সময় এগোয়

Send
মাহমুদুর রহমান
প্রকাশিত : ১৬:৪১, মে ২০, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪৮, মে ২০, ২০১৬

মাহমুদুর রহমানআবাসিক এলাকার সংজ্ঞা না খুঁজে বেড়ানোই শ্রেয়। বাস্তবের সঙ্গে সংজ্ঞার পরিবর্তন ও অমিল এতই যে, এখন নতুন সংজ্ঞার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। বাড়ির সামনে উঠোন দেখে যারা জন্মেছেন, তারাই একসময় ইংরেজদের দেখানো দালানের সামনে বাগান গড়ে তুলেছেন। কিন্তু আজ তা কেবল বড় বিলাসিতা।
পারিবারিক জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক কমতির কাছে সৌষ্ঠবের পরাজয় আর প্রকৃতিবিমুখতার করাল গ্রাসে নিষ্পেষিত উন্নয়ন চলেছে নিজস্ব আর নতুন নিয়মে। গুলশানের বাগান যেমন এক চিলতে বারান্দা বা ছাদে সীমাবদ্ধ, তেমনি ধানমণ্ডিও হারিয়েছে নামকরণের স্বার্থকতা। কারণের ভিন্নতায় নিউ ইস্কাটনের আবাসিক এলাকাও ভেনটিলেটরে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছে। গোছানো, ছিম-ছাম এলাকাটি শুধু পরিকল্পিতই নয়, এখানে এক ধরনের আলসে অভিজাত্য ছিল। ঘোরানো বারান্দা সমৃদ্ধ বাড়িগুলোর সামনে বাগান না হলেও ফল গাছ-গাছালির ছায়ায় গ্রীষ্মের তাপদাহ থেকে সুরক্ষিত ছিল। সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকা কালের সাক্ষী অট্টালিকাগুলো এখন যুগের ছোট-ছোট না বলা জীবন কাহিনি নিয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তাদের জায়গায় গড়ে উঠেছে কংক্রিটের বাক্স নামক বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট, যার নেই কোনও প্রাণ। যে ক’টি এখনও আছে, সেগুলো চরম অবহেলায় অবশ্যম্ভাবী অন্তের অপেক্ষায় মাত্র।
তেমনই একটি দালান, পরিবারকে আশ্রয় না দিলেও সংস্কৃতির বলয়ে নিজস্ব স্বকীয়তায় দাঁড়িয়ে আছে। পুরনো দিনের বলে, রক্ষণাবেক্ষণ নির্লিপ্ততার মধ্যেও ফ্যাকাশে রূপ নিয়ে দণ্ডায়মান। কিছুটা সংস্কৃতি, কিছুটা ব্যবসায়িক কেন্দ্র হয়ে আশপাশের চরম বাণিজ্যিকীকরণ প্রলয়ের মধ্যেও বেঁচে আছে। এখানে সুরেলা কণ্ঠ মিশে যায় সুরের ঝংকারে, দরাজ কণ্ঠের আবৃত্তি জায়গা পায় কমপ্যাক্ট ডিস্ক বা হার্ড ড্রাইভে, নাটক-সিনেমার কথোপকথন যোগ হয়। বাড়িটির এক পাশে ছোট সমাগম স্থানে বসে আষাঢ়ে গল্প বা খুনসুটি। জানালার বাইরে, গাড়ির চালক বা দারোয়ানের জন্য নির্দিষ্ট দুই কামরার ঘরে সংসার পেতেছেন প্রসিদ্ধ এক স্কুলে চাকরিরত হিসাবরক্ষক।

ঢাকা শহরের মধ্যে সাধ্য অনুযায়ী এটাই যথেষ্ট। পর্দার ফাঁক গলে যতটুকু দেখা গেল, স্বপ্নে ভরা, পরিপাটি সংসার। শিক্ষিত মানুষের সীমিত জীবন। ঘরের ছাদে লম্বা হয়ে শুয়ে আছে একটি বিড়াল, তার সামনে রয়েছে এক জোড়া স্যান্ডেল। চার মাস আগেও ওই পাটি জোড়া ওখানেই ছিল। সাম্প্রতিক ঝড়-বৃষ্টিতে এতটুকু স্থান পরিবর্তন হয়নি। মসজিদ-মন্দিরের সামনে থেকে ব্যক্তিরা যাদের দৃষ্টি থাকে অন্যের পাদুকায়, তারা সম্ভবত এই এলাকার খবর জানেন না।

শিক্ষিত ছোট পরিবারের তারিফের শব্দগুলোর পরক্ষণেই হারিয়ে গেল। ঘরের পাশে ছোট ছাদে উচ্ছ্বিষ্ট আবর্জনা পরিষ্কারের কোনও প্রচেষ্টাই নেই। দুটি হোল্ড অল ব্যাগ, বেশ ভালো অবস্থায়, চারটি বড় মিনারেল পানির বোতল, অসংখ্য কোমল পানীয়ের বোতল। পলিথিনের ব্যাগ তো থাকবেই। এসবের সাথে ওই পরিবারের বসবাস। গ্রামের প্রভাতে উঠোন ঝারা হয়, ঘর- বাড়ি ঝাড়ু দেওয়া হয়, কিন্তু প্রাসাদ সমান অট্টালিকার মধ্যবর্তী গলিটির বেহাল অবস্থা কারও চোখে পড়ে না।

ফ্ল্যাট বাড়িতে যারা থাকছেন, তাদের মনোবৃত্তের পরিবর্তন এক অন্য সীমায় গিয়ে ঠেকেছে। বারান্দার গ্রিলে প্রদর্শন হয় ব্যবহৃত কাপড় আর ন্যাকড়ার সমাহারে। ডাস্টবিন আর অট্টালিকার আশেপাশে ডায়পার আর স্যানিটারি ন্যাপকিন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। এগুলো দেখতে দেখতে সবাই কেমন নির্লিপ্ত, অভ্যস্ত। কথায় কথায় নগরপিতাদের পিণ্ডি চটকানো হয়, টকশোতে  বিষোদগার হয়। সব উচ্ছন্নে গেল!

লেখক: কমিউনিকেশন বিশেষজ্ঞ

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ