আসন্ন বাজেট হবে ‘কঠিন স্বপ্নবিলাসী’ !

Send
শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত : ১১:৫৬, মার্চ ২৯, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:১৬, মার্চ ২৯, ২০১৬

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতআসন্ন ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেট তৈরির কাজে হাত দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। আগেই তিনি জানিয়েছেন, আগামী বাজেটের সম্ভাব্য আকার হবে ৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা।আসন্ন বাজেটের আকার প্রসঙ্গে মন্ত্রীর ভাষ্য-‘আমিতো বরাবরই উচ্চাভিলাষী বাজেট দেই। সবাইতো এমন কথাই বলে। এবারও এর ব্যতিক্রম হবে না। আমার উপস্থাপিত বাজেট হবে অবশ্যই উচ্চাভিলাষী।তবে এবছর এর সঙ্গে যুক্ত হবে স্বপ্নবিলাসী। কঠিন স্বপ্নবিলাসী।’

আগামী অর্থ বছরের বাজেট প্রণয়নের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন অর্থমন্ত্রী মুহিত। ইতিমধ্যেই বাজেট সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে প্রাক বাজেট বৈঠকও শুরু করেছেন, চলবে এপ্রিলের শেষ নাগাদ। অর্থমন্ত্রী হিসেবে আগামী বাজেট উপস্থাপনা হবে মুহিতের ১০ম বাজেট উপস্থাপন।স্বাধীন বাংলাদেশে তিনিই প্রথম অর্থমন্ত্রী,যিনি টানা ৮ম বারের মতো বাজেট উপস্থাপন করছেন।আবুল মাল আবদুল মুহিত এরশাদ সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবেও দুবছর দুটি বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন। এর আগে বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে সাইফুর রহমান মোট ১২টি বাজেট দিলেও তিনি এক নাগারে ৮টি বাজেট দিতে পারেননি।স্বাভাবিক নিয়মে জুনের প্রথম বৃহস্পতিবার বাজেট উপস্থাপন করাটা একটি রেওয়াজে পরিণত হলেও এবার হয়তো ব্যতিক্রম হতে পারে।কারণ এ বছর প্রথম বৃহস্পতিবার পড়েছে ২ জুন। তাই প্রথম বৃহস্পতিবার বাজেট উপস্থাপন না হলেও তা পরের বৃহস্পতিবার ৯ জুন উপস্থাপন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিষয়টি নিশ্চিত করবেন অর্থমন্ত্রী নিজে।

এবারের বাজেটকে কি নামে আখ্যায়িত করবেন- জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, আমিতো বরাবরই উচ্চাভিলাসী বাজেট দেই। সবাইতো এমন কথাই বলে। এবারও এর ব্যতিক্রম হবে না। আমার উপস্থাপিত বাজেট হবে অবশ্যই উচ্চাভিলাষী। তবে এবছর এর সঙ্গে যুক্ত হবে ‘‘স্বপ্নবিলাসী’’। কঠিন স্বপ্নবিলাসী। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন,বর্তমান সরকারের কিছু মেগা প্রকল্প রয়েছে।এ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন এ সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ। এবারের বাজেটে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে অর্থ বরাদ্দ অগ্রাধিকার পাবে। এ ছাড়াও এ বছর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বাড়ানো হবে। সবাইকে সমান হারে ভাতা দেওয়ার বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।

জানা গেছে, এ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে সামনে রেখে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনে একটি রূপরেখা তৈরি করেছেন অর্থমন্ত্রী। এই রূপরেখায় বিনিয়োগের মাধ্যমে মূলধন মজুত বৃদ্ধি,সরকারি বিনিয়োগে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, শিক্ষা, পরিবহন, যোগাযোগ, বন্দর উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আইসিটি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এডিপি পূর্ণ বাস্তবায়ন, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কার্যক্রমের গতিশীল আনয়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতা দূর করা, শ্রমশক্তির দক্ষ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ, বহির্বাজার সম্প্রসারণ, গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখা, অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের কথাও থাকছে।

এবছরের বাজেটে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়ানো ও দারিদ্র্যের হার কমাতে প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানোর কৌশল থাকবে। এজন্য এ বছর মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হারের ক্ষেত্রে গত ৭ বছরের প্রচলিত ধারা বা ছক কিংবা বৃত্ত ভেঙে নতুন চ্যালেঞ্জের পথে যাত্রার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। এই লক্ষ্য নিয়েই আগামী ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের কাঠামো চূড়ান্ত করতে কাজ করছেন অর্থমন্ত্রী। বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদের ৫ বছরের প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের ঘরেই সীমাবদ্ধ ছিল। দ্বিতীয় মেয়াদের দ্বিতীয় বছরেও প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের ঘর অতিক্রম করতে পারেনি। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে এখনও বলা হচ্ছে, এবছর শেষে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ অর্জিত হবে। প্রবৃদ্ধির হারের গত দীর্ঘ সময়ের বৃত্ত ভেঙে আগামী অর্থবছরে সরকার ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এ লক্ষ্য যাতে অর্জিত হয় সেজন্য সব ধরনের বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনাও মন্ত্রণালয়গুলোয় ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে গতানুগতিক বাজেটের কাঠামো থেকেও বের হয়ে আসার চেষ্টা করছে সরকার। তবে বাজেটের বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রাকে উচ্চাভিলাষী হিসাবেই অনেকে মনে করছেন। কেননা, বাজেটের আকার বাড়ছে। এই বিশাল অংকের বাজেট দিয়ে আগামী অর্থবছরে সরকারি-বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, পিপিপিকে আরও কার্যকর করা, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির পূর্ণ বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। চার বছর ধরে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা হলেও এখনও তা ৬ শতাংশের ছকেই রয়েছে। নতুন বাজেট প্রণয়ন করা হতে পারে ৭ শতাংশের অধিক প্রবৃদ্ধি ধরে।

পাশাপাশি প্রবৃদ্ধির ছক ভেঙে অর্থমন্ত্রী আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের উচ্চতর প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নিরূপণ করেছেন। ওই সময়ে কৃষিখাতের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ, শিল্পের প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৫ শতাংশ ও সেবাখাতের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ নির্ধারণ করে আশার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। ইতোমধ্যেই অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, এবারের বাজেটের সম্ভাব্য আকার হবে ৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা।

আসন্ন ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মানবসম্পদ খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। প্রথম অগ্রাধিকার থাকছে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে সার্বিক মানবসম্পদ উন্নয়ন। দ্বিতীয় অগ্রাধিকার পাচ্ছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সড়ক, রেলপথ ও বন্দরসহ সার্বিক ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন। কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান থাকছে তৃতীয় অগ্রাধিকার খাত হিসেবে। চতুর্থ অগ্রাধিকার তালিকায় থাকছে সরকারি সেবা প্রদানে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি ও ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়ন। পর্যায়ক্রমে জলবায়ু মোকাবেলায় সক্ষমতা অর্জন ও বহির্বিশ্বের অর্থনৈতিক সুযোগ অধিকতর ব্যবহার ও প্রবাস আয় বৃদ্ধি এবং নতুন নতুন রফতানির বাজার অনুসন্ধান।

আগামী অর্থবছরের (২০১৬-১৭) বাজেটে বড় বড় প্রকল্পের জন্য আলাদা বাজেট থাকবে। মহেশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্র, গভীর সমুদ্রবন্দরসহ বড় অবকাঠামো প্রকল্প তৈরি করা হবে। মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য একটি মূলধনি বাজেট তৈরি হবে। এ জন্য ৫ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলার লাগবে। এসব বড় প্রকল্পে নমনীয় ঋণ পাওয়া যাবে না। কিছুটা বাড়তি সুদেই ঋণ নিতে হবে। চীনসহ চারটি দেশ এসব মেগা প্রকল্পে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে অর্থনীতি আরেক ধাপে উত্তরণ হবে।

এই বিশাল বাজেট বাস্তবায়নে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীল বজায় রাখার ঘোষণা থাকছে প্রস্তাবিত বাজেটে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি সহনশীল রাখা, বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, মুদ্রা বিনিময় হার কাঙ্খিত পর্যায়ে রাখার কথা বলা হয়। পাশাপাশি পদ্মা সেতুসহ ফাস্ট ট্রাক প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন, রাজস্ব খাতের পরিকল্পিত সংস্কার কার্যক্রমগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রফতানি বাড়ানোর প্রয়াস অব্যাহত ও জোরদার এবং সঠিক সময়ে এডিবি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাজেট বাস্তবায়ন করা হবে বলে প্রস্তাবিত বাজেটে বলা হতে পারে।

এপিএইচ/

লাইভ

টপ