‘হ্যাকড’ হওয়া অর্থের পরিমাণ জানাচ্ছে না বাংলাদেশ ব্যাংক

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ১৯:১২, মার্চ ০৭, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৪৭, মার্চ ০৭, ২০১৬

বাংলাদেশ ব্যাংকসুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে ‘হ্যাকড’ হওয়া অর্থের হিসাব প্রকাশ করবে না বাংলাদেশ ব্যাংক। সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে,‘সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এ বিষয়ে দেশে এবং দেশের বাইরে তদন্তলব্ধ তথ্যাদি অপ্রকাশিত রাখা হচ্ছে।’
বিদেশি পত্রিকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের একাউন্ট থেকে ১০ কোটি ডলার তুলে নেওয়ার তথ্য প্রকাশিত হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে,এর পরিমাণ অনেক কম। এর ফলে সাইবার অপরাধীরা বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার অ্যাকাউন্ট হ্যাকড করে কী পরিমাণ অর্থ তুলে নিয়েছে তা নিয়ে এক ধরণের ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে।
তবে গত ২৯ ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইনের দৈনিক দ্য ইনকোয়েরার পত্রিকায় বাংলাদেশ থেকে ১০ কোটি ডলার মানি লন্ডারিং হয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের এই অর্থ চীনা হ্যাকারদের একটি গ্রুপ প্রথমে ফিলিপাইনের ব্যাংকিং চ্যানেলে নিয়ে যায়। পরে সেখান থেকে শ্রীলংকায় পাচার করে।
রবিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা দাবি করেন,শ্রীলংকায় সরিয়ে নেওয়া অর্থ এরই মধ্যে উদ্ধার করা গেছে। আর ফিলিপাইন থেকে অর্থ উদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন উপমহাব্যবস্থাপক ও একজন যুগ্ম পরিচালক দেশটি সফর করে এসেছেন। তারা ১৬ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও দেশটির অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিলের (এএমএলসি) সঙ্গে বিশেষ বৈঠক করেন। ফিলিপাইনের অর্থ পাচার প্রতিরোধ কাউন্সিলও বিষয়টি তদন্ত  করছে।

কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক সোমবার এক বিবৃতিতে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রক্ষিত রিজার্ভ (স্থিতি) থেকে ‘হ্যাকড’ হওয়া অর্থের একাংশ আদায় করা হয়েছে। বাকি অর্থ আদায়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফিলিপাইনের অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর সচিবালয়ের মহাব্যবস্থাপক (প্রটোকল) এ এফ এম আসাদুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

যোগাযোগ করা হলে সোমবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সুভঙ্কর সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। একাউন্ট থেকে কী পরিমাণ অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে বা কী পরিমাণ অর্থ উদ্ধার করা গেছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন,‘পরিমাণ বলার কোন বিষয় নয়।’ তবে পত্রিকায় যে পরিমাণ অর্থ তুলে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, বাস্তবে  হয়েছে  তার চেয়ে অনেক কম। হ্যাকাররা রিজার্ভের টাকা তুলে নেওয়ার পর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখনও ২৮ বিলিয়ন ডলার আছে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এই টাকা রির্জাভ থেকে যায়নি। আমাদের অন্য এক জায়গা থেকে হ্যাকড হয়েছে। বিষয়টা পরে দেখা যাবে। আর টাকার পরিমাণও এত কম যে, ২৮ বিলিয়নকে স্পর্শ করে না।

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর এটিএম বুথে স্কিমিং ডিভাইস বসিয়ে কয়েক কোটি টাকা তুলে নেয় জালিয়াত চক্র। প্রযুক্তির দুর্বল নিরাপত্তার কারণে ব্যাংক খাতের প্রায় ৩ হাজার গ্রাহকের তথ্য চলে যায় জালিয়াত চক্রের হাতে। এই ঘটনায় এটিএম সেবার নিরাপত্তা নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠে, ঠিক সেই মুহূর্তে ফেব্রুয়ারি মাসের ৫ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার একটি অ্যাকাউন্ট হ্যাকড করে সাইবার অপরাধীরা।

এই ঘটনা দৈনিক দ্য ইনকোয়েরার পত্রিকায় প্রকাশের পর গত ১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা একটি জরুরি বৈঠক করেন। ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৬ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারি তিন দিনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের ডিজিএম জাকের হোসেন ও বিএফআইইউর যুগ্ম পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রবকে পাঠানো হয় ফিলিপাইনে। সেখানে গিয়ে এ দুই কর্মকর্তা দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক 'ব্যাংকো সেন্ট্রাল এনজি ফিলিপিনাস' (বিএসপি) ও অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিলের (এএমএলসি) সঙ্গে আলদা বৈঠক করেন। এছাড়া ‘হ্যাকড’ ঘটনার সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা জড়িত কি না, বিষয়টি নিয়ে এখন বিস্তারিত তদন্ত শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সূত্র মতে, প্রবাসী ফিলিপিনোদের রেমিট্যান্স স্থানান্তরকারী সংস্থা ফিলরেমের মাধ্যমে এ অর্থ ব্যাংকের মাকাতি সিটি শাখায় জমা হয়। পাঁচটি পৃথক হিসাবে মোট ১০ কোটি ডলারের (৭৮০ কোটি টাকা) সমপরিমাণ অর্থ সেখানে জমা করা হয়। এরপর স্থানীয় মুদ্রা পেসোয় রূপান্তর করে পুরো অর্থ একটি করপোরেট হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। করপোরেট ব্যাংক হিসাবটি চীনা বংশোদ্ভূত একজন ফিলিপিনো ব্যবসায়ীর। ওই ব্যবসায়ীর হিসাব থেকে অর্থ স্থানান্তর হয় তিনটি স্থানীয় ক্যাসিনোয়।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ২০-২৫ শতাংশ নগদ আকারে বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা হয়। বাকি অংশ বন্ড, স্বর্ণ ও অন্যান্য মুদ্রায় বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, হ্যাকড হওয়া অর্থ শনাক্ত করে তা ফেরত আদায়ের বিষয়ে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ফিলিপাইনের অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিবিরভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ফিলিপাইনের অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কর্তৃপক্ষ তাদের দেশের আদালতে মামলা দায়ের করেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবগুলোর ফ্রিজ আদেশ আদালত থেকে সংগ্রহ করেছেন। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন সাইবার বিশেষজ্ঞ পরামর্শক এবং তার ফরেনসিক ইনভেস্টিগেশন টিম এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের টিমের সঙ্গে কাজ করছেন।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, ফিলিপাইনের অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কর্তৃপক্ষের তদন্ত সম্পন্ন হবার সঙ্গে সঙ্গেই অর্থ ফেরত আদায়ে আদালতের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং প্রয়োজন বোধে বিশ্বব্যাংকের স্টোলেন অ্যাসেট রিকোভারি (স্টার) প্রক্রিয়াও অবলম্বন করা হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বৃহত্তর আর্থিক খাতে সাইবার নিরাপত্তা সার্বিকভাবে নিশ্চিদ্র করার প্রক্রিয়া জোরালোভাবে সচল রাখা হয়েছে।

এদিকে দাপ্তরিক কাজে তথ্যপ্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার ও অনলাইন কার্যক্রমের বিষয়ে গত বৃহস্পতিবার সতর্কতামূলক একটি অফিস আদেশও জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সতর্কতামূলক অফিস আদেশে বলা হয়েছে, অনুপস্থিত অবস্থায় কোন কর্মকর্তার পিসি খোলা না রাখা, অন্যের পিসি ব্যবহার না করা, অননুমোদিত কোনো সফটওয়্যার ব্যবহার না করা, অপরিচিত বা সন্দেহজনক ই-মেইল না খুলে সরাসরি ডিলেট, অননুমোদিত কোনো নেটওয়ার্ক ডিভাইস ব্যবহার না করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অফিস সময়ের পর বা ছুটির দিনে অফিসে উপস্থিত থেকে নেটওয়ার্ক ব্যবহারের প্রয়োজন হলে আইটি বিভাগের পূর্বানুমতি নিতে বলা হয়েছে।

জিএম/ এমএসএম/

লাইভ

টপ