ফাঁকিবাজির এটিএম নিম্নমানের, চোরদের প্রযুক্তি উন্নত

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ১৭:৪২, মার্চ ০৬, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৪২, মার্চ ০৬, ২০১৬

এটিএম বুথে জালিয়াতিনিম্নমানের অটোমেটেড টেলার মেশিনে (এটিএম) সয়লাব হয়ে গেছে দেশ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে নিম্নমানের এই মেশিনগুলোর একটা বড় অংশই আনা হয়েছে মিথ্যা তথ্য দিয়ে। এটিএম নিম্নমানের হওয়ায় কার্ড ক্লোন (নকল) করে প্রতারক চক্র লুটে নিচ্ছে গ্রাহকের টাকা। বিদেশি ব্যাংকের কার্ডধারীরাও নিরাপদ থাকছে না। তাদের কার্ডের তথ্যও চুরি হয়ে যাচ্ছে। পরবর্তী সময়ে গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি জালিয়াতির মাধ্যমে বিল পরিশোধের ঘটনাও ঘটছে। আর এ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন ব্যাংকের অসৎ কর্মকর্তারাও। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআর ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
এনবিআরের কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের তদন্ত অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো কম দামি ও নিম্নমানের এটিএম বেশি স্থাপন করেছে। এর একটা বড় অংশ বিভিন্ন দেশ থেকে আনা হয়েছে কম্পিউটার যন্ত্রাংশের কথা বলে। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত এনসিআর করপোরেশনের এটিএম মেশিনের দাম ১০ লাখ টাকার বেশি হলেও ব্যাংকগুলো মাত্র ৫ থেকে ৬ লাখ টাকার এটিএম মেশিন বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করেছে। এ কারণে এসব মেশিন সহজেই ক্লোন করতে পারছে জালিয়াত চক্র। এই চক্র তাদের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশের ভেতরেও ক্লোন করেছে। আবার দেশের বাইরে থেকেও ক্লোন করেছে।
অবিশ্বাস্য কম দামে এই এটিএম সরবরাহ করছে ইনফরমেশন টেকনোলজি কনসালট্যান্টস লিমিটেড ও টেকনোমিডিয়া লিমিটেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠান। চীন, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে এটিএম আমদানি করে ব্যাংকগুলোকে সরবরাহ করে তারা।

জালিয়াত চক্র ৬ থেকে ১২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে দেশের ভেতরে ইর্স্টান ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) এটিএম বুথে ‘স্কিমিং ডিভাইস’ বসিয়ে ১ হাজার ২০০ গ্রাহকের তথ্য চুরি করে। এর মধ্যে ৪০ জন গ্রাহকের ২০ লাখ ৫৯ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য উদ্ঘাটিত হয়। এছাড়া দেশের বাইরে থেকেও কয়েকশ গ্রাহকের তথ্য চুরি করেছে এই চক্র। গ্রাহকের কার্ড ক্লোন বিদেশে হলেও টাকা তোলা হয়েছে বাংলাদেশ থেকে। এর মধ্যে সৌদি আরবের শুধু আল-রাজি ব্যাংকের ১৫০ গ্রাহকের তথ্য চুরির পর বেসরকারি প্রিমিয়ার ব্যাংকের বুথ থেকে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ওই জালিয়াত চক্র। প্রিমিয়ার ব্যাংকের বনানী, বসুন্ধরা, উত্তরা ও কাকরাইলে স্থাপিত এটিএম বুথ ব্যবহার করে ১৪ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে টাকা তোলা হয়। এ ঘটনায় গত বুধবার সব ব্যাংকে চিঠি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অন্য কোনও ব্যাংকের এটিএম বুথ ব্যবহার করে বিদেশি ব্যাংকের ইস্যু করা কার্ডের বিপরীতে জালিয়াতি হয়েছে কি-না তা খতিয়ে দেখতে ব্যাংকগুলোকে বলা হয়েছে। চিঠিতে জালিয়াতির বিষয়ে অধিকতর সর্তক থাকার পাশাপাশি প্রকৃত তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সতর্কতামূলক বিভিন্ন ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়ার পরও প্রিমিয়ার ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে কীভাবে টাকা উত্তোলন হলো তা জানার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, অন্য কোনও ব্যাংকে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে কি-না সে বিষয়ে ব্যাংকেগুলোর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে।

এর আগে কোন ব্যাংক কোন সময়ে কতোটি এটিএম আমদানি করেছে তার বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীকে (এমডি) এ বিষয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি কয়েকটি ব্যাংকের এটিএম বুথে জালিয়াতির ঘটনায় গ্রাহকদের মধ্যে বিরূপ প্রভাব পড়ায় মেশিনের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, নিয়ম মেনে অল্প পরিমাণ এটিএম আনা হলেও অধিকাংশ মেশিন আনা হচ্ছে এলসি ছাড়াই উড়োজাহাজে অথবা কুরিয়ার সার্ভিসে। এ কারণে সব এটিএমের বিষয়ে খোঁজ-খবর নিচ্ছেন কাস্টমস গোয়েন্দারা।

এ প্রসঙ্গে অধিদফতরের মহাপরিচালক মঈনুল খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কোনও ব্যাংক অবৈধভাবে বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে এটিএম এনে থাকলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ব্যাংকগুলোতে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, যেসব সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সরাসরি অথবা দরপত্র কিংবা অন্য কোনও পদ্ধতিতে এটিএম কেনা হয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্য পাঠাতে হবে। চলতি ২০১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যেসব প্রতিষ্ঠান এটিএম এনেছে, তাদের ভ্যাট নিবন্ধন নম্বর, এটিএম সংখ্যা, মেশিনের ব্র্যান্ড ও মডেল, আমদানির সময় কী পরিমাণ উৎসে কর দেওয়া হয়েছে- সব তথ্যও এনবিআরে পাঠাতে হবে।

এ বিষয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডিরা বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি ব্যাংকের এমডি এ প্রসঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ব্যাংকগুলো নিজেরা এটিএম আমদানি করে না। এ কারণে মান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে মান খুব বেশি খারাপ হওয়ারও কারণ নেই।

সূত্র মতে, বাংলাদেশে প্রথম এটিএম নিয়ে আসে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। ১৯৯৪ সালে ঢাকার কামাল আতাতুর্ক এভিনিউয়ে এটিএম বুথ চালুর পর মতিঝিল, ধানমন্ডিসহ ঢাকায় অন্যান্য স্থানেও এই ব্যাংক এটিএম স্থাপন করে। বর্তমানে তাদের মোট এটিএম বুথ ৮৩টি। দেশে কার্যরত ৫৬ বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল) ছাড়া সব ব্যাংকই কমবেশি এটিএম বুথ চালু করেছে। দেশজুড়ে প্রায় ১০ হাজার এটিএম বুথের মাধ্যমে প্রায় ৯০ লাখ গ্রাহক এই সেবার আওতায় রয়েছেন।

এদিকে গ্রাহকের টাকা চুরির ঘটনার পর সন্দেহভাজন তিন শতাধিক এটিএম কার্ড বাজেয়াপ্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ সতর্কতাও জারি করেছে। আইটি বিশেষজ্ঞরাও বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে জালিয়াত চক্রের সম্ভাব্য সূত্র আবিষ্কারের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে আমদানির তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১৩ সালের অক্টোবর থেকে চট্টগ্রাম কাস্টমসের মাধ্যমে ৬০৪টি অটোমেটেড টেলার মেশিন আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে ৬০৩টিই আমদানি করেছে ইনফরমেশন টেকনোলজি কনসালট্যান্টস লিমিটেড। মাত্র একটি মেশিন এনেছে ভরটেক্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান।

আয়কর অধ্যাদেশ অনুযায়ী, কম্পিউটারের যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক লাগে না। এ সুযোগটি কাজে লাগিয়েই কম্পিউটারের নামে এটিএম আনার তথ্য পেয়েছেন শুল্ক গোয়েন্দারা।

কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, এটিএম আমদানিতে (৮৪৭২৯০১০’র এইচএস কোডে) মোট শুল্ক কর দিতে হয় ৩১ শতাংশের মতো। এর মধ্যে ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ৫ শতাংশ ডিউটি, ৫ শতাংশ এআইটি (অগ্রিম আয়কর) ও ৪ শতাংশ এটিভি (অ্যাডভান্স ট্রেড ভ্যাট)। ব্যাংক সরাসরি আমদানি করলে ওই ৪ শতাংশ এটিভি বাদ যায়। তবে নানা কারণে গত আড়াই বছরে কোনও ব্যাংকই সরাসরি এটিএম আমদানি করেনি।

/এমএসএম/এজে/

লাইভ

টপ