ব্রেক্সিটের আদ্যোপান্ত

Send
তানভীর আহমেদ
প্রকাশিত : ১২:৪৬, জুন ২৭, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৫৪, জুন ২৭, ২০১৬

তানভীর আহমেদব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি বিশ্ব রাজনীতিতে অনেকটা পারমাণবিক বোমার মতোই আঘাত হেনেছে! দায় নিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন, বিরোধী দল লেবার লিডার জেরেমি করবিনের পদত্যাগের দাবি জানিয়ে লেবার পার্টির শ্যাডো ক্যাবিনেট থেকে পদত্যাগ করেছেন ১১ জন এমপি। ব্রিটেনের রাজনীতিতে এমন অস্থিরতা দেখা যায়নি কখনও। এই পরিবর্তনের কারণে ব্রিটেনের অর্ধ শতাব্দীর পুরনো বিদেশ নীতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে বলছেন বিশ্লেষকরা। এই আঘাত যে দীর্ঘমেয়াদী সেটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, ডলারের বিপরীতে পাউন্ডের দরপতনে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নরকে তাৎক্ষণিকভাবে ২৫০ বিলিয়ন পাউন্ড রিজার্ভ ফান্ডের ঘোষণা দিয়ে জনগণকে আশ্বস্ত করতে হচ্ছে ব্রিটেন সবকিছু মোকাবেলায় প্রস্তুত। অন্যদিকে ব্রেক্সিটপন্থীরা জয়ী হয়েছে মূলত ঢালাও ইমিগ্রেশন নীতির কারণেই। ২০০৭ সালে বুলগেরিয়া ও রোম্যানিয়া ইইউ’র সদস্য পদ লাভের পর থেকেই শুরু হয় যত বিপত্তি। লন্ডনের ওয়েস্টমিনিস্টার আর পার্কলেনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ধারে চটের বস্তা জড়িয়ে রাত্রি যাপন শুরু করলো পূর্ব ইউরোপীয় নাগরিকরা। লন্ডনের রাস্তায় রাস্তায় শুরু হলো ভিক্ষাবৃত্তি। ইউরোপ থেকে শুধুমাত্র বিমানে চড়ে ব্রিটেনে আসলেই ব্রিটিশ নাগরিকদের মতো সকল সুযোগ সুবিধা তাদের জন্য হালাল হয়ে গেলো। শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, সামাজিক নিরাপত্তার জন্য আর্থিক অনুদান সব কিছু পাওয়ার অধিকার করে দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। কিন্তু এই সুবিধা যে স্থানীয় ব্রিটিশদের জন্য কত বড় বৈষম্য সৃষ্টি করেছিলো তার ফলাফল এসেছে ব্রেক্সিটের মাধ্যমে।
গণভোটের আগে ব্রিটেনের এথনিক মাইনরিটি কমিউনিটির দৃষ্টিভঙ্গি জানতে লেবার পার্টির পক্ষ থেকে পার্টির প্রধান কার্যালয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছিলো। লেবার পার্টির প্রথম সারির নেতাদের মধ্যে সেদিন উপস্থিত ছিলেন, এ্যালান জনসন এমপি, চুকা ওমনা এমপি, সিমা মালহোত্রা এমপি ও রুশনারা আলী এমপি। সংবাদ সম্মেলনে আমি চুকা ওমনাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘রুশনারা আলী এমপি যদি বাংলাদেশে বিয়ে করতে চান তাহলে রুশনারাকে ১৮ হাজার ৬ শত পাউন্ডের বাৎসরিক আয় দেখাতে হবে। ইইউভুক্ত নাগরিকদের তার দেশ থেকে স্পাউস আনতে ন্যূনতম আয় প্রদর্শনের কোনও বাধ্য বাধকতা নেই। একজন ব্রিটিশ হয়েও যেহেতু রুশনারা কমনওয়েলথভুক্ত দেশে বিয়ে করছেন তাই তাকে কঠোর অভিবাসন নীতিমালা দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছে। একই দেশে থেকে নাগরিকদের মধ্যে এমন বৈষম্যমূলক নীতির বিপক্ষে তোমার যুক্তি কী?’ রুশনারা যদিও হেসে আমার যুক্তি উড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘আমি বাংলাদেশে বিয়ে করবো তোমাকে কে বললো?’ তবে চুকা, সিমা মালহোত্রা ও রুশনারা তিনজনই একসঙ্গে বলে উঠলেন, এমন বৈষম্যমূলক নীতি চালু করেছে কনজারভেটিভ পার্টি, এই নিয়ম লেবার পার্টি যখন ক্ষমতায় ছিলো, তখন ছিলো না। এই ইস্যুটি অনেক কমনওয়েলথভুক্ত দেশের নাগরিকদের ব্রেক্সিটের পক্ষে মতামত দিতে বাধ্য করেছে। চুকা বললেন, ‘‘ইমিগ্রেশন ইস্যুটি তো ব্রিটেনের অভ্যন্তরীণ, এজন্য ইউরোপ ত্যাগ করতে হবে কেন?‘‘ এমন যুক্তি দিয়েছিলেন ইইউপন্থী লেবার নেতারা। কিন্তু তাদের এই যুক্তি শোনেনি জাতীয়তাবাদী ব্রিটিশরা।
বাংলাদেশী রেস্টুরেন্ট মালিকরা স্টাফ সংকটের কারণে বাংলাদেশ থেকে দক্ষ শেফ আনতে না পারলেও ইংল্যান্ডের সকল ইউরোপীয় রেস্টুরেন্ট মালিকদের ইউরোপ থেকে কর্মী আনতে কোনও ধরণের বাধার মুখে পড়তে হয় না। এক দেশে এমন বৈষ্যম্যমূলক নীতির কারণে কমনওয়েলথভুক্ত দেশের রেস্টুরেন্ট, টেকওয়ে ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক কর্মচারীরা ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিয়েছেন।

মোটর মেকানিক ইঞ্জিনিয়ার মাহী ফেরদৌস চল্লিশ বছর যাবৎ ব্রিটেনে বসবাস করেন। তিনি ব্রেক্সিটের বিপক্ষেই ছিলেন কিন্তু নির্বাচনের আগে তিনি হঠাৎ বুকে ব্যথা অনুভব করায় হাসপাতালে গিয়েছেন, ৯ ঘন্টা অপেক্ষার পর তিনি ডাক্তারের দেখা পেয়েছেন। বাড়ি ফিরে তিনি ব্রেক্সিটের পক্ষে তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছিলেন। শুধু মাহী ফেরদৌসই নন, সাধারণ সর্দি কাশি হলে ব্রিটেনে দুই-থেকে তিন সপ্তাহের আগে জিপি (জেনারেল প্র্যাকটিশনার্স) অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। যখন অ্যাপয়েন্টমেন্ট মিলে তখন আর সর্দি-কাশি কিংবা ফিভার থাকে না। এভাবে দিনের পর দিন মৌলিক অধিকার ও নাগরিক সেবার ওপর ইউরোপীয়ানরা ভাগ বসাতে বসাতে ব্রিটিশ নাগরিকদের বিরক্তি চরমে পৌঁছে দিয়েছিলো।

মধ্য ইংল্যান্ডের নাগরিকরাই ব্রেক্সিটের পক্ষে বেশি সোচ্চার ছিলেন, এই অঞ্চলের প্রায় ৬৯ শতাংশ ভোটারই ছিলেন ব্রেক্সিটের পক্ষে। মধ্য ইংল্যান্ডের কভেন্ট্রি শহরের বাসিন্দা আলী খান বললেন, তার এলাকায় সাধারণ মানুষ বছরের পর বছর বাড়ির জন্য অপেক্ষা করে বাড়ি পাচ্ছে না, আর ইউরোপীয়ানরা ব্রিটেনে প্রবেশ করেই তার সঙ্গে বাড়ির অধিকার নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে গেলো। এটা নাগরিক হিসেবে তার অধিকারে আঘাত বৈকি! লন্ডনের বাইরে কাজের সুযোগ অপেক্ষাকৃত কম তাই স্বল্প আয়ের নাগরিকদের সরকারি সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকদের অবাধ প্রবেশ নাগরিক সুবিধায় বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। গত দশ বছরে ইইউভুক্ত দেশ থেকে যত নাগরিক ব্রিটেনে প্রবেশ করেছে সেই তুলনায় জিপি (চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র) প্রতিষ্ঠা করা যায়নি বরং প্রত্যেক কাউন্সিলে একাধিক জিপি বন্ধ করা হয়েছে ব্যয় সংকোচন নীতিমালার অজুহাতে। অধিক ইমিগ্রেশনের কারণে চিকিৎসা খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছিলো ব্রিটেনে। পেশায় অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার আলী খান বলছিলেন, আশির দশকে মার্গারেট থেচার ব্রিটেনকে বিশ্বের অন্যতম ফাইন্যান্সিয়াল হাবে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। থেচার শিল্পায়নবিরোধী ছিলেন। সেই সময়ে ব্রিটেনের গাড়ি প্রস্তুতকারী শিল্প ফোর্ড ও ভক্সওয়াগনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যায়। ব্রিটেন ফাইন্যান্সিয়াল হাবে ঠিকই পরিণত হয়েছিলো কিন্তু তার শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো একে একে বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো, আর এই সুযোগে ইউরোপের শিল্প প্রতিষ্ঠান অবাধে ব্রিটেনের বাজার দখল করে ফেলে। তাই এখন ব্রিটেনের রাস্তায় ফোর্ডের বদলে ‘বিএমডব্ল্উি’ আর ‘মাজদা’র ছড়াছড়ি। ব্রিটেনে ব্যবসায়ীদের সংগঠন ইউকেবিসিসিআাই’র প্রেসিডেন্ট বজলুর রশীদ এমবিই মনে করেন, ব্রেক্সিট দীর্ঘ মেয়াদে সুফল বয়ে আনবে। ব্রিটিশরা একেবারে অলস হয়ে গেছে। কোনও কাজ করতে চায়না, নিজেদের প্রোডাকশন কমিয়ে দিয়েছে। ব্রিটেনের আরও স্বাবলম্বী হওয়া উচিত, অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ব্রেক্সিট ব্রিটেনকে ঘুড়ে দাঁড়াতে সহায়তা করবে বলে মনে করেন বজলুর রশীদ এমবিই।

ফারহান মাসুদ খান লন্ডনের বার্কিং এলাকায় থাকেন, তার বাড়ির দুইপাশে দুইজন ইউরোপীয়ান প্রতিবেশী। দুজন ইউরোপীয়ানের বাড়িতে ইতিমধ্যেই চুরি হয়েছে। ফারহান মাসুদ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন তার বাড়িতে কখন আবার চুরি হয়। ফারহানের দুই প্রতিবেশীর বাড়িতে যারা চুরি করেছিলো তারা ইস্ট ইউরোপীয়ান। সম্প্রতি ব্রিটেনের এক স্কুল ছাত্রীকে ধর্ষণ করে হত্যা করার পরও এক বুলগেরিয়ান খুনিকে ব্রিটেন থেকে বহিস্কার করা যাচ্ছে না, শুধুমাত্র ইউরোপীয়ান আইনের কারণে। পরবর্তীতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে ছয়টি ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে তার নিজ দেশে। এমন একজন খুনি ও ধর্ষককে ব্রিটেনের রাখতে হচ্ছে ইউনিয়নভুক্ত হবার কারণে। সাধারণ ব্রিটিশ নাগরিকদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে সব সময়, ইইউ সুবিধা নিয়ে ইউরোপের তাবৎ খুনি, সন্ত্রাসী আর চোর-ডাকাতদের স্বর্গ হয়ে উঠবে ব্রিটেনের তাই ব্রেক্সিট ছাড়া কোনও গত্যন্তর নেই।

আরেকটি বিষয় ব্রিটিশ ভোটারদের খুব বেশি প্রভাবিত করেছে সেটি হলো ব্রিটিশ সমাজের সঙ্গে ইউরোপীয়দের শিষ্টাচারের মধ্যে বিস্তর ফারাক। ইউরোপীয়ানরা ব্রিটেনে আসলেও ব্রিটিশ সমাজের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেনা দুর্বল ইংরেজি জ্ঞান ও  শিষ্টাচারের অভাবে। ইউরোপ থেকে সদ্য আসা ছেলেমেয়েরা স্থানীয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিশতে পারছে না। রাস্তায় যত্রতত্র ময়লা ফেলা, চুরি-ছিনতাই আর ইভটিজিংএ ইউরোপীয়ানদের জুড়ি মেলা ভার।

বর্তমানে যারা পিতামাতা, তারা মনে করেছেন ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য ব্রিটেনের নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হলে, চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা কমাতে হলে ব্রেক্সিটই উত্তম পথ। এখন যদি একটি চাকরির জন্য ১০ জনকে মোকাবিলা করতে হয় ব্রেক্সিট না হলে সেই প্রতিযোগিতা হয়তো হতো ৫০ জনের সঙ্গে।

কনজারভেটিভ পার্টির সাবেক কো-চেয়ার ব্যারোনেস ওয়ার্সি বলছেন, ব্রেক্সিট মুসলিম বিদ্বেষ বাড়াবে। এর পক্ষে তিনি কিছু উদাহরণও দেখিয়েছেন; ব্রেক্সিটের পর হ্যাভেন কাউলি নামে এক ব্রিটিশ নারী টুইটারে লিখেছেন, তার মেয়ে বিকেলে যখন অফিস থেকে ফিরছিলো তখন দেখেছে কয়েকটি মেয়ে একটি মুসলিম মেয়েকে কর্ণার করে বলছে, ‘গেট আউট, উই ভোটেড ফর আউট।’ শনিবার  ইংল্যান্ডের বার্মিংহ্যাম শহরে বাংলাদেশী মসজিদে ‘ইংলিশ ডিফেন্স লীগ’ হামলা করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। ব্রেক্সিটের পর ব্রিটেনে মুসলিম বিদ্বেষ বেড়ে গেছে বলেই খবর আসছে বিভিন্ন মাধ্যমে।

ব্রেক্সিটের পর অনেক ভোটার মনে করছেন- দ্বিতীয়বার গণভোট হওয়া উচিত আর এই দাবির পক্ষে অবস্থান নিয়ে পার্লামেন্টের অনলাইন পিটিশনে ইতিমধ্যে ৩৫ লাখ স্বাক্ষর জমা পড়েছে! তবে একই ইস্যুতে দ্বিতীয় দফা গণভোটের সাংবিধানিক কোনও সুযোগ নেই, কারণ দ্বিতীয় দফা গণভোট হলে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতকেই অগ্রাহ্য করা হবে, যা অগণতান্ত্রিক। যদিও স্বাক্ষর ১ লাখের কোটা পেরিয়ে ৩৫ লাখে পৌঁছানোর কারণে গণভোট নিয়ে পার্লামেন্টে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক, বাংলা টিব্রিউনের বিশেষ প্রতিনিধি ও একাত্তর টেলিভিশনের যুক্তরাজ্য প্রতিনিধি।

আরও খবর: ব্রেক্সিট প্রশ্নে ভেটো দিতে পারে স্কটল্যান্ড

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ