behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

ইলিশের হালি ৪০ হাজার টাকা!

শফিকুল ইসলাম২২:০১, এপ্রিল ০৬, ২০১৬

ইলিশবিশ্বাস হোক, আর না হোক, রাজধানীতে এক হালি ইলিশ মাছ বিক্রি হচ্ছে ৪০ হাজার টাকায়। সামনে পহেলা বৈশাখ। তাই ইলিশের কদর এখন বেশি। এটাই নাকি স্বাভাবিক। বলছেন, ইলিশ বিক্রেতারা। দিন নয়, ঘণ্টার ব্যবধানে এ দাম আরও বাড়বে। এমনটিই জানালেন তারা।

দাম বাড়ার আশঙ্কায় অনেকটা তড়িঘড়ি করে ৪টা ইলিশ ৪০ হাজার টাকা দিয়ে কিনে নিলেন রাজধানীর বনানীর বাসিন্দা আজমল হোসেন। সেগুলোর আকারও খুব একটা বড় নয়। চারটা ইলিশের ওজন হতে পারে সর্বোচ্চ ৫ কেজি। পকেট থেকে ৫০০ টাকার নোটের ৫০ হাজার টাকার বান্ডিল থেকে গুনে গুনে ১০ হাজার টাকা রেখে বাকি বান্ডিলটা দিয়ে দিলেন মাছ বিক্রেতা আশরাফ আলীর হাতে। আশরাফ আলী না গুনে পুরো বান্ডিলটাই রেখে দিলেন। গুনে নিলেন না কেন- জানতে চাইলে আশরাফ আলী বাংলা ট্রিবিউনের বলেন, ‘যারা ৪০ হাজার টাকা দিয়ে ৪টি ইলিশ কেনেন, তারা টাকা কম দেন না।’ বুঝলেন কীভাবে? জানতে চাইলে আশরাফ আলী একটু বুক ফুলিয়ে বলেন, ‘২৭ বছর ধরে এখানে মাছের ব্যবসা করি। এখন আর কাস্টমার চিনতে তেমন কষ্ট হয় না।’ এটি বুধবার সকালে রাজধানীর কাওরান বাজারের ঘটনা।

পেশায় ব্যাবসায়ী আজমল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বছরের একটি দিন। দামের দিকে তাকালে চলবে কী করে? এছাড়া ছেলেমেয়ের আবদার, এর দামতো আরও বেশি।’ পহেলা বৈশাখে কেনো এতো দাম দিয়ে ইলিশ খেতে হবে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এতো কিছু বুঝি না। এটি দীর্ঘ দিনের রেওয়াজ বা কৃষ্টি। এই আর কি। এছাড়া আপনারা সাংবাদিক। সব কিছুতেই ঝামেলা খোঁজেন।’ এরপর চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ নিয়ে তিনি চলে গেলেন।

শুধু রাজধানীর কাওরান বাজারই নয়, দেশের সবখানেই এখন ইলিশের চাহিদা। পহেলা বৈশাখ যতটা এগিয়ে আসবে এ চাহিদা ততোটাই বাড়তে থাকবে। তাই অনেকেই বলছেন, ইলিশের বাজারে যেন আগুন লেগেছে। ইলিশের দাম হয়ে উঠেছে আকাশছোঁয়া। চলে গেছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। রাজধানীর মেগাশপ থেকে শুরু করে কাঁচাবাজার কিংবা ফুটপাত সবজায়গাতেই ইলিশের দাম বেড়েছে বেশ কয়েকগুন। ফুটপাতে জাটকা সাইজের ইলিশের হালিও বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা দরে।

রাজধানীর কয়েকটি মেগাশপ ঘুরে দেখা গেছে, এক থেকে দেড় হাজার টাকার কমে কোনও ইলিশ নেই। এগুলোর সাইজ হবে সবোচ্চ ৫শ’ থেকে ৬শ’ গ্রাম। খিলগাঁও কাঁচাবাজার, শান্তিনগর বাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে ৪শ’ থেকে ৫শ’ গ্রাম ওজনের প্রতিজোড়া ইলিশের দাম সর্বনিম্ন ১৮শ’ টাকা।

রাজধানীর খিলগাঁওয়ের মগবাজারে ইলিশ মাছ কিনতে আসা বেসরকারি ব্যাংকের চাকুরে হোসন জাহিদ বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, গত ১০/১১ বছর ধরে পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে ইশিল মাছ কেনেন সন্তানদের জন্য। বছরের একটি দিন বলে টাকার দিকটাকে বড় করে দেখেন না। এবারও বৈশাখ উপলক্ষে ইলিশ মাছ কিনতে এসেছেন। কিন্তু মাছের দাম শুনে তিনি হতবাক।

হোসেন জাহিদ বলেন, ‘এক মাস আগেও আমি যে ইলিশ ২ হাজার টাকায় কিনেছি, আজ তা ৪ হাজার টাকা চাওয়া হচ্ছে।’

পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে রাজধানীর সুপারশপগুলোয় কেজি হিসেবে বিক্রি হয় ইলিশ। বৈশাখকে সামনে রেখে মীনাবাজার, আগোরা, স্বপ্নসহ রাজধানীর বিভিন্ন সুপার শপে প্রচুর ইলিশ তোলা হয়েছে। এরই মধ্যে বেচাকেনাও হয়েছে। তবে দাম চড়া। তারপরও টাটকা ও ফরমালিনমুক্ত ইলিশ পাওয়ার আশায় উচ্চবিত্ত ক্রেতারা এসব শপ থেকেই ইলিশ কেনেন। সংগ্রহকারীরা জানান, এপ্রিল মাস শুরুর আগেই ইলিশের দাম বাড়তে শুরু করে। এ ছাড়া বর্তমানে সরকারিভাবে ইলিশ ধরা বন্ধ রয়েছে। ফলে বাজারে সরবরাহ কম।

এ বিষয়ে জানতে পিরোজপুরের পাড়ের হাট বন্দরের মাছ ব্যবসায়ী (আড়তদার) ইসমাইল মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বর্তমানে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ রয়েছে। এ অবস্থায় আমরা আড়তদাররা ঢাকায় কোনও মাছ সরবরাহ করছি না। আমাদের আড়ত খালি। কোনও মাছ নাই। নদীতে চুপে চাপে ২/১ জন জেলে হয়তো জাল ফেলে। তাতে যে মাছ ধরা পড়ে তা স্থানীয় বাজারেই বিক্রি হয়। অনেকে জেলেদের নৌকা থেকেও সরাসরি ইলিশ কিনে নিয়ে যায়।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে ইসমাইল মিয়া জানান, কোনও কোনও আড়তে হয়তো আগের কেনা মাছ থাকতে পারে। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে একটু বেশি মুনাফার আশায় আগের কেনা মাছগুলো ফ্রিজিং করে রাখতে পারে। সেগুলোই হয়তো এখন রাজধানীর বাজারগুলোয় বিক্রি হচ্ছে।

একই তথ্য জানিয়েছেন বরিশাল চাঁন্দ রোডের মাছ ব্যবসায়ী এবাদত হোসেন। তিনি বলেন, ‘এই সিজনে আড়তে মাছ পাবো কোথায়? বর্তমানে আড়তের শ্রমিকেরা তাস-লুডু খেলে সময় কাটায়।’

এই যদি মোকামের অবস্থা হয়, তাহলে ঢাকার বাজারে বড় ইলিশ আসে কোত্থেকে? জানতে চাইলে এবাদত হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি তারাই ভালো বলতে পারবে। তবে অনেকেই বৈশাখ উপলক্ষে ইলিশ মাছ মজুদ করে রেখেছিলো। সেগুলোই এখন বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে।’

জানা গেছে, প্রতিবছরই পহেলা বৈশাখের আগে ইলিশের চাহিদা ও দাম দুটিই বেড়ে যায়। এ সুযোগে কিছু ব্যবসায়ী ইলিশ মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন। এতে দাম আরও বেড়ে যায়। গত বছর বেশ কিছু ব্যবসায়ী রফতানির জন্য মাছ মজুদ করেন। বিষয়টি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নজরে এলে ১১টি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানকে মজুদ রাখা ১ হাজার ১৫ মেট্রিক টন ইলিশ বাজারে ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। গত বছরের ২ এপ্রিল মন্ত্রণালয়ের দেওয়া নির্দেশনা মানা না হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বাজার তদারক করতে একটি চিঠিও দিয়েছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু সরকারের এ সব পদক্ষেপ নেওয়ার আগেই ব্যবসায়ীরা সুযোগ মতো ইলিশের দাম বাড়িয়ে দেন।

এদিকে গত দেড় বছর ধরে ইলিশ রফতানি বন্ধ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, সরকারিভাবে ইলিশ রফতানি বন্ধ হলেও পাচার রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ভারতে প্রতিনিয়তই পাচার হচ্ছে ইলিশ।

মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর সূত্র জানায়, ২০১২ সালের জুলাই থেকে ইলিশ রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। নিষেধাজ্ঞার আগে বাংলাদেশ থেকে ভারত, ইতালি ও আমেরিকায় ইলিশ রফতানি হতো। ২০১১-১২ অর্থবছরে হিমায়িত ইলিশ ৪ হাজার ৭৫ টন, তাজা ইলিশ ৪ হাজার ৪৯৪ টন রফতানি হয়। সেই সময়কার দর হিসেবে যার আনুমানিক মূল্য ছিল ২৯৭ কোটি টাকা। ২০১২-১৩ অর্থবছরে শুধু তাজা ইলিশ রফতানি হয়েছে ৩৮৮ টন। যার মূল্য প্রায় ১৮ কোটি টাকা।

অভিযোগ রয়েছে, রফতানি বন্ধ থাকায় ইলিশ চোরাই পথে পাচার হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে। যশোরের বেনাপোল সীমান্ত এবং সাতক্ষীরার ভোমরা সীমান্ত হয়ে উঠেছে ইলিশ পাচারের প্রধান রুট। প্রায়ই বিজিবির হাতে ধরা পড়ছে বড় বড় চালান। গত দেড় মাসে সাতক্ষীরা সীমান্তে ধরা পড়েছে পাঁচ হাজার কেজির বেশি ইলিশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালের জুলাই মাস থেকে বৈধভাবে ভারতে ইলিশ রফতানি বন্ধ রয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের কাছে ব্যাপক চাহিদা থাকায় নদী ও সাগর থেকেই ইলিশ পাচার হয়ে যাচ্ছে। বরিশাল, পটুয়াখালী ও ভোলা জেলার বিভিন্ন নদী থেকে ইলিশ ধরার পর জেলেরা সরাসরি তা ট্রলারযোগে সাগরপথে সুন্দরবনের সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করছে। স্থল সীমান্তপথেও ইলিশ পাচার হচ্ছে বলে জানা গেছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, বৈশাখের পর থেকে নদী বা সাগরে দেখা মিলবে ইলিশের, এমন আশা জেলেদেরও।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইলিশ রফতানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন মহলের সুপারিশ বা তদবির রয়েছে। বিশেষ করে ভারতে ইলিশ রফতানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য সুপারিশটা ছিল জোরালো।’

বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, ভারত এবং বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ভারতে ইলিশ রফতানির আগ্রহ রয়েছে। ভারতে ইলিশ রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্য বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাই কমিশনার পঙ্কজ শরণও তদবির করেছিলেন।

উল্লেখ্য, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী জিএম কাদের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থাকার সময় ভারতে ইলিশ রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

/এসআই/এজে/

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ