দেন। কিন্তু রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ দেওয়ার জন্যই বাধ্য হয়ে চালাতে হয়। সামিটের কেন্দ্রটি গ্যাসে না চালিয়ে তেলে চালানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। গ্যাস পাওয়ার পর তেল কিন্তু বন্ধ করা হয়েছে। কম মূল্যে দেশীয় গ্যাস পাওয়া গেলে তো মূল্য কম পড়বে। আর জ্বালানি পাওয়া না গেলে আমদানির করা তেল, কয়লা বা গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে তার মূল্য তো কম রাখা সম্ভব নয়।ফলে আগামীতেও বিদ্যুতের মূল্য বাড়তেই থাকবে।’

এদিকে, সব বিনিয়োগ সংস্থানের দায়িত্ব এককভাবে সরকারের হাতে না রেখে বেসরকারিখাতেও কিছু ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। এই প্রক্রিয়াটি ১৯৯৬ সাল থেকে শুরু করলেও ২০১২ সালের পর থেকে তা ব্যাপক আকার লাভ করে। সরকারি-বেসরকিারি খাতে বর্তমানে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২০ হাজার। এরমধ্যে প্রায় ৪৯ ভাগ বেসরকারি বিনিয়োগ।

বলা হচ্ছে শুধু সংস্কার করলেই হবে না। এর মাধ্যমে গ্রাহক কীভাবে উপকৃত হচ্ছে, তাও দেখা হচ্ছে। উন্নয়ন, সম্প্রসারণ, গ্রাহকসেবার মান বৃদ্ধি, দক্ষতা, স্বচ্ছতা প্রাতিষ্ঠানিকতা, আইসিটি, ই-গভর্নেন্স প্রতিষ্ঠাতাসহ বেশ কিছু বিষয়ে সমীক্ষা করেছে পাওয়ার সেল। সংস্কার কাজের অংশ হিসেবে এই সমীক্ষাগুলো করা হয়েছে।

সংস্কারের ক্ষেত্রে আরও একটি নতুন উদ্যোগের নাম কেপিআই। এরমাধ্যমে বিদ্যুৎ বিভাগের প্রত্যেক সংস্থার ৫ বছরের অর্জন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সংস্থাগুলোর বাণিজ্যিক পরিসংখ্যান, এমআইএস, এমওডি, নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করা হয়। ২০১৪ সাল  থেকে এই কেপিআই শুরু করা হয়। এখন প্রতিবছর সংস্থাগুলোকে লক্ষ্যমাত্রাও ঠিক করে দেওয়া হয়।বছর শেষে কতটুকু অর্জন হয়েছে, পর্যালোচনা করা হয় তাও।

 

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ