জেনেভা ক্যাম্পের বিদ্যুৎ বিল নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

Send
সঞ্চিতা সীতু ও আমানুর রহমান রনি
প্রকাশিত : ২১:৩৬, অক্টোবর ০৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:১৮, অক্টোবর ০৫, ২০১৯

ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অবস্থানমোহাম্মদপুর ও মিরপুর বিহারি ক্যাম্পের কাছে দুই বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির পাওনা প্রায় ৯৩ কোটি টাকা। ২০১৬ সালের মার্চে দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে জেনেভা ক্যাম্পের বিরুদ্ধে বিদ্যুৎ বিল না দেওয়ার অভিযোগ করেছে বিতরণ কোম্পানিগুলো। আর ক্যাম্পের বাসিন্দারা বলছেন, তাদের নামে বিদ্যুৎমিটার না থাকায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। এ কারণে বিল পরিশোধের বিকল্প উপায় জানানোরও দাবি জানিয়েছেন তারা।

ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) সূত্র বলছে, বিল আদায়ের বিষয়ে চাপ দেওয়ায় ক্যাম্পের বাসিন্দারা আন্দোলন করছেন। তবে, ক্যাম্পের বাসিন্দাদের অভিযোগ, তাদের নিয়মিত লোডশেডিংয়ের মধ্যে রাখা হচ্ছে। যা এখন দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়া কিংবা ভোটার তালিকায় নাম ওঠার পরও ক্যাম্পে কোনও হোল্ডিং নম্বর নেই। কিংবা কেউ কোনও জমির খাজনাও পরিশোধ করেন না। কিন্তু বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে হলে নির্দিষ্ট হোল্ডিং নম্বরের প্রয়োজন হয়। সেই হোল্ডিংয়ের জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অনুমোদনও প্রয়োজন হয়। কিন্তু যেখানে ক্যাম্পের জমিতে স্থানীয়দের কোনও অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি, সেখানে প্রত্যেকের নামে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া বিদ্যুৎ আইন অনুযায়ী সম্ভবও নয়। তবে ডিপিডিসি বলছে, বিকল্প কোনও পন্থায় ক্যাম্পে বিদ্যুতের মিটার দিতে চাইলেও তারা নিতে রাজি হচ্ছেন না। অন্যদিকে, সাধারণ ব্যবহারকারী ২ মাসের বিল পরিশোধ না করলেই লাইন কেটে দেয় বিতরণকারী কোম্পানিগুলো। জেনেভা ক্যাম্পের বেলায় সেই নিয়মও রক্ষা করা হচ্ছে না।
মোহাম্মদ এলাকায় বিহারি ক্যাম্পে বিদ্যুৎ বিতরণ করে ডিপিডিসি। বকেয়া বিলের বিষয়ে ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান বলেন, ‘আগে তাদের বিল দিতো ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের পর থেকে তারা বিল দেয় না। আগেও বিল বকেয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া হয়। কিন্তু ২০১৬-১৭ থেকে মন্ত্রণালয় আর দিচ্ছে না। তারা চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, মন্ত্রণালয় আর কোনও বিল দেবে না। কারণ হিসেবে মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, জেনেভা ক্যাম্পবাসীi রাষ্ট্র নাগরিক হিসেবে মর্যাদা দেওয়ায় অন্য নাগরিকদের মতো তাদের বিদ্যুৎ বিলও দিতে হবে। কিন্তু তারা বিল দিচ্ছেন না।’

ডিপিডিসির অন্য এক কর্মকর্তা জানান, সব মিলিয়ে ক্যাম্পে ডিপিডিসির বকেয়া এখন প্রায় ৩৩ কোটি টাকা। এই টাকা পরিশোধের বিষয়ে অনেকবার তাদের সঙ্গে মিটিং করা হয়েছে। এখন সব মিলিয়ে ক্যাম্পে মোট সাতটি মিটার আছে। ২০১৬ সালে থেকে নাগরিকত্ব দেওয়ার পর থেকেই তাদের প্রত্যেককে আমরা আলাদা আলাদা মিটার নিতে বলেছি। কিন্তু তারা নিতে রাজি হননি। উল্টো সাত মিটারের অধীনে যে বিল হচ্ছে, তাও তারা দিতে নারাজ।’

জানতে চাইলে ডিপিডিসির পরিচালক (অপারেশন) এটিএম হারুন অর রশিদ বলেন, ‘গত বুধবার (২ অক্টোবর) আমাদের কর্মকর্তা, স্থানীয় ওসির সঙ্গে তাদের নেতারা বৈঠক করেন। বৈঠকে তাদের বকেয়া বিল দেওয়ার কথা বলা হয়। এখন তারা বিল না দিয়ে আন্দোলন করছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এখনও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করিনি।’

‘প্রতিদিন ক্যাম্পে চারঘণ্টা লোডশেডিং থাকার’ বিষয়ে এটিএম হারুন অর রশিদ বলেন, ‘একেবারেই অবান্তর কথা। আমরা ইচ্ছাকৃত কেন লোডশেডিং করবো? কোনও কারণে লাইনে সমস্যা হলে অনেক সময় বিদ্যুৎ থাকে না। আমরা তা দ্রুত মেরামতও করে দেই।’ তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পের ভেতরে বিদ্যুৎ লাইনের অবস্থা ভালো নয়। তারা আলাদা মিটার নিলে, টাকা পয়সা ঠিকমতো দিলে, লাইন আন্ডারগ্রাউন্ড করে দিলে সমস্যা থাকবে না। আমরা বারবার আলোচনা করেই যাচ্ছি। সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে বারবার বৈঠক করা হয়েছে। টাকা একসঙ্গে দিতে না পারলে কিস্তিতে দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা কোনোভাবেই বিল দিতে রাজি নয়।’

এদিকে, মিরপুর ক্যাম্পটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে ঢাকা বিদ্যুৎ সরবরাহ কোম্পানি (ডেসকো)। বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের বিষয়ে ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহিদ সারওয়ার বলেন, ‘ডিপিডিসির চেয়ে অনেক বেশি বিল বকেয়া ডেসকোর। প্রতিমাসে প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকা বিল হয়। এই পর্যন্ত প্রায় ৬০ কোটি টাকা বকেয়া পড়েছে। ২০১৬ সালের মার্চের পর থেকে আমরা আর বিল পাই না। কারণ, মন্ত্রণালয় দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এরপর নিজেরা নাগরিক হিসেবে বিল দেওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত বিল পাচ্ছি না।’ তিনি বলেন, ‘উল্টো বিল না দেওয়ার জন্য তারা ঢাকা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে বসে আছেন। আমরাও কিছু করতে পারছি না।’

ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘আমরা বহুবার এই বকেয়া আদায়ের জন্য বৈঠক করেছি। কিন্তু তারা কিছুতেই বিল দেবেন না। বিল না দিলে বছরের পর বছর বকেয়া তো বাড়বেই।’

১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান আলাদার সময় ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মুসলমানরা মুসলিমপ্রধান দেশে বাস করতে আগ্রহ দেখায়। আগ্রহীদের তৎকালীন পাকিস্তান সরকার কৌশলে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) থাকার ব্যবস্থা করে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আন্তর্জাতিক রেডক্রস দেশের বিভিন্ন জেলায় উর্দুভাষী অবাঙালিদের বসবাসের জন্য ক্যাম্প স্থাপন করে, যা জেনেভা ক্যাম্প হিসেবে পরিচিত। ১৯৯২ সালে মক্কাভিত্তিক এনজিও রাবেতা আল ইসলাম বাংলাদেশে বসবাসকারী উর্দুভাষী অবাঙালিদের ওপর জরিপ করে। ওই জরিপ অনুযায়ী, দেশের ১৭টি জেলায় ৭০টি ক্যাম্প রয়েছে। এরমধ্যে ঢাকার মোহাম্মদপুরে ৬টি ও মিরপুরে ২৭টি। বাকি ৩৯টির মধ্যে বগুড়া, গাইবান্ধা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, ঠাকুরগাঁও, জামালপুর ও নীলফামারীতে একটি করে, নারায়ণগঞ্জে ৩টি, যশোরে ৯টি, রংপুরে ২টি, রাজশাহীতে ২টি, চট্টগ্রামে ৫টি, ঈশ্বরদীতে ৪টি ও খুলনায় ৫টি ক্যাম্প রয়েছে। এসব ক্যাম্পের কেউই বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের বিল পরিশোধ করেন না।

এদিকে, বিতরণ কোম্পানিগুলোর এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ক্যাম্পের বাসিন্দারা। তারা বলছেন, তারা মিটার নিতে চান, বিলও দিতে চান। কিন্তু এতবার লোডশেডিংয়ের অত্যাচার তারা সইবেন না বলেও জানান।

এ বিষয়ে উর্দু ভাষাভাষী ও বিহারিদের সংগঠন দ্য স্ট্রান্ডেড পাকিস্তানিজ জেনারেল রিপাট্রিয়েশন কমিটি (এসপিজিআরসি)-এর সাধারণ সম্পাদক এম শওকত আলী বলেন, ‘জেনেভা ক্যাম্পেই অসহনীয় লোডশেডিং হচ্ছে। আর কোনও ক্যাম্পে হচ্ছে না। আমরা গত ৪ অক্টোবর বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের নিয়ে সভা করেছিলাম। কিন্তু কোনও সিদ্ধান্ত ছাড়াই সভা শেষ হয়েছে। আমাদের নামে যদি মিটার দিতে চায় বিদ্যুৎ বিভাগ, তাহলে আমরা মিটার নেবো।’

শওকত আলী বলেন, ‘আমাদের একটি প্রজন্ম নাগরিক হয়েছে। ভোটার হয়েছে। আমরা চাই রাষ্ট্রের সব নিয়ম-কানুন মেনে তারা বসবাস করবে।’ যারা আয় করে, তাদের নামে মিটার দেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, শনিবার (৫ অক্টোবর) মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কাউন্সিলরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে স্থানীয়দের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।  বিহারি, স্থানীয় কাউন্সিলরের নেতাকর্মী ও পুলিশের মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষে কমপক্ষে ২০ জন আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. আনিসুর রহমান। 

/এমএনএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ