প্রিয়-অপ্রিয়

Send
মাহমুদুর রহমান
প্রকাশিত : ১৩:৪৪, জুন ১৮, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২৫, জুন ১৮, ২০১৬

মাহমুদুর রহমানষোল শতাব্দির প্রাবন্ধিক ফ্রান্সিস বেকন জীবনের বিভিন্ন বিষয়ে ৫৮টি রচনা লিখে গেছেন। প্রত্যেকটি ভাব উদ্রেক করার মতো। যদিও তর্ক থেকে যাবে- তার দেওয়া তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আজকের সমাজে কতটা প্রযোজ্য। শুধু তিনি নয়, শেক্সপিয়ারের, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বৈশ্বিকতা নিয়েও আজ অনেকে প্রশ্ন করেন। বেশ্বিকতা কি দিয়ে বিচার হবে, ওটা নিয়েই সব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব। Of Truth লিখতে গিয়ে শুরুতেই বেকন বলেছেন ‘What is truth?’ said jesting Pilate and did not stay for an answer. রোমান সম্রাজ্ঞ পাইলেটের কটাক্ষকারী বক্তব্যে স্বয়ং সত্য প্রশ্নের সম্মুখীন। বেকনের ধারণায় সত্য নির্মম ও সাদামাটা। পক্ষান্তরে মিথ্যার মধ্যে রয়েছে রংয়ের ছটা। সত্য বলতে কোমড়ের জোর লাগে, মিথ্যা সহজেই বেরোয়। কবিরা সত্য-মিথ্যের মাঝে এক সৃষ্টির সন্ধানে থাকে। ব্যবসায়ীরা লাভের আশায় মিথ্যাকে আলিঙ্গন করেন। এর বাইরে মিথ্যাকে মানুষের স্বভাবসুলভ আকর্ষণ বলেই বেকন অভিহিত করেন।
সেই অর্থে ভাববার বিষয় হচ্ছে- আমাদের শিশুশিক্ষা। লেখাপড়া করলে যে গাড়ি-ঘোড়া চড়া যায় না, শিশুরা বড় হয়ে তা হাড়ে হাড়ে টের পায়। ছেলেভুলানো ছড়ায় যখন শিশুকে বলা হয় ‘দাদার হাতে কলম ছিল ছুড়ে মেরেছে’ তখন কি ভাবনা আসে যে- কলমের এই ব্যবহার মোটেও কাঙ্ক্ষিত নয়? অথবা এর মাধ্যমে কোমল মনে কলমকে এক প্রকার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ইন্ধন যোগান হচ্ছে?
রাজনীতিতে সত্য এবং তত্ত্ব উপাত্ত রয়ে-সয়ে ব্যবহার হয়। কখনো ধামাচাপা, কখনো অস্বীকার আবার কখনো বাক্সবন্দি করেই রাখা হয়। সমস্যা একটি জায়গায়, আর তা হলো- সত্যের এক বাজে অভ্যেস। কখনই সে চাপা থাকতে চায় না, পানির মতো, যতই পাত্রস্থ করা হয়, সে ফাঁক গলে বেরিয়ে আসবেই। Politics makes for strange bed fellows কথাটির পেছন যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। শেষ কথা বলে রাজনীতিতে কিছু নেই, এক ধরনের সুবিধাবাদী বক্তব্যের চাদর ব্যবহার করেন রাজনীতিবিদরা। এই যাদুকরি চাদর দিয়ে তারা অনেকেই তাদের বিশ্বাস, চেতনা ও মূল্যবোধ সবকিছুরই পরিবর্তনকে জায়েজ করে নেন। কিন্তু একদিকে যেমন স্বাধীনতা সংগ্রামের সঠিক ইতিহাস চর্চার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, সে সময়ে যদি বলা হয়- ইতিহাস চর্চার সময় এখন নয়, তখন বিড়ম্বনার সৃষ্টি হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে ঠিকই, কিন্তু হোতাদের বিচার কি হয়েছে? সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্য দিয়ে প্রশ্নটি আবার জেগেছে। স্বাধীনতার পরপরই জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের আত্মপ্রকাশ এবং তখনকার আওয়ামী লীগ সরকারের উৎখাতের উদ্দেশ্যে সশস্ত্র উদ্যোগ জাসদ করেছিল। সে সময়ে যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের পরিবার কি পেয়েছে ন্যায় বিচার? সৈয়দ আশরাফ বলেছেন- জাসদ ১৯৭৫ এর বিভীষিকার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। তার জবাবে আ স ম আব্দুর রব বঙ্গবন্ধু হত্যার দায় চাপিয়েছেন আওয়ামী লিগের ঘাড়ে। এমনকি চার জাতীয় নেতার জেলহত্যার দায়ও তিনি তাদের ওপর চাপিয়েছেন। সংসদে জাতীয় পার্টি নেতা কাজী ফিরোজ রশীদের আক্ষেপভরা বক্তব্যের অনেক অংশ মাননীয় স্পিকার এক্সপাঞ্জ করেছেন। নিজ জোটের মন্ত্রিসভার সদস্য নিয়ে যখন এমন কঠিন অভিযোগ ওঠে, জনসাধারণের মধ্যে প্রশ্ন আসতেই পারে। নেতাকর্মীর হত্যা যেমন বিচার্য, সাধারণ মানুষের হত্যা তেমনি বিচার্য। সংবিধান জনগণের, কোনও দলের নয়। আইনের শাসন জনগণের জন্য। সব হত্যার বিচার হতেই হবে। ‘অনেক স্বাদের ময়না’ তদন্ত নয়, আলামত নষ্ট নয়, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার যেভাবে হয়েছে, একই স্পৃহা দিয়ে এসব বিচার হওয়া প্রয়োজন। সংখ্যার তত্ত্বে যাবার প্রয়োজন নেই। স্বয়ং পুলিশকে যদি সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে মানববন্ধন করতে হয়, তাহলে বুঝতে হবে কবি উইলিয়াম বাটলার ইয়েট্স যথার্থই বলেছেন। ‘Things fall apart, the centre cannot hold’.

লেখক: কমিউনিকেশন বিশেষজ্ঞ

আরও পড়তে পারেন: জঙ্গি উত্থানের সূতিকাগার উত্তরাঞ্চল!

Save

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ