যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার শিকার দেশের ১১ গার্মেন্টস!

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ১৯:০৪, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৩০, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৯





গার্মেন্টস কারখানা

গত চার মাসে দেশে অর্ধশতাধিক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে দাবি মালিকদের দুই শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ’র। বাংলাদেশে যে কয়েকজন উদ্যোক্তার হাত ধরে গার্মেন্টস শিল্প গড়ে উঠেছে তাদের একজনের কারখানাও আছে এই তালিকায়। এ অবস্থার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ভিএফ-কনতুরের প্রতারণার শিকার হয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন একজন উদ্যোক্তা। যুক্তরাষ্ট্রের ওই আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানটি দেশের ১১ গার্মেন্টসের রফতানি করা পণ্য ফেরত পাঠিয়েছে।
গার্মেন্ট খাতে বিরাজ করছে শ্রমিক অসন্তোষও। বকেয়া বেতনের দাবিতে গতকাল সোমবার (১৬ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত টানা ৪ দিন সাভারের একটি তৈরি পোশাক কারখানার বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। আরেক কারখানার শ্রমিকরাও রবিবার (১৫ সেপ্টেম্বর) রাজপথে নামেন।
জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পোশাক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ভিএফ-কনতুরের কাছে নাসা গ্রুপের দুটি কারখানার মোট ৯ লাখ ৯৮ হাজার ১১০ ডলারের রফতানি বিল আটকে গেছে। নাসা অ্যাপারেলস লিমিটেড ও এমএনসি অ্যাপারেলস লিমিটেড থেকে এসব পণ্য রফতানি করা হয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভিএফ-কনতুর আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করছে। আমরা সব নিয়ম মেনেই সেখানে পণ্য পাঠিয়েছি। জাহাজে আগুন লাগার ঘটনায় আমরা আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়লেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানটি যত শর্ত দিয়েছিল সবই আমরা মেনে নিয়েছি। অথচ তারা আমাদের রফতানি পণ্য ফেরত পাঠাচ্ছে।’
তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এই ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার শিকার হয়ে সম্প্রতি দেশের একজন উদ্যোক্তা সর্বস্বান্ত হয়েছেন।
জানা গেছে, নাসা অ্যাপারেলস ছাড়াও এনভয়, সিমটেক্স, ডিএমসি, তারাশিমা, কটন ক্লাব, কেনপার্ক, মেডলার, স্নোটেক্স ও ফাউন্টেন গার্মেন্টসের সরবরাহ করা পণ্য দেশে ফেরত পাঠিয়েছে ভিএফ-কনতুর। গত বছরের ডিসেম্বরে পণ্যগুলো পাঠিয়েছিল এই ১১টি পোশাক কারখানা। এই পণ্যের মূল্য ২৬ লাখ ডলারের মতো। ক্রেতা গ্রহণ না করায় সেসব পণ্য এখন দেশের পথে রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী, ১২০ দিনের মধ্যে রফতানি পণ্যের বিপরীতে প্রাপ্য অর্থ প্রত্যাবাসনের কথা। কিন্তু রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান রফতানির টাকা পায়নি।
এ প্রসঙ্গে রফতানিকারক সমিতির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ হাতেম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের তৈরি পোশাকের বাজারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ বাজারের নাম যুক্তরাষ্ট্র। কারণ, সেখানকার বায়াররা আমাদের পণ্য নিয়ে অহেতুক নানাভাবে ঝামেলা করেন। ঠিকমতো তারা পয়সা দেন না।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের পণ্য তারা সময়মতো পাচ্ছেন। অথচ অন্যায়ভাবে তারা অর্ডারের শর্তানুসারে পয়সা দিচ্ছেন না।’ এরকম ঘটনা বহু আছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘এমনও আছে— অর্ডারের পণ্য তারা ঠিকই পেয়েছেন কিন্তু এক টাকাও আমাদের দেননি।’
এই গার্মেন্টস মালিক বলেন, ‘শিপিং লাইনের সঙ্গে যোগসাজশ করে এ ধরনের কাণ্ড ঘটানো হয়। অনেক সময় তারা পোর্টে পণ্য ফেলে রেখেও ডিসকাউন্ট আদায় করে নেয়।’
গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা বলছেন, কারখানার সঙ্গে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের চুক্তি অনুযায়ী পণ্য তৈরি হয়েছে। সময়মতো পণ্যও হস্তান্তর করা হয়েছে। ক্রেতাপক্ষের মনোনীত জাহাজেই পণ্য পাঠানো হয়েছে। জাহাজের ভাড়াও ক্রেতা, অর্থাৎ চুক্তি অনুযায়ী ভিএফ-কনতুরের দেওয়ার কথা।
গার্মেন্ট মালিকরা জানান, এই ১১ প্রতিষ্ঠানের রফতানি পণ্যের চালান পৌঁছানোর কথা ছিল গত ৬ জানুয়ারি। কিন্তু ৩ জানুয়ারি কানাডার পূর্ব উপকূলে অগ্নিকাণ্ড ঘটে হ্যাপাগ লয়েডের পণ্যবাহী জাহাজ ইয়ানতিয়ান এক্সপ্রেসে। ফলে সময়মতো পণ্য পাঠানো সম্ভব হয়নি। তবে সব প্রক্রিয়া শেষে গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বন্দরে পণ্য পৌঁছলে ভিএফ-কনতুর তা গ্রহণ না করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসের শেষ নাগাদ এই পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর কথা।
জানা গেছে, ডেলিভারি অ্যাট টার্মিনাল (ডিএটি) পদ্ধতিতেই পণ্যের চালান সরবরাহের কথা ছিল গত ৬ জানুয়ারি। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় জাহাজের মালিকপক্ষ জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। এর মধ্য দিয়ে চালান সরবরাহে বিলম্বের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে অবহিত করা হয়।
বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রফতানি পণ্য গ্রহণ না করে ফেরত পাঠানো কোনও ভালো লক্ষণ নয়। এই সেক্টর এমনিতেই নানা সমস্যায় জর্জরিত। এ অবস্থার মধ্যে ক্রেতাপক্ষ অনৈতিকভাবে চুক্তি ভঙ্গ করে ১১ প্রতিষ্ঠানের রফতানি করা পণ্য ফেরত পাঠাচ্ছে।’ বিষয়টিকে তারা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন বলে জানান তিনি।

মালিকদের চিঠি শ্রমিক নেতাদের
শ্রমিক নেতারা গার্মেন্টস মালিকদের চিঠি দিয়েছেন। গার্মেন্টস মালিকদের অভিযোগ, শ্রমিক নেতারা পোশাক খাতে অসন্তোষ সৃষ্টি করতে গার্মেন্টস মালিকদের কাছে চাঁদা দাবির কৌশল হিসেবে এই চিঠি দিয়েছেন। চিঠির একটি কপি বাংলা ট্রিবিউনের কাছে পাঠিয়েছেন এক গার্মেন্টস মালিক।
এ প্রসঙ্গে রফতানিকারক সমিতির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘গার্মেন্টস সেক্টরে শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টির পাঁয়তারার অংশ হিসেবে মালিকদের চিঠি দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘দেশে সরকার আছে। কলকারখানা পরিদর্শন অধিদফতর আছে। শ্রম বিভাগ আছে। এতকিছু থাকার পরও একজন শ্রমিক নেতা কীভাবে গার্মেন্টস মালিকদের এই চিঠি দিতে পারেন?’
চিঠিতে বলা হয়েছে, আপনার কারখানা থেকে পাওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে আপনাকে এই চিঠি দেওয়া হলো। ন্যূনতম মজুরি, শ্রমিকের আইডি কার্ড, বাৎসরিক ছুটি, ঈদ বোনাস ইত্যাদি সঠিকভাবে না দেওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত জানানোর জন্য বিনীতভাবে অনুরোধ করা হয়েছে চিঠিতে। অন্যথায় শ্রমিকের অভিযোগ সত্য বলে ধরে নেওয়া হবে বলা হয়েছে।

শ্রমিক অসন্তোষ
বকেয়া বেতনের দাবিতে টানা চার দিন ধরে সাভারের সার্ক নিটওয়্যার লিমিটেডের সামনে সোমবার (১৬ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত বিক্ষোভ করেছেন শ্রমিকরা। গত বৃহস্পতিবার (১২ সেপ্টেম্বর) থেকে এ বিক্ষোভ শুরু করেন পোশাক কারখানাটির প্রায় ৯০০ শ্রমিক। জানা গেছে, স্থানীয় চেয়ারম্যানের মধ্যস্থতায় এর সুরাহার চেষ্টা চলছে। শ্রমিকরা বিক্ষোভ স্থগিত করেছেন।
এদিকে ‘জারা জিনস অ্যান্ড নিটওয়্যার’ কারখানা খুলে দেওয়া ও বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের দাবিতে গত রবিবার (১৫ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মিরপুরে সড়ক অবরোধ করেছেন পোশাক শ্রমিকরা। প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেলে অন্তত ৮০০ শ্রমিক কাজ হারাবেন।

/এইচআই/এমওএফ/

লাইভ

টপ