একজন হিরো আলম

Send
হারুন উর রশীদ
প্রকাশিত : ২২:২২, জুন ৩০, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৩০, জুন ৩০, ২০১৬

হারুন উর রশীদএই সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুক এবং ইউটিউবে ঝড় তুলেছেন একজন। যার আসল নাম আশরাফুল আলম। বাড়ি বগুড়া। পেশায় একজন ডিশলাইন ক্যাবল অপারেটর ব্যবসায়ী। তবে তার পুরো নামটি হারিয়ে গেছে হিরো আলম নামের মাঝে। তিনি এখন সবার কাছে হিরো আলম। তিনি কী এমন করেছেন যা নিয়ে এত হই-চই। যাকে ঘিরে মেতে উঠেছে মূলধারার গণমাধ্যমও!
সাধারণ দৃষ্টিতে কিছুই না। তিনি নিজের মতো করে মিউজিক ভিডিও বানিয়েছেন, মডেল হয়েছেন। ভাবেননি এর ব্যাকারণ নিয়ে। চিন্তা করেননি কে কী ভাবলো। পাত্তা দেননি আমাদের পোশাকি আচরণকে। তিনি নিজে গান গেয়েছেন। অন্যের গানে নায়িকাদের নিয়ে নেচেছেন। আবার তৈরি করেছেন নাটকীয়তা। সংলাপ দিয়েছেন, জুড়ে দিয়েছেন গান।
তিনি যেন এক রাজকুমার। যা ইচ্ছে হয়েছে তাই করেছেন। কারোর কাছে হাত পাতেননি। কারোর কাছে ধরনা দেননি। নিজেই বিনির্মাণ করেছেন নিজের স্বপ্ন। আবার তা নিজেই প্রচার করেছেন নিজের ক্যাবল নেটওয়ার্কে, ইউটিউবে, ফেসবুকে। আর এখন তা লাখ লাখ মানুষ দেখছেন। আর এ পর্যন্ত তিনি তৈরি করেছেন কমপক্ষে ৫০০ মিউজিক ভিডিও। বানিয়েছেন দুটি নাটক। সামনে আছে আরও বড় পরিকল্পনা। আছে রূপালি পর্দার হিরো হওয়ার স্বপ্নও।
হিরো আলম কে? কোথায় তার আবাস? পড়াশোনা কতটুকু? এসব প্রশ্নের জবাব এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই পাওয়া যায়। তাকে নিয়ে প্রতিবেদন করেছে কোনও কোনও পত্রিকা। টেলিভিশন-চ্যানেল তার সাক্ষাৎকার নিয়েছে। তার সঙ্গে ছবি তুলে অনেকেই ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। আর হিরো আলমকে নিয়ে ফেসবুক ফান অ্যাপসও তৈরি হয়েছে। তাতে হিরো আলমের ‘পরবর্তী সিনেমায়’ কে কোন ভূমিকায় অভিনয় করবেন তা জানা যাচ্ছে। এই অ্যাপস দিয়ে নিজের ভূমিকা নির্ধারণ করে তা ফেসবুকে পোস্টও দিচ্ছেন অনেকে। ফেসবুকে হিরো আলম লিখে সার্চ দিলেই পাওয়া যাচ্ছে তার এবং তাকে নিয়ে নানা কাজের খবর।
একজনকে দেখলাম হিরো আলমের একটি সাক্ষাৎকার নিয়ে ফেসবুকে ছেড়েছেন। যিনি সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন তিনি ঢাকার একজন মডেল। আর সেই সাক্ষাৎকারে তিনি আলমকে যেসব প্রশ্ন করেছেন তা হাস্যকর। তারমধ্যে একটি প্রশ্ন হলো- ‘আপনি তো সাকিব খানের ভাত মেরেছেন এখন কী হবে?’ জবাবে আলম অবশ্য বলেছেন, ‘কোথায় সাকিব ভাই আর কোথায় আমি!’

হিরো আলমকে নিয়ে যারা এই মাতামাতি করছেন তাদের একটি বড় অংশের উদ্দেশ্য পরিষ্কার। তারা তাকে নিয়ে মজা করছেন, ফান করছেন, কৌতুক করছেন। আলম তাদের কাছে যেন একটি জীবন্ত কৌতুক। তারা এখন তাকে নিয়ে নানাভাবে কৌতুকের মশলা যোগ করছেন।

আলমকে নিয়ে আমার সাংবাদিক বন্ধু এটিএন নিউজের সেজুল হোসেন একটি পোস্ট দিয়েছেন তার ফেসবুক পেজে। যার শিরোনাম- ‘হিরো আলমের চেয়েও যোগ্যতাসম্পন্ন আপনি?’

সেখানে তিনি লিখেছেন,‘ ছোটবেলা থেকেই অভাব-অনটনের সঙ্গে বেড়ে ওঠা আলমকে অভাবের কারণে আরেক পরিবারের হাতে তুলে দিয়েছিলেন বাবা-মা। সেই আলম পথভ্রষ্ট হননি। মানুষের ক্ষতির কারণ হননি। নিজের ভেতরের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে স্বাবলম্বী করেছেন। বিয়ে করেছেন। দুটি সন্তানও আছে। সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। একসময় সিডি বিক্রি করতেন। সিডি যখন চলছিল না তখন বগুড়ার এরুলিয়া গ্রামে শুরু করেন ক্যাবল নেটওয়ার্ক ব্যবসা।

চুরি করেননি, ডাকাতি করেননি, ঢাকায় ইয়াবা কারখানা খুলেননি। নিজে আর্থিকভাবে সচ্ছল হবার পর সুপ্ত বাসনার বাস্তবায়ন করতে নিজে নিজেই বিভিন্ন শিল্পীর গানের সঙ্গে নেচে গেয়ে মিউজিক ভিডিও বানিয়েছেন। না, সেসব মিউজিক ভিডিও অশ্লীল না। পোশাক যথেষ্ট শালীন। কোরিওগ্রাফি করেছেন কোনও সিনেমার গানের দৃশ্যকে অনুকরণ করে। ব্যস, সেটাই প্রচার করেছেন নিজের ক্যাবল নেটওয়ার্কে, নিজ গ্রামে। মানুষ সেটা দেখে আনন্দ পেয়েছে। উৎসাহ দিয়েছে। সাহস করে আলম দুটি নাটকও বানিয়েছেন। সেই নাটক এলাকায় প্রচার করে খেটে খাওয়া মানুষকে বিনোদন দিয়েছেন। গ্রামের মানুষ নিজের গ্রামেই মডেল হিসেবে কাউকে পেয়েছেন যে তাদের সঙ্গেই থাকে।

একজন হিরো আলম

সেজুল আরও অনেক কথা বলে একটি আবেদন জানিয়েছেন, ‘প্লিজ, হিরো আলমকে তার মতো কাজ করতে দিন। তার জীবন তার মতো করে এনজয় করতে দিন। শক্তির কবিতাকে একটু ঘুরিয়ে যদি বলি- কারো অক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে মশকরা করবেন না, কেননা কোনও না কোনোভাবে আপনিও সেই মশকরার যোগ্য।’

আমিও হিরো আলমের বেশকিছু মিউজিক ভিডিও দেখেছি। দেখেছি তার অভিনয়। তাতে একটি বিষয় আমার কাছে স্পষ্ট হয়েছে। আর তা হলো আলম সাবলীল। তিনি কাজ করেছেন মনের আনন্দে। তিনি একজন স্বপ্লবাজ তরুণ। তার চেহারা হয়তো আমাদের কথিত হিরোদের মতো নয়। গায়ের রং তথাকথিত ফর্সা নয়। দাঁতও নিপাট ঝকঝকে নয়। আর তিনি প্রমিত বাংলায় কথাও বলেন না। তাহলে তার মিউজিক ভিডিও মানুষ দেখছে কেন? ফান হিসেবে দেখছে? আমার তা মনে হয় না। যারা তাকে নিয়ে কৌতুক করছেন তারাই আসলে ভাঁড়।

আমার বিবেচনায় আলম একটা কাউন্টার বিনোদন তৈরি করেছেন। আমরা যেমন কাউন্টার কালচার অথবা কাউন্টার মিডিয়ার কথা বলি, সেরকম। আলম নিজে হয়তো সেটা বুঝে করেননি। কিন্তু বাস্তবে তাই। প্রচলিত মিডিয়া যখন জনমানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ, তখনই প্রয়োজন পরে কাউন্টার মিডিয়ার। প্রচলিত মিডিয়ার কাছ থেকে যখন মানুষ সঠিক তথ্য পায় না তখনই কাউন্টার মিডিয়া সঠিক তথ্য দিতে এগিয়ে আসে। বাংলাদেশে যেমন এখন সোস্যাল মিডিয়া কাউন্টার মিডিয়ার জায়গা দখল করে নিয়েছে। এখানে অনেক ভুল তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু মূলধারার মিডিয়াকে ঘাড় ধরে সঠিক পথে আসতে তারাই বাধ্য করে। কুমিল্লার তনু হত্যা তার প্রমাণ। মূলধারার মিডিয়া শুরুতে যখন চুপ ছিল, সরব ছিল কাউন্টার মিডিয়া। নারায়ণগঞ্জের শিক্ষক শ্যামল কান্তির ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে।’

হিরো আলম তাহলে কিভাবে কাউন্টার বিনোদন তৈরি করল? বাংলাদেশে টেলিভিশন-সিনেমায় একই ধরনের গল্পের নাটক আর সিনেমা দেখতে দেখতে সাধারণ দর্শকরা ক্লান্ত। এর সঙ্গে আছে নকল গল্পের মহামারি। আমরা ম্যাগাজিন, বিনোদন শো আর মিউজিক ভিডিও’র নামে যা দেখি তাও গতানুগতিক(ব্যতিক্রম অবশ্য আছে)। ফলে সাধারণ দর্শকরা এখন বিনোদন ক্লান্ত। আলম যা না জেনে করেছেন তা হলো- এই পুরানো জিনিসকেই নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন। এই উপস্থাপনার নতুনত্ব আলম নিজেই। সাধারণ মানুষ দেখেছে অনেক অর্থ বিনিয়োগ করে আমাদের কথিত হিরোরা যা করেন তা আলম নামমাত্র বা কোনও বিনিয়োগ না করেই করেছেন। বিষয় এক, একই ক্যানভাস। নতুন হলো আলম। তাই দর্শকরা একজন গ্রামের সহজ-সরল ছেলে আলমকে গ্রহণ করেছেন। তার সহজিয়া সাহসে তারা মুগ্ধ হয়েছেন। হাততালি দিয়েছেন। আলমের দর্শক বেড়েছে।

মানুষ সবসময় স্বাভাবিকতা পছন্দ করে। পছন্দ করে জীবনের কঠিন সংগ্রামকে। আর সেই সংগ্রামের পথে নিজেকে একাত্ম করে ভাবে। আলম এক সংগ্রামী যুবক। গ্রামের আরও অনেক তরুণের মতোই তিনি হিরো হতে চেয়েছেন। হাটতে চেয়েছেন স্বপ্ন পূরণের পথে। আমরা হয়তো বলতাম উপদেশ দিতাম, এটা কর, ওটা কর- তারপর হবে।

কিন্তু আলমের কেউ ছিল না। তিনি শুধু জানতেন- হবে, হতেই হবে। তাই আলম নিজেই নিজের যুদ্ধ করেছেন। তিনি হয়তো গ্রিক পুরানের হেক্টর বধের মতো যোদ্ধা অ্যাকিলিস হতে পারেননি। তিনি হয়তো আমাদের ভাষায় প্রমিত -বিশুদ্ধ হতে পারেননি। কিন্তু যে যুদ্ধটা করেছেন, তা করেছেন একাই। আর এই যুদ্ধটা মানুষ পছন্দ করেছে। তারা তো আলমের মিউজিক ভিডিও বা নাটক দেখে না। তারা দেখে একজন আলমের সাহসী যুদ্ধ। দ্বিধাহীন, জড়তাহীন যুদ্ধ। তাকে তারা দেখছেন একজন বাস্তবের হিরো হিসেবে।

আর তা সহ্য হচ্ছে না আমাদের শহুরে হিরোদের। তাই তারা আলমের ওপর হেজিমনি শুরু করেছেন। তারা চাইছেন না আলমের বিনোদন প্রাধান্য পাক। তারা আলমকে নিয়ে কৌতুক ভিডিও বানিয়ে, তার কৌতুকপূর্ণ সাক্ষাৎকার নিয়ে আলমকে ডুবিয়ে হিরো হতে চাইছেন। কিন্তু তারা বুঝতে পারছেন না যে- এটা করে তারা আসলে আলমকেই হিরো মানছেন। তারা এখন আলমকে সিঁড়ি বানিয়ে হিট হতে চাইছেন।

গ্রামসির কালচারাল হেজিমোনি শুধু বিশ্ব প্রেক্ষাপটে নয়, আমাদের সমাজের প্রত্যেক স্তরেই এই সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিদ্যমান। প্রত্যেক ক্ষমতাবানই চান তার অধীনস্তের ওপর তার সংস্কৃতি চাপিয়ে দিতে। আলম তার বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী নায়ক। তিনি তার নিজের সহজিয়া ভাষায় তার মতো করে এগিয়েছেন। আধিপত্যের সংস্কৃতি রপ্ত করার কোনও চেষ্টা করেননি। আর তা তাকে জনপ্রিয়তা দিয়েছে। তাই কেউ কেউ সেটা সহ্য করতে পারছে না। পোশাকের আড়ালে চরিত্র লুকিয়ে তাই তারা শুরু করেছে আরেক হেজিমোনি, আধিপত্য। কিন্তু তাদের সেই চেষ্টা সফল হবে না। কারণ আলম ইজ দ্য রিয়েল হিরো।

যারা আলমকে নিয়ে মজা করছেন, হাসছেন, নিজেদের হিরো ভাবছেন তাদের উদ্দেশে আরেকটি কথা বলতে চাই। ধরে নিলাম হিরো আলম কাক। মনে রাখবেন আপনি কিন্তু ময়ূর নন।

লেখক: সাংবাদিক

ইমেইল: swapansg@yahoo.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ