ঋণ জালিয়াতি: পাঁচ বছরে চাকরিচ্যুত সাড়ে সাত শ ব্যাংক কর্মকর্তা

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ০১:১৯, ডিসেম্বর ৩০, ২০১৫ | সর্বশেষ আপডেট : ০১:২১, ডিসেম্বর ৩০, ২০১৫

রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচ ব্যাংকদিনে-দিনে ঋণ জালিয়াতিসহ নানা ধরনের অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছেন রাষ্ট্রায়ত্ত ৫ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। কমিশন নেওয়া, ঘুষের লেনদেন যেন রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। অনেকে গ্রাহকের রাখা আমানতের টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশেও পালিয়েছেন। ঋণের টাকা নিয়েও গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা হয়েছে অসংখ্যবার। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় ঋণ জালিয়াতি ও অন্যান্য অনিয়মের দায়ে ২০১০ সালের জুন থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত—পাঁচ বছরে সাড়ে ৭শ’ ব্যাংক কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। পাশাপাশি সহস্রাধিক কর্মকর্তাকে আরও দুই ধরনের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, কর্মরত ৮০ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত চলছে। সম্প্রতি ব্যাংক পাঁচটির তৈরি করা পৃথক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
ব্যাংক প্রতিবেদনে আরও জানা গেছে, এসব ব্যাংকে ভুয়া চেকের মাধ্যমে গ্রাহকের বিপুল পরিমাণ টাকা তুলে নেওয়ার মতো ঘটনা রয়েছে। হলমার্ক গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপসহ শত-শত জালিয়াত চক্রকে অনৈতিকভাবে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। আবার ব্যাংকের সাসপেন্স হিসাব থেকেও কোটি-কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। ব্যাংক পাঁচটির নিজস্ব তদন্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে আসলেও প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় থাকায় অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্দেশ দিলেও প্রভাবশালীদের কারণে অনেকে পার পেয়ে গেছেন।

প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ৫ বছরে শুধু ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে ছয় শতাধিক কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছে। অন্যান্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকায় দেড় শতাধিক কর্মকর্তা চাকরি হারিয়েছেন।

 এ প্রসঙ্গে তত্ত্ববধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ঋণ জালিয়াতির কারণে শুধু ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে চলবে না। এ সব ব্যাংকের পরিচালকদেরও শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তিনি বলেন, পরিচালনা পর্ষদের কোনও না কোনও সদস্যের অথবা সরকারের কোনও প্রভাবশালীর কারণে অধিকাংশ ঋণে অনিয়ম হয়ে থাকে। এ কারণে নিরপেক্ষভাবে দেখা উচিত। প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলেও মনে করেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় অনিয়ম কমাতে হলে আগে পরিচালনা পর্ষদকে স্বচ্ছ থাকতে হবে। এরপরই পরিষ্কার থাকতে হবে ব্যাংকের নীতি নির্ধারকদের (সিনিয়র ম্যানেজমেন্টকে)। শুধু কর্মকর্তাদের বিচার করলে কোনও লাভ হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।  যারা অনিয়মের মূল কারিগর তাদের রক্ষা করে কর্মকর্তাদের শাস্তি হলে ব্যাংক খাতের জন্য খুব বেশি উপকার আসবে না।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঋণ জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকায় রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক থেকে এই সময়ে ২৫০ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এছাড়া, এই ব্যাংকে কর্মরত আরও ৩০ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে চলছে তদন্ত। গত  ৫ বছরে শুধু ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অপরাধে অগ্রণী ব্যাংকের ১০০ জনেরও বেশি কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে এ বছরই ৩৩ জনকে অপসারণ করা হয়েছে। অন্যান্য অনিয়মের কারণে চাকরি গেছে ১৫০ জন কর্মকর্তার। এছাড়া, ৭০ জনের বিরুদ্ধে পদাবনতি, বাধ্যতামূলক অবসরসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত বলেন, অগ্রণী ব্যাংক হচ্ছে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। বিশ্বের অন্যান্য দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো এখানেও ঋণ জালিয়াতি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ঋণ গ্রহীতা বা ব্যাংক কর্মকর্তারা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়তে পারেন। তিনি বলেন, অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় ওইসব ব্যাংক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এতে অপরাধ করার প্রবণতা কিছুটা হলেও কমেছে বলে মনে করেন তিনি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকায় ৫ বছরে ৩৭২ জনকে বিভিন্ন ধরনের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৭৮ জনকে ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। ১২ জনের পদাবনতি, বাধ্যতামূলক অবসরসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া, এই ব্যাংকে কর্মরত আরও ১২ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে চলছে তদন্ত।

এ প্রসঙ্গে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রদীপ কুমার দত্ত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যেসব কর্মকর্তা অনিয়ম ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত কেবল তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঋণ জালিয়াতির ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদকে বিভিন্ন সময়ে দায়ী করা হয়, কিন্তু শাস্তি কেবল ব্যাংক কর্মকর্তাদের দেওয়া কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রমাণ ছাড়া পরিচালনা পর্ষদকে দায়ী করার সুযোগ নেই। পর্ষদের দুই একজন সদস্য অনিয়ম করতে ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করলেও তারা নিজেরা কোনও অনিয়ম করেন না। এ জন্য তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এ জন্যই ব্যাংক কর্মকর্তাদের উচিত, পরিচালকদের অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা।

রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকে ৫ বছরে ৩২০ জনের বেশি কর্মকর্তাকে বিভিন্ন ধরনের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দেড়শ জনেরও বেশি ব্যাংক কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এছাড়া, এই ব্যাংকে কর্মরত আরও ১৯ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে চলছে তদন্ত। প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকায় ৫ বছরে ১৮০ জনকে বিভিন্ন ধরনের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৯৮ জনকে ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।  এর মধ্যে ৩১ জনের চাকরি গেছে ২০১৫ সালে।

রাষ্ট্রায়ত্ব বেসিক ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকায় ৬০ জনকে চাকরিচ্যুতসহ ১০৫ জনকে বিভিন্ন ধরনের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন এ মজিদ বলেন, বেসিক ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন, তাদের সবাইকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আর্থিক অনিয়ম ও নিয়োগ অনিয়ম করার দায়ে ২০১৪ সালের ১৭ এপ্রিল উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এ মোনায়েম খানকে বরখাস্ত করা হয়। চলতি মাসে ৯ তারিখে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এই ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুস সোবাহান, রুহুল আলম, মো. সেলিম এবং মহাব্যবস্থাপক মাহবুবুল আলম। এর আগে সাময়িক বহিষ্কার করা হয় মহাব্যবস্থাপক খন্দকার শামীম হাসানকে। এছাড়া, ২০১৩ সালের ১ ডিসেম্বর জালিয়াতি ও প্রতারণার দায়ে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় লুকমানুর রেজা ভূঁইয়াকে এবং আর্থিক অনিয়ম ও ভুয়া তথ্য দাখিল করায় ২০১৪ সালের ৪ জুন সাময়িক বরখাস্ত হন এসএম ওয়ালিউল্লাহ। এছাড়া, ২০১৫ সালের বিভিন্ন সময়ে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন সহকারী ক্যাশ কর্মকর্তা রণজিত রায়, মোরশেদ আলম পাটোয়ারি, শেখ আনিসুর রহমান, ওমর ফারুক, সহকারী কর্মকর্তা রেজাউল ইসলামসহ ১৭ জন। আর্থিক অনিয়মের দায়ে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে ৫৬ জনকে। তাদের মধ্যে ৩৬ জনের চাকরি গেছে জাল সার্টিফিকেটে চাকরি নেওয়ার কারণে।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, এত কর্মকর্তা ঋণ অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিল বলেই তো শাস্তি হয়েছে। এতে একদিকে স্বস্তি আছে যে, অপরাধ করলে শাস্তি পেতে হয়। এতে কিছুটা অনিয়ম কমার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় এখনও সুশাসনের অভাব রয়েছে। ব্যাংকের দায়িত্বশীলদের আরও যত্নবান ও পেশাদার হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ঋণ অনিয়ম বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলে খুশি হওয়া যেত। কিন্তু যেভাবে অনিয়ম বিস্তৃত হয়েছে তাতে শঙ্কা থেকেই যায়।

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ