ঋণের মেয়াদ বৃদ্ধিতেই ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা!

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ১৬:২৮, জানুয়ারি ০৩, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২৮, জানুয়ারি ০৩, ২০১৬

ঋণের সুদরাজনৈতিক অস্থিরতা, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তার কারণে ২০১৫ সালের আগে থেকেই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দেয়। সার্বিক পরিবেশ-পরিস্থিতি বিনিয়োগবান্ধব না হওয়ায় ব্যাংকগুলোয় অলস টাকার পাহাড় জমে ওঠে। এদিকে, শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতিসহ সামগ্রিক আমদানিও কমে গেছে।  ফলে ব্যাংকগুলো ঋণের মেয়াদ বাড়ানো (ঋণ পুনঃতফসিল)  ছাড়া নতুন কোনও ঋণ দিতে পারেনি। এছাড়া, ব্যাংকগুলোতে  সুশানের অভাবে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিও কমেছে বিপুল পরিমাণে। এক বছরে নতুন ঋণ খেলাপির পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। মেয়াদ বাড়ানো বিপুল পরিমাণ ঋণও পরবর্তী সময়ে খেলাপি হয়েছে। খেলাপি ঋণের বিপরীতে সম পরিমাণ প্রভিশনিংও রাখতে হয়েছে। এত কিছুর পরও অধিকাংশ ব্যাংকই ভালো মুনাফা করেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকসূত্রে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, কোনও কোনও ব্যাংক বিগত যেকোনও সময়ের চেয়েও ২০১৫ সালে ভালো মুনাফা করেছে। এর মধ্যে রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা করেছে ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটি ২০১৫ সালে পরিচালন মুনাফা করেছে ১ হাজার ৮০৭ কোটি টাকা। যা ব্যাংকটির ইতিহাসে রেকর্ড। ২০১৪ সালে ব্যাংকটি মুনাফা করেছিল ১ হাজার ৭০৩ কোটি টাকা। ২০১৩ সালে এই ব্যাংকটি মুনাফা করেছিল ১ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা।
পরিচালন মুনাফায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সাউথইস্ট ব্যাংক। এ ব্যাংকটিও রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা করেছে। ২০১৫ সালে ব্যাংকটি মুনাফা করেছে ৮৩৫ কোটি টাকা, ২০১৪ সালে এই ব্যাংকটি মুনাফা করেছিল ৮৩০ কোটি টাকা এবং ২০১৩ সালে করেছিল ৭১২ কোটি টাকা। 

মুনাফার দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ইউসিবিএল ব্যাংক। ২০১৫ সালে এ ব্যাংকটি মুনাফা করেছে ৮৩৩ কোটি টাকা। ২০১৩ সালে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৭১২ কোটি টাকা। অবশ্য ২০১৪ সালে ব্যাংকটি মুনাফা করেছিল ৮৫০ কোটি টাকা।

২০১৫ সালের মুনাফার দিক থেকে ৪তুর্থ অবস্থানে রয়েছে পূবালী ব্যাংক। ২০১৩ সালে এই ব্যাংকটি ৭৯৬ কোটি টাকা মুনাফা করলেও ২০১৫ সালে মুনাফা করেছে ৮১০ কোটি টাকা। অবশ্য ২০১৪ সালে এই ব্যাংকটি মুনাফা করেছিল ৮৩২ কোটি টাকা।

তবে ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিচালন মুনাফা বেশি দেখা গেলেও যথাযথভাবে ঋণ শ্রেণিকরণ করলে এবং এর বিপরীতে প্রভিশন কেটে রাখা হলে মুনাফা কমে যাবে।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ব্যাংকের মুনাফা যেভাবে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে, সেটাতে মূলত লোকসান ঠেকানো গেছে। এতে কিন্তু মুনাফার প্রবৃদ্ধি বাড়েনি। এছাড়া, ব্যাংক বছর শেষে মুনাফার যে ঘোষণা দেয়, সে তথ্য অনেকটা ফুলিয়ে ফাঁপিয়েও বলা হয়। অডিটের পরে ব্যাংকের এই আয় থাকবে না। তবে ২০১৫ সালের প্রথম দিকে কিছুটা বিনিয়োগ পরিবেশ ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই সময় ব্যাংক অনেকখানি এগিয়ে গেছে। তখন অর্থনীতি কিছুটা স্বাভাবিক ছিল, ব্যাংকের ব্যবসাও ভালো হয়েছে। তার একটা সুফল এখন দেখা যাচ্ছে।

ব্যাংকগুলোর ঘোষণা অনুযায়ী, ২০১৫ সালে এবি ব্যাংকও রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা করেছে ৭৬০ কোটি টাকা। ২০১৪ সালে এই ব্যাংকটি মুনাফা করেছিল ৭৩৭ কোটি টাকা। ২০১৩ সালে ব্যাংকটির মুনাফা হয় ৫২৮ কোটি টাকা।

আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকও মুনাফা করেছে রেকর্ড পরিমাণ। ২০১৫ সালে ব্যাংকটি মুনাফা করেছে ৬৫০ কোটি টাকা, ২০১৪ সালে এই ব্যাংকটি মুনাফা ছিল ৬১৩ কোটি টাকা। ২০১৩ সালে এই ব্যাংকটির মুনাফা ছিল ৪১৯ কোটি টাকা।

মুনাফার দিক থেকে রেকর্ড করেছে এক্সিম ব্যাংকও। এ ব্যাংকটি ২০১৫ সালে মুনাফা করেছে ৬৬০ কোটি টাকা, ২০১৪ সারে এই ব্যাংকে মুনাফা ছিল ৬২৫ কোটি টাকা।

একইভাবে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক মুনাফা করেছে বিগত যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি। ২০১৫ সালে ব্যাংকটির মুনাফা হয় ৫৫০ কোটি টাকা, ২০১৪ সালে মুনাফা করেছিল ৪৫০ কোটি টাকা।

আইএফআইসি ব্যাংক মুনাফা করেছে ৪০৬ কোটি টাকা। ওয়ান ব্যাংক করেছে ৩০৬ কোটি টাকা, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক করেছে ৩৬৫ কোটি টাকা, ব্যাংক এশিয়া করেছে  ৬১০ কোটি টাকা, এনসিসি ব্যাংক করেছে ৪১৯ কোটি টাকা, আগের বছর ছিল ৩৮৭ কোটি টাকা; শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক পরিচালন মুনাফা করেছে ২৭০ কোটি টাকা, আগের বছরে ছিল ২৫০ কোটি টাকা।

ইউনিয়ন ব্যাংক ১২৫ কোটি টাকা, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক ১০৬ কোটি টাকা, মধুমতি ব্যাংক ১০৬ কোটি টাকা এবং সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক ৮১ কোটি টাকা মুনাফা করেছে।

এ প্রসঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়াম্যান ড. জায়েদ বখত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এখন অনেক বেশি সর্তকতার সঙ্গে ঋণ দেয়া হচ্ছে। মনিটরিং ব্যবস্থাও আগের চেয়ে জোরদার করা হয়েছে। ম্যানেজমেন্টও আগের চেয়ে সচেতন হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থমন্ত্রণালয়ও নজরদারি বৃদ্ধি করেছে। পরিচালনা পর্ষদকে আগের চেয়ে কার্যকর করা হয়েছে। সবার মধ্যে এক ধরনের সচেতনাতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সব কারণেই ব্যাংক খাতে পরিচালন মুনাফা বেড়েছে।

কয়েকটি  বেসরকারি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৫ সালে ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফার বড় অংশই এসেছে কমিশন, সার্ভিস চার্জ, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবসার আয় থেকে। ব্যাংকের আয়ের প্রধান খাত সুদ হলেও এবার এই খাত থেকে আদায় হয়েছে খুবই কম। এ প্রসঙ্গে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ—এবিবি’র সাবেক চেয়ারম্যান ও মেঘনা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূরুল আমীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গত বছরে বড় বড় ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগ ছিল। কোনও-কোনও ব্যাংকের জন্য এটা আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে। এর বাইরে মুদ্রানীতির লক্ষ্যমাত্রা পুরণ না হলেও কিছু ঋণ বিতরণও করা হয়েছে, সেখান থেকেও আয় এসেছে। এছাড়া রেমিটেন্স থেকে এসেছে। অনেক ব্যাংক শেয়ারবাজার থেকেও আয় করেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ব্যাংকগুলোয় প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ বেড়েছে। সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে এ খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৪ হাজর ৭০৮ কোটি টাকা। নিয়ম অনুযায়ী ঋণ খেলাপি ঋণের বিপরীতে সুদ আয় খাতে নেওয়া যায় না। এর বাইরে ঋণ পুনর্গঠনের নামে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নবায়ন করা হয়েছে। এর বিপরীতে ডাউন পেমেন্ট নেওয়া হয়েছে মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ। এছাড়া ছাড় দেওয়া হয়েছে সুদের হারেও।

ব্যাংকিং নিয়ম অনুযায়ী, পরিচালন মুনাফা থেকে ব্যাংকগুলোকে আগে নিয়মিত ঋণ ও খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন রাখতে হয়। নিয়মিত ঋণের বিপরীতে প্রভিশন রাখতে হয় ১ থেকে ২ শতাংশ, খেলাপির মধ্যে নিম্নমান ঋণে ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক ঋণে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ ঋণে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হয়। এরপরে মূলধন বাড়াতে তহবিলের একটি অংশ নিতে হয় রিজার্ভ তহবিলে। এর বাইরে পরিশোধ করতে হয় সাড়ে ৪১ শতাংশ হারে আয়কর। এরপর মুনাফার যা অবশিষ্ট থাকে, তা থেকে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগ থাকে।

উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, কোনও ব্যাংক ১০০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করলে, বিধিবদ্ধ সঞ্চিতি ও জেনারেল রিজার্ভ সংরক্ষণ করার পর বাকি থাকে সাড়ে ৩৬ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের কারণে ওই ব্যাংকের প্রভিশন সংরক্ষণ করতে যদি ১৫ কোটি টাকা চলে যায়, তাহলে বাকি থাকে সাড়ে ১৬ কোটি টাকা। এই সাড়ে ১৬ কোটি টাকা থেকে আবার অনেক ব্যাংক তাদের ব্যাংকের মূলধন বাড়ানোর জন্য ২ থেকে ৩ শতাংশ রিজার্ভে রেখে দেয়। এরপর বাকি থাকে সাড়ে ১৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ কোনও ব্যাংক ১০০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করলে সব বাদ দিয়ে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য থাকবে মাত্র সাড়ে ১৪ কোটি টাকা। এই সাড়ে ১৪ কোটি টাকার ভাগিদার হলেন ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালকরা। এই সাড়ে ১৪ কোটি টাকার ওপরই ব্যাংক ডিভিডেন্ড ঘোষণা করলে তার অধিকাংশেরই সুবিধাভোগী হন পরিচালকরা।

/এমএনএইচ/অাপ-এসএম

লাইভ

টপ