‘তামাশার ৫’

Send
ফারহানা মান্নান
প্রকাশিত : ১৪:৩১, জুন ০৩, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪৯, জুন ০৩, ২০১৬

Farhana Mannanজিপিএ ৫ যেন এক তামশায় পরিণত হয়েছে! কে যে যোগ্যতার বলে পেয়েছে আর কে পায়নি এই বোঝাটাইতো মুশকিল। আসলে সরকার চেয়েছিলেন পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়াতে। চেয়েছিলেন ঝরে পড়া রোধ হোক। আর চেয়েছিলেন মিলিনিয়াম ডেভেলপমেন্টের লক্ষ্য অর্জন করতে। সে ইচ্ছে কিন্তু ঠিক পূরণ হয়েছে। লাখ লাখ পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়ে পাস করছে, ফ্রি বই পাচ্ছে, ‘৫’ লেখা একটা সার্টিফিকেট বগলদাবা করতে পারছে। লক্ষ্যতো অর্জন হয়েছে দারুণভাবে! সরকার দারুণভাবে সফল(!)। ছেলেমেয়েরা শিখলো, কী শিখলো না তাতে কার কী যায় আসে?
সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমার সংলাপে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছেঃ ‘এরা যত বেশি পড়ে তত বেশি বোঝে’। তাই বন্ধ হোক লেখাপড়া। কিন্তু একালে তো লেখাপড়া বন্ধ করার উপায় নেই বরং জানায় খাটো থাকুক! এই কি তবে আমরা চাই? অসুস্থ রাজনীতির দেশে শিক্ষাতো শিকোয় উঠে গিয়ে হীরক রাজার দেশেই পরিণত হবে দেখা যায়! অন্তত যে জানে না তাকে জানার সার্টিফিকেট দিলেতো তাই হবে।
আমি বলছি না সরকারের উদ্দেশ্য অসৎ। কিন্তু সরকার কি ভেবে দেখেছেন এতো এতো পাস করিয়ে কার কী লাভ? এভাবে চললে সার্টিফিকেটের মূল্য একসময় হবে শূন্য! বিশ্বের দরবারের কথা বাদই দিলাম। নিজের দেশেইতো ছেলেমেয়েরা জ্ঞানে মূর্খতার পরিচয় দিচ্ছে। আর এর প্রকৃত প্রমাণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ছেলেমেয়েদের ফেল করা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোও কিন্তু এই বিষয় নিয়ে সরগরম। হাস্যকরভাবে ছেলেমেয়েদের ‘মূর্খতা’র ভিডিও চিত্র ধারণ করে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। হাসছে জাতি আর হাসছে পুরো দেশ আর লজ্জায় মাথা লুকোনোর জায়গা নেই আমাদের জিপিএ ৫ পাওয়া ছেলেমেয়েদের। এমন ‘মূর্খ’ দেশ আর জাতি তৈরির ইচ্ছেটা আমাদের একুশ শতকে পৌঁছেই জাগলো?
ইতালিতে রিজিও ইমিলিয়ার স্কুলের নাম অনেকেই শুনে থাকবেন। প্রি-স্কুলের বাচ্চাদের জন্য অভিনব সব কনসেপ্ট ব্যবহার করা হয় স্কুলের জন্য প্রস্তুত করার উদ্দেশ্যে। ওদের ভাষ্য হলো বাচ্চাদের যদি স্কুল রেডিন্যেস প্রোগ্রামগুলোর মাধ্যমে স্কুলে পড়বার জন্য তৈরি করা যায় তবে ঝরে পড়া রোধ হবে। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি হবে। এই সব আধুনিক মনোভাবাপন্ন টেকনিক বাদ দিয়ে আমরা বসেছি গণ পাসের রাজনীতি নিয়ে। শিক্ষার অধুনিকরণ সম্পর্কে আমরা কত কম জানি! এত এত সব ট্রিনিং, বাজেট, প্রোগ্রাম, প্রজেক্ট, ডিজিটাল ক্লাসরুম- এগুলো সব কোনও কাজের? নৌকা যদি ফুটো থাকে তবে যতই পানি সেচে ফেলা হোক নৌকা কিন্তু ডুববেই! তাতে কোনও সন্দেহ নাই।
আমরা একুশ শতকে বাস করি। এ শতকে ছেলেমেয়েদের শুধু পাস করা সার্টিফিকেট দিলেই হয় না বরং ভবিষ্যতের চাকরির বাজারের জন্য প্রস্তুত করতে হয়। ভালো রেজাল্টের কাগজ নিয়ে চাকরির বাজারে ফেল করলে লোকসানটা আসলে হয় কার? এটা বুঝি?

আরও পড়তে পারেন: নন-এমপিও শিক্ষকদের হতাশ করলেন অর্থমন্ত্রী, আবার আন্দোলনের হুমকি
গবেষণায় দেখা গেছে ছেলেমেয়েদের শৈশবেই যদি শেখার ক্ষেত্রে জানার ক্ষেত্রে স্কেফোল্ডিং করা যায় তবে বড় হয়ে পড়ার, শেখার ও জানার মাঝের ফারাক কমে আসে অনেক। অথচ আমরা এইসব প্রি-স্কুল প্রোগ্রামে খরচ করি সব থেকে কম। যার ফলাফল কিন্তু লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ার সাথে সম্পর্কিত। শিক্ষা নিয়ে কাজ করেন এমন অনেকেই কিন্তু এই ব্যাপারগুলো অনুধাবন করতে পারেন না!
যাহোক শিক্ষায় জিপিএ ৫ এর তামাশার ভীড়ে নতুন তামসা হল পিএসসি পরীক্ষা বাতিল করার সিদ্ধান্ত! পিএসসি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তেই ছিল গলদ। এখন বহু পয়সা খরচা করে শেষ পর্যন্ত এটা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব দেখলে মনে হয় না আমরা একটা ভঙ্গুর রাজনীতির খোলসে একটি দরিদ্র দেশ! আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কত কত ভুল!
যাহোক লাখ লাখ জিপিএ ৫ দেওয়াও যে এক প্রকার ভুল এই সত্য সরকার হয়তো খুব শিগগিরিই অনুধাবন করবেন কিন্তু প্রতিবার নাকে খত দিয়েই কি শিখতে হবে? দেখে শুনে বুঝে শেখার কোনও প্রয়াসই কি থাকবে না? বার বার আয়নায় নিজেকে ছোট করতে হবে কেন? নিজের ভালো পাগলেও বোঝে কিন্তু হায় বোঝে না কেবল এই বাংলাদেশের মানুষ। তাই একদল ক্ষমতাবান মানুষ করতে থাকুক যা ইচ্ছে আমরা বরং হাওয়ার মতন জিপিএ ৫ এর কাগজ বুকে জড়িয়ে উল্লাস করি! সাধারণ মানুষের এর চাইতে বেশি আর করার কিইবা থাকতে পারে বলুন?

লেখক: শিক্ষা বিষয়ক গবেষক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ