ব্যাংক খাতের আগুনে পুড়ছে পুঁজিবাজার

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ২২:৪৭, অক্টোবর ১১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৪৯, অক্টোবর ১১, ২০১৯

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জপুঁজিবাজার চাঙ্গা করতে সরকারের নানামুখী প্রচেষ্টার পরও লেনদেনের খরা কাটছে না। গত সপ্তাহে লেনদেন হওয়া চার কার্যদিবসেই শেয়ারবাজারে দরপতন হয়েছে। এতে প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধন কমেছে নয় হাজার কোটি টাকারও ওপরে। সেই সঙ্গে সবকটি মূল্য সূচকের বড় পতন হয়েছে। কমেছে লেনদেনের পরিমাণও।

কেন এমনটি হচ্ছে? এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্য ব্রোকারেজ হাউসের মালিকদের সংগঠন ডিএসই ব্রোকারেজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সাবেক সভাপতি আহমেদ রশিদ লালী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ব্যাংক খাতের সংকট এখন পুঁজিবাজারে দেখা দিয়েছে। ওই খাতের সমস্যা এখন পুঁজিবাজারে ছড়াচ্ছে।’ বর্তমানে মূল সমস্যা মুদ্রা বাজারে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মুদ্রাবাজারে গত ১০-১২ বছরে কোনও সংস্কার হয়নি।’ মুদ্রাবাজার পরিচালনার জন্য কোনও নীতি নেই বলেও জানান তিনি।

মুদ্রাবাজার প্রসঙ্গে আহমেদ রশিদ লালী আরও বলেন, ‘এটা বছরের পর বছর  চলছে কেবল সার্কুলার দিয়ে। একটা সমস্যা হলো, তখনই সার্কুলার জারি করে দিলো– এটা কোনও স্থায়ী সমাধান নয়।  দশ বছর আগে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কী ধরনের প্রভাব (ইমপ্যাক্ট) পড়বে সেটা বিশ্লেষণ করার জন্য একটা ডিপার্টমেন্টকে দায়িত্ব দেওয়া হতো। বাজারে কেমন প্রভাব পড়তে পারে তারা সেটা বিশ্লেষণ করার পর সার্কুলার জারি হতো। কিন্তু এখন বাজারে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তার কোনও বিশ্লেষণ না করেই সার্কুলার জারি করা হয়। এখন ইমপ্যাক্ট নিয়ে কোনও স্টাডি করা হয় না।’ এ কারণে বাজারে কোনও স্থিতিশীলতা আসছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এ অবস্থায় প্রতিনিয়ত দরপতনের কবলে পড়ে পুঁজি হারাচ্ছেন ছোট ও মাঝারি বিনিয়োগকারীরা। যদিও শেয়ারবাজারে গতি ফেরাতে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক বেশকিছু ছাড় দিয়েছে। কিন্তু এর কোনও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে না। উল্টো, দরপতনের বাজারে লেনদেন খরা নতুন মাত্রা পেয়েছে।

আহমেদ রশিদ লালীর দৃষ্টিতে ব্যাংক খাতের প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারে। তিনি বলেন, ‘এ কারণে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। ব্যাংক সেক্টরে টাকার সংকট, সঞ্চয়পত্রের উচ্চ সুদ এবং ডলারের বাজারের অস্থিতিশীলতার প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারে।’  তিনি উল্লেখ করেন, ‘গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বিনিয়োগারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ব্রোকাররা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এই বাজারে কেউ ক্ষতির বাইরে নয়।’ ব্রোকারদের অনেকে পুঁজি ভেঙে খাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

এর আগে, পুঁজিবাজার চাঙ্গা করতে গত ১৬ সেপ্টেম্বর বাজারের সব অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বাজার স্বাভাবিক করতে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ বিএসইসির অধীনে একটি বিশেষ কমিটির কাজ করার সিদ্ধান্ত হয়। এই সিদ্ধান্তের পর ব্যাংকগুলো যাতে শেয়ারবাজারে টাকা ধার দিতে পারে সে ব্যাপারে সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু তারপরও বাজারে চাঙ্গাভাব আসেনি।

গত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস শেষে ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৬৩ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা, যা তার আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ছিল তিন লাখ ৭২ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে নয় হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা। গত সপ্তাহের মতোই তার আগের সপ্তাহের পাঁচ দিনের মধ্যে চার দিনই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে মাত্র ৩০০ কোটি টাকার ঘরে লেনদেন হয়।

এ সপ্তাহে বাজার মূলধন কমার পাশাপাশি গত সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে। ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৫৫টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের মধ্যে ৩৬টির দাম আগের সপ্তাহের তুলনায় বেড়েছে। অপরদিকে, দাম কমেছে ৩০৫টির। দাম অপরিবর্তিত রয়েছে ১৪টির। বেশির ভাগ কোম্পানির দাম কমার ফলে ডিএসইর সব সূচকের পতন হয়েছে। ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স কমেছে ১২৭ দশমিক ৬০ পয়েন্ট বা ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

সপ্তাহজুড়ে মূল্য সূচকের পতনের পাশাপাশি কমেছে লেনদেনের পরিমাণ। গত সপ্তাহের প্রতি কার্যদিবসে ডিএসইতে গড়ে লেনদেন হয়েছে ৩১৯ কোটি ২১ লাখ টাকা। আগের সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হয় ৩৯১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কার্যদিবসে গড় লেনদেন কমেছে ৭২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা বা ১৮ দশমিক ৫২ শতাংশ। আর গত সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে এক হাজার ২৭৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। আগের সপ্তাহে লেনদেন হয় এক হাজার ৯৫৮ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। সে হিসাবে মোট লেনদেন কমেছে ৬৮২ কোটি টাকা।

/এমএএ/

লাইভ

টপ