behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

উদ্বৃত্ত খাদ্য ব্যবহারের কৌশল খুঁজছে সরকার

শফিকুল ইসলাম০৩:১১, এপ্রিল ০৪, ২০১৬

গুদামজাত খাদ্যগম ও চালে ভরা দেশের সরকারি গুদামগুলো। এরপরও সরকার আগামী ১ মে থেকে শুরু করবে দেশব্যাপী বোরো সংগ্রহ অভিযান। এজন্য ওই সময়ের আগেই গুদাম খালি করতে হবে। গুদাম খালি না করলে নতুন বোরো রাখার স্থান সংকুলান হবে না। আর এতে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কিন্তু কিভাবে গুদাম খালি করা হবে বা গুদামজাত গম ও চাল কী করা হবে, এ নিয়ে চিন্তিত সরকারের নীতি-নির্ধারকরা। সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে চাল ও গম বরাদ্দ দিলেও এখন আর তা নিতে চান না কেউই। গ্রামাঞ্চলের শ্রমিকরাও এখন কাজের বিনিময়ে নগদ টাকা চান। ফলে বাড়তি গম ও চাল নিয়ে বিপাকে পড়েছে সরকার।
সরকারি গুদাম খালি করার কৌশল ঠিক করতে সোমবার (৪ এপ্রিল) বিকেলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠক ডাকা হয়েছে সরকারি খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির। ওই বৈঠকে খাদ্যমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলাম সভাপতিত্ব করলেও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবরাও উপস্থিত থাকবেন।  

জানা গেছে, গুদাম খালি করতে এই বৈঠকে সরকার খোলা বাজারে ১০ টাকা কেজি দরে ফেয়ার প্রাইস কার্ডের মাধ্যমে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। আগে একবার এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও পরে তা স্থগিত করা হয়। দেশের সর্বত্র এ কর্মসূচির আওতায় গুদামজাতকৃত চালগুলো বিক্রির সিদ্ধান্ত নিলে তাতে সমস্যাও রয়েছে। কারণ, এপ্রিল মাসজুড়ে চলবে কমদামে চাল বিক্রি। আর কিছুদিন পরেই মে মাসে শুরু হবে বেশি দামে চাল কেনা। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এক শ্রেণির সুবিধাবাদী লোক দলীয় আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে কমদামে এই ওএমএসের চাল কিনে তা বেশি দামে সরকারের কাছেই বিক্রি করতে পারে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলেও সরকার কমপক্ষে ২৮ টাকা কেজি দরে বোরো সংগ্রহ করবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। যা শুরু হবে ১ মে থেকে। ১০ টাকা কেজি দরের চাল কিনে তা ১৫/২০ দিন পরে ২৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি করার সুযোগ পেলে সে সুযোগ কে হাত ছাড়া করে? এই আশঙ্কায় সরকার উদ্বিগ্ন বলে জানা গেছে। তবে সরকারের নীতি-নির্ধারকরা বলছেন, এমনটি হওয়ার সুযোগ নেই।    
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাঠ পর্যায়ে সংসদ সদস্যরা টিআর কর্মসূচিতে চাল বা গমের বরাদ্দ নিতে চান না। তারা চাল বা গমের বদলে নগদ টাকা চান। টিআর কর্মসূচিতে পাওয়া চাল-গম বাজারে বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হয় সংসদ সদস্যদের। কিন্তু বাজারে বিক্রি করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যথাযথ দাম পাচ্ছেন না। সরকার ২২ টাকা কেজি দরে চাল বরাদ্দ দিলেও বাজারে এই চাল বিক্রি করতে হয় ১৫ টাকা কেজি দরে। এ কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে সমস্যা হয়। আর এ সমস্যার কারণেই সংসদ সদস্যরা টিআর কর্মসূচিতে চাল-গম নিতে চান না। এসব কারণে গুদামে চাল ও গমের পাহাড় জমেছে।
অভিযোগ আছে, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সুযোগ করে দিতেই অতিরিক্ত গম ও চাল কেনা হয়েছে। তারা কম দামে গম কিনে বেশি দরে সরকারি গুদামে সরবরাহ করেছে। সরকারি গুদামের পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও প্রচুর চাল মজুদ রয়েছে। এ ছাড়া, গত বছর পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকেও চাল দেশের বাজারগুলোয় এসেছে। শুল্ক আরোপ করেও সরকার ভারত থেকে চাল আসা ঠেকাতে পারেনি। এ সব কারণে ব্যাপক পরিমাণ চাল ও গম সরকারি-বেসরকারি গুদামগুলোয় জমে আছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ফেব্রুয়ারিতে সচিবালয়ে সার্বিক খাদ্য পরিস্থিতি নিয়ে এক জরুরি বৈঠকে চাল মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার আগেই কিভাবে দ্রুত বিতরণ করা যায়, সে ব্যাপারে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের দিক নির্দেশনা চাওয়া হয়েছিল। পরে গত ১১ মার্চ ওএমএস-এর চালের দাম কমিয়ে প্রতি কেজি ১৫ টাকা ও আটার দাম প্রতিকেজি ১৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে এতে ওএমএস-এর চাল বিক্রির পরিমাণ আদৌ বাড়বে কি না—তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এর আগে ২০১৫ সালের ২৩ নভেম্বর দাম কমালে বিক্রি বাড়বে। এই যুক্তিতে ওএমএস-এর চাল ও গমের দাম কমানো হয়েছিল। তখন প্রতিকেজি চাল ২৪ টাকা থেকে কমিয়ে ২০ টাকা ও প্রতিকেচি গমের দাম ১৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু এতে সাড়ে তিন লাখ টন ওএমএসের চালের মধ্যে মাত্র ৮১২ টন বিক্রি হয়েছে। বাকিটা বিক্রি হয়নি। তাই দাম কমিয়ে খোলাবাজারে চাল বিক্রি করে সরকারি গুদাম কতটা খালি করা যাবে, এ নিয়েও চিন্তিত সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। কারণ, সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশে (টিসিবি) হিসাব মতে, বর্তমানে সাধারণ দেশের বাজারে প্রতি কেজি মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৩২ থেকে ৩৪ টাকায়। যা ওএমএস-এর চালের চেয়ে প্রতি কেজিতে ১৭ থেকে ১৯ টাকা বেশি।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, মানুষ এখন আর লাইনে দাঁড়িয়ে চাল কিনতে চান না। এখন সব শ্রেণির মানুষের কাছেই টাকার চেয়ে সময়ের দাম বেশি। এ ছাড়া মানুষের সম্মান বোধ বেড়েছে। বেড়েছে মানুষের আয় রোজগারও। তাই তারা আর কম দামের চাল কিনতে লাইনে দাঁড়ানোটা ভালো ভাবে দেখেন না।  
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, বর্তমানে সরকারি গুদামগুলোয় ১৩ লাখ ৯৭ হাজার টন খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে ৯ লাখ ৮৯ হাজার টন চাল। অবশিষ্ট ৪ লাখ ৮ হাজার টন গম। গত বছর একই সময় সরকারের গুদামে খাদ্যশস্য ছিল ১০ লাখ ৭১ হাজার টন। চলতি বছর এত বেশি মজুদ হওয়ার কারণ, একদিকে বাম্পার ফলন, অন্যদিকে বেশি পরিমাণে সংগ্রহ।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর ৪৮ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশি জমিতে বোরো রোপণ করা হয়েছে বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাদের মতে, এবার ২ কোটি টন চাল উৎপাদন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই জমিতে বোরো জমির ধান পেকে উঠেছে। এ সপ্তাহেই কাটা শুরু হবে।
আগামী মে থেকে সরকার বোরো সংগ্রহ শুরু করবে। এর পরিমাণ হতে পারে কমপক্ষে ১০ থেকে ১২ লাখ টন। এ অবস্থায় আগামী দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে ১০ থেকে ১২ লাখ টন চাল বা গম গুদাম থেকে না সরালে নতুন ধান ও চাল সংগ্রহে জটিলতা দেখা দেবে। কারণ সরকারি গুদামগুলোর ধারণক্ষমতা প্রায় ১৭ লাখ টন। এ কারণেই তড়িঘড়ি করে সরকারি গুদাম খালি করতে নানা কৌশল খুজছে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে বোরো সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হলে একদিকে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে, বাজারে ধান ও চালের দামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ বিষয়টি নিয়েও সরকার চিন্তিত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খাদ্য বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সাধারণ মানুষ এখন মোটা চাল খেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। তারা চিকন চালের দিকে ঝুঁকেছেন। ফলে ওএমএস-এর চালের চাহিদা কম। তবে এ বক্তব্য মানতে নারাজ সংশ্লিষ্টরা। কারণ, সরকার ওএমএস চালু করেছে দরিদ্র মানুষের জন্য। তারা মোটা চালেই অভ্যস্ত। কিন্তু ওএমএস-এর চালের মান ভালো না থাকার কারণেই এর চাহিদা কম বলে তারা মনে করেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, মিল মালিকদের কাছ থেকে চাল সংগ্রহ করার সময় খুব ভালোভাবে মনিটরিং করা উচিত ছিল। তারা বিদেশ থেকে অল্প দামে নিম্নমানের চাল-গম আমদানি করে সরকারের কাছে বিক্রি করেছে কি না? সরকার মিল মালিকদের কাছ থেকে ৩২ টাকা কেজিতে চাল সংগ্রহ করেছে সরকার।
তবে আগে শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের পাশাপাশি সারাদেশে উপজেলা পর্যায়ে ওএমএস কার্যক্রম চললেও এখন থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে হাট-বাজারেও ওএমএস-এর চাল বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যেন চাল বিক্রির পরিমাণ বাড়ে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সরকারি খাদ্য মনিটরিং ও পরিধারণ কমিটির সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, সরকার দেশের মানুষের কাছে কম দামে খাদ্য সরবরাহ করতে পারলে সবচেয়ে বেশি খুশি হবে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলেই খাদ্যের দাম কমে। ফসলের বাম্পার ফলন হয়। খাদ্য উদ্বৃত্ত হয়। অন্য এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, নতুন বোরো সংগ্রহ অভিযান শুরু করতে হবে। এর আগে গুদামজাত খাদ্যশষ্যের কী হবে তা ঠিক করতে হবে। কী দরে, কত পরিমাণ বোরো সংগ্রহ করা হবে, তা নিরূপণ করতে হবে।  

/এমএনএইচ/

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ