কমানো হচ্ছে সঞ্চয়পত্রের সুদ

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ২০:৩০, জানুয়ারি ০৫, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৩২, জানুয়ারি ০৫, ২০১৬

সঞ্চয়পত্রব্যাংক খাতের পর এবার কমানো হচ্ছে সঞ্চয়পত্রের সুদ হার। পাঁচ বছর ও তিন বছর মেয়াদী পারিবারিক ও পেনশনসহ বিভিন্ন সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। মেয়াদী বিভিন্ন সঞ্চয়পত্রে এক থেকে দেড় শতাংশ পর্যন্ত সুদের হার কমানো হতে পারে। চলতি মাসেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে দেশের সব সঞ্চয় ব্যুরো অফিস ও ব্যাংকগুলোতে পাঠিয়ে দেবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, তিন বছরের ব্যবধানে ব্যাংকের আমানতে সুদ হার কমেছে প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ। এ কারণে অনেকেই উচ্চ সুদের আশায় ব্যাংক থেকে টাকা তুলে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছেন। আর সঞ্চয়পত্রে সুদ বাবদ ব্যয় করতে হচ্ছে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ। এই বিপুল পরিমাণ ব্যয় কমানোর অংশ হিসাবে সঞ্চয়পত্রের সুদ হার কমানো হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সঞ্চয়পত্রে সুদ হার কমানোর কাজ চলছে। যথা সময়ে ঘোষণা দেওয়া হবে, প্রজ্ঞাপনও জারি হবে।
প্রসঙ্গত, ৬ মাস আগেও একবার বিভিন্ন সঞ্চয়পত্রে দেড় থেকে দুই শতাংশ হারে সুদের হার কমানো হয়েছিল। সাধারণত দু-তিন বছর পরপর সঞ্চয়পত্রের সুদ হার পরিবর্তন হতো। কিন্তু বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে আমানতে সুদ হার নেমেছে গড়ে সাড়ে ৬ শতাংশেরও নিচে। শুধু তাই নয়, প্রতিদিনই কমছে আমানতে সুদ হার। এ ছাড়া সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে অতিরিক্ত সুদ দিতে গিয়ে সরকারকেও চাপে থাকতে হচ্ছে। এ কারণে এখন থেকে প্রতি ৬ মাস বা তিন মাস পরপর সুদ হার পরিবর্তন করা হতে পারে। 

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও মনে করেন, বর্তমানে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার অনেক বেশি। এই হার কমানোর বিষয়টি সরকারের বিবেচনাধীন। চলতি মাসেই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।  তিনি বলেন, সরকার সব সময় সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার পরিবর্তন করে থাকে। সাধারণত দু-তিন বছর পরপর এটি করা হয়। কিন্তু এখন থেকে প্রতি তিন বা ছয় মাস পরপর বাজারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে মুনাফার হার পুনর্নির্ধারণ করা হবে। রবিবার মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এমসিসিআই) নতুন কমিটির সদস্যরা সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এ সব কথা বলেন।

এদিকে ব্যাংকিং ঋণের সুদের হার কমাতে বহুমুখি উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রানীতির বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করছে। এর আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে টাকা নেওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। যার ফলে ব্যাংকগুলোয় অলস টাকার পরিমাণ বেড়ে গেছে। এতে প্রায় সব ব্যাংকের হাতেই অতিরিক্ত টাকা রয়েছে। যে কারণে দৈনন্দিন লেনদেন সম্পন্ন করতে বেশিরভাগ ব্যাংকই এখন আর কলমানি মার্কেট (আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার বা এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকের একদিনের জন্য ধার করা) থেকে ঋণ নিচ্ছে না। আবার বিনিয়োগ পরিবেশ ভাল না থাকায় ঋণ প্রবৃদ্ধিও বাড়ছে না। এ কারণে আমানত সংগ্রহে ব্যাংকগুলোর মধ্যে কোন প্রতিযোগিতা নেই। যার কারণে আমানতে সুদ হার কমছে দ্রুত গতিতে। 

অন্যদিকে আমানতের সুদহার কমে যাওয়ায় ব্যাংকে সঞ্চয়ের আগ্রহ হারাচ্ছে ব্যাংকের গ্রাহকরা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক আমানতের সুদহার বর্তমানে সাড়ে ৬ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশ। কিন্তু সঞ্চয়পত্রের সুদহার এখনো ১১ শতাংশের ওপরে রয়েছে। এ অবস্থায় অনেকে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছে। বর্তমানে পাঁচ বছর মেয়াদী পরিবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১.৫২ শতাংশ। পাঁচ বছর মেয়াদী পেনশনার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১.৬৭ শতাংশ। তিন বছর মেয়াদী ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক মেয়াদী হিসাবের মুনাফার হার ১১.২৮ শতাংশ। পাঁচ বছর মেয়াদী বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১.২৮ শতাংশ এবং তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১.০৪ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতি না থাকায় ব্যাংকগুলোতে অলস টাকার পাহাড় জমে গেছে। এ কারণে ব্যাংকগুলো বাধ্য হয়েই আমানতে সুদ হার কমিয়েছে। ফলে অনেকে ব্যাংক থেকে আমানত তুলে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছেন।

গত বছরের ১৪ জুনের আগ পর্যন্ত ৫ বছর মেয়াদী পারিবারিক ও পেনশন সঞ্চয়পত্র কিনলে ১৩.৪৫ ও ১৩.২৬ শতাংশ হারে সুদ দেওয়া হতো। বর্তমানে ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ডের (৫ বছর মেয়াদী) ক্ষেত্রে সামাজিক নিরাপত্তা প্রিমিয়াম সমন্বয়পূর্বক মুনাফার হার ধরা হয়েছে ১২ শতাংশ।

এদিকে প্রতিমাসেই বাড়ছে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি। পরিসংখ্যান বলছে, গেল চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর)  ৯ হাজার ৩৩ কোটি ৭০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করেছে জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদফতর। এই সময়ে লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকেরও বেশি বিক্রি হয়েছে সঞ্চয়পত্র। জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদফতরর প্রতিবেদনে দেখা যায়, চার মাসে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে পরিবার সঞ্চয়পত্র। পরিবার সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯৪৭ কোটি ১৮ লাখ টাকা। তিন মাস অন্তর মুনাফা ভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে নিট বিক্রি ২ হাজার ১৪৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা এবং পাঁচ বছর মেয়াদী বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে ১ হাজার ১০ কোটি ৯০ লাখ টাকা। মূলত এই তিন ধরনের সঞ্চয়পত্রের বিক্রিই বেশি হয়ে থাকে। চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সঞ্চয়পত্র থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের। জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদফতরের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত চার মাসে মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে ৬ হাজার ২২৪ কোটি ৬১ লাখ টাকা। আর সুদ হিসেবে পরিশোধ করা হয়েছে ৩ হাজার ৫৮০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।

 

/এফএ/

লাইভ

টপ