কয়লাচুরি: বিইআরসির সদস্য আব্দুল আজিজকে বরখাস্ত করতে রাষ্ট্রপতিকে চিঠি

Send
সঞ্চিতা সীতু
প্রকাশিত : ২০:০৪, সেপ্টেম্বর ০৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:১০, সেপ্টেম্বর ০৫, ২০১৯


ক্যাব-বিইআরসিবাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-এর সদস্য মো. আব্দুল আজিজ খানকে সাময়িক বরখাস্ত করতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের কাছে চিঠি দিয়েছে কনজুমার অ্যাসোসিয়েন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির কয়লা চুরির মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি হওয়ায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করতে সম্প্রতি ক্যাব এই চিঠি দেয়। ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা শামসুল আলম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

শামসুল আলম বলেন, ‘বিইআরসির এই সদস্যের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এখন বিচারাধীন। তার বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই অবস্থায়  বিইআরসির মতো প্রতিষ্ঠানে তিনি থাকতে পারেন না। তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার জন্য আমরা রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি দিয়েছি। পাশাপাশি এই চিঠি কমিশনের চেয়ারম্যান এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের কাছেও পাঠানো হয়েছে।

বিইআরসির সদস্য আব্দুল আজিজ ছাড়াও এই মামলায় বিদ্যুৎ জ্বালানি বিভাগের আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি রয়েছেন। ক্যাব শুধু আব্দুল আজিজের বিরুদ্ধেই কেন অ্যাকশন নেওয়ার অনুরোধ করেছে—জানতে চাইলে শামসুল আলম বলেন, ‘গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যের বিষয়গুলোর সঙ্গে সাধারণ মানুষ সরাসরি যুক্ত। এই মূল্য নির্ধারণ করে কমিশন। সেই কমিশনের এমন একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি থাকতে পারেন না, যার নিজের বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া তিনি আগে তিতাসের এমডি ছিলেন। এই অবস্থায় তার মাধ্যমে গ্যাসের মূল্যের বিষয়টি নিরপেক্ষতা থাকতে পারে না বলেই আমরা মনে করছি। এই কারণে আমরা শুধু তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছি।’

উল্লেখ্য, গত ২১ জুলাই বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি থেকে ২৪৩ কোটি ২৮ লাখ ৮২ হাজার টাকার কয়লা চুরির মামলায় কোম্পানির ২৩ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) অনুমোদন করে দাখিল করে দুদক। দণ্ডবিধির ৪০৯/১০৯ এবং ১৯৪৭ সনের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় দিনাজপুরে এই অভিযোগপত্র দাখিল করেন দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. শামছুল আলম। আর ২২ জুলাই তা আদালতে দাখিল করা হয়।

প্রসঙ্গত, ২০০৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের ১৯ জুলাই পর্যন্ত ১ লাখ ৪৩ হাজার ৭২৭ দশমিক ৯২ মেট্রিক টন কয়লা চুরি হয়। যার আনুমানিক মূল্য ২৪৩ কোটি ২৮ লাখ ৮২ হাজার ৫০১ টাকা ৮৪ পয়সা। এ ঘটনায় বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মোহাম্মদ আনিছুর রহমান বাদী হয়ে ১৯ জনের বিরুদ্ধে গত বছরের ২৪ জুলাই পার্বতীপুর থানায় মামলা করেন। মামলাটি দুদকের তফসিলভুক্ত হওয়ায় পরে দুদকের কাছে নথি হস্তান্তর করে পুলিশ।

ক্যাবের ভোক্তা অভিযোগ নিষ্পত্তি জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতিকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, ‘বড়পুকুরিয়া খনির কয়লা আত্মসাতের দায়ে ২৩ জন কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করে দুদক আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছে। তাতে বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (বিসিএমসিএল)-এর সাবেক এমডি হিসাবে মো. আব্দুল আজিজ খানের নাম আছে। অর্থাৎ ওই ২৩ জন কর্মকর্তার সঙ্গে মো. আব্দুলআজিজ খান দণ্ডবিধি ৪০৯/১০৯ এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় বিচারাধীন।’

এছাড়া তারা অভিযোগ করেন, আব্দুল আজি খান তিতাস গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানির এমডি ছিলেন। বিষয়টি নিয়ে ২০১৯ সালের  ১৫ এপ্রিল সরকারের কাছে তিতাসের বিভিন্ন দুর্নীতি তদন্তের প্রতিবেদন দাখিল করে দুদক। ওই প্রতিবেদনে বর্ণিত দুর্নীতির অভিযোগে তিনিও অভিযুক্ত। এসব কারণ, উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতির কারণে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, আব্দুল আজিজ খান তখন তিতাসের এমডি ছিলেন। ফলে বিইআরসির গ্যাসের মূল্য নির্ধারণে তিনিও পক্ষভুক্ত হন। বর্তমানে বিইআরসির সদস্য হলেও তিনি নিরপেক্ষ হতে পারেননি। এটিই স্বাভাবিক। এসব কারণে স্বার্থসংঘাতযুক্ত এমন কোনও ব্যক্তিকে ভবিষ্যতে বিইআরসির সদস্য হিসেবে নিয়োগ না দেওয়ার জন্যও  অনুরোধ করা হয় রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানে চিঠিতে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, ক্যাবের কাছে প্রতীয়মান হয়, মো. আব্দুল আজিজ খান বিইআরসির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনে পক্ষপাতহীন নন। ফলে তিনি আর এখন ওই পদের যোগ্য ও উপযুক্ত নন। ফলে তার বিরুদ্ধে বিইআরসি আইনের ১১ ধারা মতে ব্যবস্থা নেওয়াসহ তাকে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখারও অনুরোধ করে ক্যাব।

এরআগে, গত ২৭ আগস্ট অনুষ্ঠিত ভোক্তা অভিযোগ নিষ্পত্তি জাতীয় কমিটির সভায় এই আবেদনপত্র রাষ্ট্রপতির কাছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিইআরসির চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি সম্পূর্ণ ঊর্ধ্বতনদের বিষয়। তাই  এই বিষয়ে মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত নেবে, তাই আমরা বাস্তবায়ন করবো। যদিও এটি মন্ত্রণালয়েরও বিষয় নয়। রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তের বিষয়। আমাদের কিছুই করার নেই। আইন তার নিজস্ব পথে চলে।

প্রসঙ্গত, এই কয়লা চুরির ঘটনা অনুসন্ধান করতে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছিল দুদক। উপ-পরিচালক শামছুল আলমের নেতৃত্বে কমিটিতে আরও ছিলেন সহকারী পরিচালক এ এস এম সাজ্জাদ হোসেন ও উপ-সহকারী পরিচালক এ এস এম তাজুল ইসলাম। অনুসন্ধান কাজের তদারকি করেন দুদক পরিচালক কাজী সফিকুল আলম।

এদিকে, দুদকের আইনজীবী খুরশিদ আলম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট হয়ে গেছে, তারা সাধারণত আর কাজ করতে পারেন না। দুদক চাইলে যেকোনও সময় তাদের গ্রেফতার করতে পারে। আর চাকরি থাকবে কিনা, সেটা ঠিক করবে সরকার। তবে এই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়।’ অভিযোগ প্রমাণিত হলে চাকরি চলে যায় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ