সাধারণ জ্ঞান সবার হয় না, কারও কারও হয়

Send
ড. মাহতাব ইউ শাওন
প্রকাশিত : ১৬:০১, জুন ০৪, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪৬, মার্চ ১৮, ২০১৯

মাহতাব ইউ শাওন১.
ইউরোপের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা এটি। কয়েকজন আইনের অধ্যাপক আর তরুণ গবেষক (ল’ স্কলার) দুপুরের খাবার টেবিলে একসঙ্গে আড্ডা দিচ্ছেন। উপস্থিত তরুণ গবেষকদের মধ্যে সবাই ইউরোপের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমন্ত্রিত। কথা প্রসঙ্গে একজন অধ্যাপক প্রশ্ন করলেন- ‘আচ্ছা, ইসিটি’র (ECT)’ পুরো অর্থ কী হবে? অবাক বিষয়! তরুণ গবেষক একজন ইউরোপীয়ও এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারেননি।
অথচ সবাই কমপক্ষে তিনশ’টি ইসিটি(এস) সম্পন্ন করে ইউরোপীয় ল’ স্কলার হয়েছিলেন! যিনি এ প্রশ্নের নির্ভুল উত্তর দিতে পেরেছিলেন তিনি একজন নন-ইউরোপীয় স্কলার ছিলেন। আর তিনি ছিলেন বাংলাদেশি।
২.
এটা ইউরোপের আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা। আগের বিশ্ববিদ্যালয়টির চেয়েও এটি আন্তর্জাতিকভাবে বেশি নামি বিশ্ববিদ্যালয়। ঘটনার স্থান এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আন্তর্জাতিক মাস্টার অব ল প্রোগ্রামের শ্রেণিকক্ষ। অর্থনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক আইন বিষয়ক শিক্ষাদানকালে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক প্রথমেই একটি সাধারণ জ্ঞানের প্রশ্ন দিয়ে শুরু করলেন – ‘আচ্ছা, আধুনিক অর্থনীতির জনক কে?’

আইনের উচ্চতর শিক্ষার আসরে অর্থনীতির প্রাথমিকেরও প্রাথমিক একটি প্রশ্নের জবাব খুঁজতে সে এক বিব্রতকর পরিস্থিতি! পুরো শ্রেণিকক্ষে পিনপতন নীরবতা নেমে এলো! আমেরিকা আর ইউরোপ মহাদেশের ‘ল’ গ্র্যাজুয়েটদের তখন মর্যাদাহানির আশঙ্কায় চরম অস্বস্তিতে! এমনকি শিক্ষক মহোদয়কেও বেশ অসহায় দেখাচ্ছিল। স্বস্তি ফিরিয়ে এনে এ প্রশ্নের সঠিক জবাব দিয়ে সে যাত্রায় বিশ্বের তাবৎ আইন স্নাতকদের মুখ বাঁচিয়ছিলেন একজন এশীয় ল’ গ্র্যাজুয়েট। না, চীনের নয়, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সাধারণ একজন ল’ গ্র্যাজুয়েট।

দুটি ঘটনায় সঠিক উত্তর দিয়ে তারা কোনও মহাজ্ঞানী হয়ে যাননি, আবার যারা উত্তর দিতে পারেননি তারাও মহাপাজী হয়ে যাননি।

আরও পড়তে পারেন: সৃজনশীল পদ্ধতি নিয়ে কিছু কথা

প্রথম ঘটনায় উপস্থিত ইউরোপীয় স্কলারদের সবাই এখন বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকতা করছেন। এমনকি টাইমস র‌্যাংকিংয়ে বিশ্বের প্রথম তিনটিতে স্থান পাওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিক্ষকতা করছেন অনেকেই। বরং তিনিই কোনও ধরনের বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন না, যিনি সেদিন দুপুরে ইসিটি’র (ECT)) ইলাবোরেশন ঠিকভাবে করতে পেরেছিলেন।

দ্বিতীয়ত, ঘটনায় উপস্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে তখন দুজন হার্ভার্ড গ্র্যাজুয়েট, একজন নিউইয়র্ক বার-এর সদস্য, একজন ক্যালিফোর্নিয়া বার এর সদস্য, একজন আমেরিকান পেটেন্ট অ্যাটর্নি এবং চারজন জার্মান ল’ গ্র্যাজুয়েট ও অ্যাডভোকেট ছিলেন। এছাড়া  ইউরোপ মহাদেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উত্তীর্ণ ল’গ্র্যাজুয়েট ছিলেন প্রায় কুড়িজন এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সনদপ্রাপ্ত আইনজীবী। এরাই এখন যার যার কর্মস্থলে যথেষ্ট সফলই বলা চলে!

বাস্তব কথাটি হচ্ছে- জিপিএ ফাইভ পেয়ে জিপিএ মানে বলতে না পারলেই সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়া নয়। সবাই যে সবকিছু জানবে এটা ভাবার কোনও কারণ নেই। সবাইকে সবকিছু জানতেই হবে এমন ভাবারও কোনও কারণ নেই। সাধারণ জ্ঞান হচ্ছে (হোক তা জেরারেল নলেজ কিংবা হোক কমনসেন্স) এরকম একটা জিনিস, যা সাধারণের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় না। এটা থাকা ভালো কিন্তু না থাকলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায় না। সাধারণ জ্ঞান সাধারণের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় কদাচিৎ। আসলে সাধারণ জ্ঞান সবার হয় না, কারও কারও হয়। এতে মুষড়ে পড়ার কিছুই নেই!

লেখক: আইনজীবী, আইন ও উন্নয়ন বিষয়ক গবেষক

.

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ