গুলশান জঙ্গি হামলা: অনেক প্রশ্ন

Send
ফারজানা হুসাইন
প্রকাশিত : ১৫:৩৫, জুলাই ১০, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪০, জুলাই ১০, ২০১৬

ফারজানা হুসাইনএকটা গল্প বলি। গল্পটা অনেকবার করে সবার শোনা আছে। দুই বন্ধু জঙ্গলে বেড়াতে গেছে। হঠাৎ তারা দেখতে পেলো ভালুক আসছে। ভালুক দেখেই একজন তার অন্য বন্ধুটিকে ফেলে রেখে তড়তড় করে গাছের মগডালে চড়ে বসল। অন্য বন্ধুটি গাছে চড়তে জানে না,তাই সে নিজের বুদ্ধিতে নিঃশ্বাস বন্ধ করে মৃত মানুষের মতো মাটিতে শুয়ে পড়লো। ভালুক এসে তাকে মৃত মনে করে চলে গেল।
গল্পের নীতিকথা হলো, বিপদের বন্ধুই প্রকৃত বন্ধু।
বন্ধুত্বের এই বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনী পড়েছি স্কুলের পাঠ্য বইয়ে। গল্পের শেষের নীতিকথা জানলেও, বিপদে কেউ বন্ধু থাকে না তাই মানতাম হয়তো। গতকাল থেকে দৈনিক পত্রিকাগুলো আমাদের শোনালো প্রকৃত বন্ধুত্বের গল্প। নতুন শোনা সেই গল্পের নাম ফারাজ, সেই গল্প পুরোটাই আসলে ফারাজের।
শুক্রবার রাতে হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার ঘটনায় পনের ঘণ্টার টান টান উত্তেজনাময় জিম্মি নাটকের পর জানা গেল নিহত বিশজনের হত্যাকাণ্ড রাতের প্রথমভাগেই করে ফেলেছে জঙ্গিরা। বাংলাদেশি যে কয়েকজনের মৃত্যুর খবর পুলিশ এবং পত্রিকাগুলো নিশ্চিত করেছে তাদের মধ্যে ফারাজ একজন। প্রথম আলোর কর্ণধার লতিফুর রহমানের নাতি উচ্চবিত্ত পরিবারের এই সন্তান উচ্চ শিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে থাকতেন, ছুটিতে দেশে পরিবারের কাছে বেড়াতে এসেছিলেন। ঘটনার দিন সন্ধ্যায় দুই বান্ধবীর সঙ্গে হলি আর্টিজানে খেতে গিয়ে জঙ্গি হামলার শিকার হন। হামলাকারী যুবকেরা তার কাছে কলেমা জানতে চায়, কোরআনের আয়াত জানতে চায়। জঙ্গিদের কাছে 'ঈমান পরীক্ষা'য় পাস করলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়, চলে যেতে বলা হয়। কিন্তু ফারাজ তার বন্ধুদের সেখানে ফেলে চলে আসতে চাননি, তাই বন্ধুদের সঙ্গে তাকেও হত্যা করা হয়েছে।
শহুরে শিক্ষিত পরিবার থেকে আসা আর স্বনামধন্য ইংরেজি মিডিয়াম স্কুল আর, বাংলাদেশের নামকরা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়া টগবগে তরুণ ছেলেগুলো যখন বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে সবার অজান্তে জঙ্গি হয়ে ওঠে, তখন ফারাজদের গল্প আমাদের আশার বাণী শোনায়।
তবু কোথায় যেন খটকা লাগে। জানি মানুষকে অবিশ্বাস করা পাপ, কিন্তু চারপাশের সব দেখে শুনে বিশ্বাস আজ তলানিতে ঠেকেছে। প্রশ্ন জাগে, ফারাজের এই বন্ধুত্বের কাহিনী, এই বীরত্বগাঁথা আমরা কোথা থেকে শুনলাম? বন্ধুদের ছেড়ে যেতে না চাওয়াতে নাকি একজনকে হত্যা করা হয়েছে! প্রথম আলোর কাহিনীর সূত্র কী? কে বলেছে এই গল্প? কে ছিল সেই প্রত্যক্ষদর্শী? একটা নাম, শুধু একটা নাম জানতে চাই।
দেশীয় পত্রিকাগুলোর সংবাদ থেকে জানতে পারি, এই কাহিনী বলেছেন ফারাজের একজন নিকটাত্মীয় হিশাম হোসেন (নিউইয়র্ক টাইমস, ২ জুলাই) । তিনি ‘ছাড়া পাওয়া এক জিম্মির কাছে থেকে ঘটনাটি শুনেছেন’। কিন্তু সেই ছাড়া পাওয়া জিম্মির নাম কোথাও নেই। কেউ এগিয়ে এসে বলেনি আমি অমুক, আমিই সেই ছাড়া পাওয়া জিম্মি।
হলি আর্টিজানে আটকে পড়া বাংলাদেশি জিম্মিদের বর্ণনা থেকে জানতে পারি, হত্যাকাণ্ড রাতেই শেষ হয়ে গেছে।
এই কথা স্বীকার করেছে ইসলামি স্টেটের তথাকথিত সংবাদ সংস্থা- আমাক। উপরন্তু বাংলাদেশি সূত্র আইএসপিআরও একই দাবি করেছে যে, রাতেই সবাইকে হত্যা করেছে জঙ্গিরা। হলি আর্টিজানের কিছু কর্মচারীকে জঙ্গিরা বাথরুমে আটকে রেখেছিল সারারাত, ওরা শনিবার সকালের সেনা অভিযান অপারেশন থান্ডারবল্ট-এর পর বেরিয়ে এসেছে। যাদের ছেড়ে দেওয়ার, সেই জিম্মিদেরকে সকালেই ছেড়ে দিয়েছে জঙ্গিরা। ছেড়ে দেওয়া জিম্মিদের সঙ্গে নাকি ফারাজ নামের ছেলেটি যেতে চায়নি, সেটা তাহলে কখন? নিশ্চয়ই সকালে। হলি আর্টিজানের পাশের বিল্ডিংয়ে বসে দক্ষিণ কোরিয়ান এক ভদ্রলোকের করা ভিডিও থেকে দেখা যায় জিম্মি ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাটি সকাল অনুমানিক ৭ টা থেকে ৮ টার মাঝে। কিন্তু আনন্দ বাজার পত্রিকার সূত্র ধরে জানা যায়, ভারতীয় তরুণী তরুশি জৈন মোবাইল ফোনে তার বাবার সঙ্গে সকাল ছয়টা পর্যন্ত যোগাযোগ করেছে। সে তার বাবাকে জানিয়েছে যে, সে ও তার বন্ধুরা একটি বাথরুমে লুকিয়ে আছে। অথচ একটি সূত্র প্রচার করছে রাত দুটোর দিকে আইএস-এর প্রকাশিত; মেঝেতে এলোমেলো পড়ে থাকা রক্তাক্ত লাশের ছবি দেখে ফারাজের পরিবার নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল ফারাজকে হত্যা করা হয়েছে। তাহলে এখানে কেউ একজন মিথ্যে বলছে। কে মিথ্যা বলছে -আমাক, আইএসপিআর, ভিডিও, আনন্দ বাজার না প্রথম আলো?
হলি আর্টিজানের জঙ্গি হামলার ঘটনার শুরুতেই প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসা এক প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা মতে আমরা জানতে পারি, হামলাকারী আট-নয় জন। পরক্ষণে জানা যায় জঙ্গি আসলে সাতজন। লাশ পাওয়া যায় পাঁচজনের, যদিও এই পাঁচজনের মাঝে হলি আর্টিজানের শেফকে ও জঙ্গি বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা ছিল পুলিশের। একজন জঙ্গি জীবিত অবস্থায় ধরা পড়েছে বলে জানা যায়, সিএমএইচ এ রাখা হয়েছে তাকে। সেই জীবিত জঙ্গি কে, কী তার পরিচয়- কিছুই আমরা জানি না। অনেকই সোশ্যাল মিডিয়ায় ফারাজকে জঙ্গি প্রমাণের চেষ্টা করছিলেন। ফারাজ ‘জঙ্গি’ নাকি জিম্মি আমরা কিভাবে নিশ্চিত হবো? যদিও ময়নাতদন্তের রিপোর্টে এসেছে ফারাজকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছিল। তবে কাউকে বীরের মর্যাদা দেওয়ার আগে বা জঙ্গি বলে ঘৃণা করার আগে আমরা সঠিক তথ্যটি জানতে চাই। এই চাওয়া কি খুব বেশি কিছু? এই প্রশ্নের সঠিক উত্তরটি আমরা পাবো কোথা থেকে?
২. আরেকটি খটকা থেকে যাচ্ছে জীবিত ফিরে আসা সুমের বাড়ৈ এবং তার ভাগনে রিপন কীর্তনীয়ার বক্তব্যে। শুক্রবার রাতের হামলা শুরু হওয়ার পর পর সুমের বাড়ৈ আরও কিছু কর্মচারীর সঙ্গে বাথরুমে লুকিয়েছিল বলে জানা যায়। পরবর্তীতে জঙ্গিরা তাদের বাথরুম থেকে বের হতে বলে, অভয় দেয় জঙ্গিরা বাংলাদেশিদের কিছু করবে না। তাদের টার্গেট কেবলই বিদেশিরা। সেই হিসেব মতে জঙ্গি হামলায় নিহত আরেকজন বাংলাদেশি জিম্মি ইশরাত আখন্দও তো পার পেয়ে যাওয়ার কথা। তবে ইশরাতকে জঙ্গিরা নাকি নাম জিজ্ঞেস করেছিল। ইশরাত নাম বললেও জঙ্গিদের ধারণা হয়, সে বাঁচার জন্য মুসলিম নাম বলেছে। জঙ্গিরা সন্দেহ প্রকাশ করে, ইশরাত মুসলমান হলে কেন সে হিজাব পরে না। অতঃপর মুসলিম নয় এই সন্দেহে ইশরাতকে হত্যা করা হয়। প্রশ্ন জাগছে, সুমের বাড়ৈ- এই নামটি তো মুসলিম নাম নয় । যদি সুমের মুসলমান না হয়, তাহলে সে কলেমা পড়তে পেরেছে কিংবা কোরআন থেকে কোনও বাক্য পাঠ করতে পেরেছে কি? আমাকে কেউ গীতা বা বাইবেল থেকে কোনও অংশ পড়তে বললে আমি পারবো না, কারণ অন্য কোনও ধর্মগ্রন্থ আমার জানা নেই। তাহলে হলি আর্টিজানের সব ঘটনার বর্ণনাকারী এই সুমের বাড়ৈ কিভাবে বেঁচে ফিরলেন? তবে কি ধর্মের ঢালের আড়ালে কেবল বিদেশি নাগরিক আর বাংলাদেশি উচ্চবিত্তদের হত্যা করে মিডিয়ার সামনে আলোড়ন তোলাই জিম্মি নাটকের মূল লক্ষ্য? হলি আর্টিজানের সামান্য কমর্চারি একজন সুমের বাড়ৈ মরলে কার কী যায় আসে? কিন্তু প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান ফারাজ আর ইশরাতদের হত্যা করলে সমাজের মূল ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেওয়া যায়, আতঙ্ক সৃষ্টি করা যায় বহুগুণে!
৩. কতকগুলো নিষ্পাপ প্রাণের বিনিময়ে শুক্রবারের জঙ্গি হামলার শেষ তো হয়েছে, কিন্তু আতঙ্ক কাটেনি এখনও। শেষ হয়নি একের পর এক নাটক আর চমকের। জঙ্গি হামলার পর পর আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস এই হামলার দায় স্বীকার করে। এর কিছুক্ষণ পর আল কায়েদা থেকে ও একই হামলার দায় স্বীকার করা হয়।
শনিবার প্রথম জঙ্গি হামলায় অংশ নেওয়া তরুণদের ছবি পোস্ট করে আমাক । এর কিছুক্ষণ পর বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকেও নিহত হামলাকারীদের যে ছবি প্রকাশ করা হয়, আমাক এর ছবিগুলোর সঙ্গে ব্যাপক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোর মাধ্যমে ঘণ্টা চারেকের মধ্যেই তিনজন জঙ্গির নাম ও পরিচয় বেরিয়ে আসে, এরা হলো- নিবরাস, রোহান ও সামীহ। তাদের সবাই ঢাকার উচ্চবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত ছেলে। অথচ পুলিশ বলেছে এদের নাম- আকাশ, বিকাশ রিপন, বাঁধন, ডন। এরা সবাই নাকি উত্তরাঞ্চলের জঙ্গি, পুলিশের খাতায় এদের নাম ছিল, পুলিশ এদের গ্রেফতারের চেষ্টা চালাচ্ছিল বহুদিন থেকে। সোমবার প্রথম আলোতে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী মৃত আরেক জঙ্গির নাম খায়রুল, সে মাদ্রাসার ছাত্র। তদন্তের নামে খায়রুলের দিনমজুর পিতাকে থানায় আনা হয়েছে, অথচ বাকি জঙ্গিদের প্রভাবশালী পরিবারকে জিজ্ঞাসাবাদ পর্যন্ত করা হয়নি। গল্পের গরু গাছে চড়তে খুব বেশি আর বাকি নেই!
রিপন, বাঁধন, বিকাশ, আকাশ, ডন - এই নাম প্রসঙ্গে ফেসবুকে পরিচিত মুখ এএসপি মাসরুফ হোসেন ব্যখ্যা দিয়েছেন, ‘জঙ্গি সংগঠনগুলো তাদের সদস্যদের নামকরণের ক্ষেত্রে একটা বিশেষ কৌশল অবলম্বন করে থাকে। রিক্রুটমেন্টের পর থেকে নতুন সদস্যের নাম ক্রমাগত পরিবর্তন হতে থাকে। আস্তানা পরিবর্তন, নতুন বাসা ভাড়া, প্রশিক্ষণগ্রহণ ও প্রদান, অস্ত্র-গোলাবারুদ সংগ্রহ ও হস্তান্তর, দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনাসহ প্রভৃতি ট্রানজিশনাল সময়ে তাদের নতুন নতুন নাম দিয়ে থাকে ইমেডিয়েট লিডাররা। একজন জঙ্গি সদস্য যতবার এইসব কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে ততবার তাকে নতুন নাম দেওয়া হয়। এমনও দেখা গেছে, এই প্রক্রিয়ায় অনেক পুরাতন জঙ্গিকে তারা বিভিন্ন প্রয়োজনে ১২/১৩টি নাম দিয়েছে। সেই প্রেক্ষিতেই গুলশানের সেই রেস্টুরেন্টে উল্লিখিত কোড/অস্থায়ী/ভুয়া নামের কয়েকজন জঙ্গি (বিকাশ, আকাশ, ডন, বাধন এবং রিপন )-এর শারীরিক অস্তিত্বের বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পায় পুলিশ। তাৎক্ষণিক বিশ্লেষণে বুঝে যায় যে, সর্বশেষ আস্তানায় তারা এই নাম ধারণ করে এই অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।’
এই ব্যাখ্যা জনগণ খুব সহজে মেনে নেয়নি। প্রশ্ন উঠেছে, পুলিশের ভাষ্যমত যদি তারা আগাগোড়াই জঙ্গি সংগঠনগুলোর ওপর নজর রেখে চলেছে এবং তারা যদি জানতো যে জঙ্গিদের এরকম নামকরণ করা হয়, নামগুলো বলার আগে "কোডনেম" বা "সম্ভাব্য নাম" লাগিয়ে দিলেই ঝামেলা শেষ হয়ে যেত।
সাইট ইনটেলিজেন্সে হামলাকারীদের ছবি প্রকাশের পর পরই পুলিশের পক্ষ থেকে এই নামগুলো প্রকাশ করায় মনে হয়েছে পলিটিক্যাল কারণে সাধারণ জনগণকে জোর করে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে, এরা আইসিস না, লোকাল সন্ত্রাসী। তাই এই নামগুলো বলার সাথে সাথেই জনগণের মনে হয়েছে যে পুলিশও পলিটিশিয়ানদের সাথে হাত মিলিয়ে তাদের বোকা বানানোর চেষ্টা করছে।
৪. হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে মূলত পাশের বিল্ডিং থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার এক ভদ্রলোকের করা ভিডিও ফুটেজগুলো। শনিবার সকালে সেনা অভিযানের আগে আগে হলি আর্টিজান থেকে বের হয়ে আসা হাসানাত রেজা করিম ও কয়েকজন হিজাব পরিহিতা ভদ্রমহিলাকে ভিডিওটাতে দেখা যায়। শনিবার হাসানাত করিমের পক্ষ থেকে তার পিতা মিডিয়াকে জানান, কী হয়েছিল হলি আর্টিজানের সে রাতে। এতগুলো মানুষ হত্যা করার পরও তার কথায় জঙ্গিদের প্রতি কিছুটা সহানুভূতি শোনা যায়। মুসলমান বলে জঙ্গিরা হাসানাত ও তার পরিবারের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেছে। হাসানতের স্ত্রী হিজাব পরে দেখে জঙ্গিরা খুশি হয়েছে, তাদের রাতে খাবার খেতে দিয়েছে। প্রথম দফায় হাসনাতের বাবার বক্তব্য সঠিক ও যুক্তিযুক্ত বলেই মনে হয়। কিন্তু আবারও খটকা জাগে যখন কোরিয়ান ভদ্রলোকের করা ভিডিও ফুটেজে ন্যাড়া মাথা হাসনাতকে শনিবার সকালবেলা ছাদে সিগারেট খেতে দেখা যায়, তার ঠিক পেছনে অলস ভঙ্গিতে হেঁটে আসতে দেখা যায় অস্ত্রধারী দুই জঙ্গি। ভিডিও চিত্রটিতে হাসনাতকে কোথাও জিম্মিসুলভ আচরণ করতে দেখা যায়নি, তাকে আতংকিত বা সংশয়গ্রস্ত বলে বোধ হয়নি মোটেই। তবে কী হাসানত ও জঙ্গিদের একজন, এই প্রশ্ন এখন সবার মনে। একজন ধর্ম নিষ্ঠ মুসলমান রোজার মাসে সকালবেলা ধূমপান করেন না। তাহলে মুসলমান বলে হাসনাতের পরিবারকে সারারাত যে খাতির যত্ন করলো জঙ্গিরা, সেই জঙ্গিদের সামনে সকালে রোজা না রেখে সে ধূমপান করে কীভাবে? সকালবেলা ছাদেই বা তাকে নিয়ে যাওয়ার কী প্রয়োজন? খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই হাসনাত করিম নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। হিজবুত তাহরীরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর কেবল মিলবে হাসনাত করিমের কাছে।
১ জুলাই হলি আর্টিজানের মতো আরেকটি ব্ল্যাক ফ্রাইডে যেন বাংলাদেশে পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেজন্য রহস্যগুলোর জট খোলা খুব দরকার, ধাঁধাগুলোর সঠিক উত্তর আমাদেরকে আশ্বস্ত করবে। সুষ্ঠু তদন্তের তাই কোন বিকল্প নেই।
৫. আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী গ্রুপের সঙ্গে দেশি জঙ্গিগ্রুপের সম্পর্কের কথা এতদিন কেবল আমাদের ধারণার বিষয় ছিল, হলি আর্টিজানের হামলা সেই ধারণাকে সত্য প্রমাণ করেছে। মূলধারা হতে বিচ্ছিন্ন মাদ্রাসা শিক্ষার সঙ্গে জঙ্গিবাদের সম্পৃক্ততার প্রতি যে আঙুল আমরা এতদিন তাক করেছি, নিবরাস, সামীহ আর রোহানদের জন্য সেই আঙুল আজ আমাদের দিকে। জঙ্গিগ্রুপের সঙ্গে তরুণদের জড়িয়ে পড়ার পেছনের কারণ বলেছি দরিদ্র আর শিক্ষার অভাব। হলি আর্টিজানের জঙ্গিরা সেই ধারণাকেও ভুল প্রমাণ করেছে। জঙ্গিদের পরিচয় বেরিয়ে আসার পর জানা যায়, তারা গত তিন থেকে ছয় মাস নিখোঁজ ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, এসময়ের মধ্যে ওরা বড়সড় প্রশিক্ষণ নিয়েছে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে তারা কোথায় গেছে, দেশেই ছিল নাকি বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছে, এই তথ্য বের করা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সবাইকেই সতকর্তা অবলম্বন করতে হবে, নিজের ভাই, ছেলে বা বন্ধুর আচরণে পরিবতর্ন দেখা গেলে, কোনও অস্বাভাবিকতা দেখা গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো কতর্ব্য।
পনের ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির শেষ হয়েছে ঠিকই। কিন্তু আদতে শেষ হয়নি কিছুই। হলি আর্টিজানের হামলার মাত্র কয়েকদিন পর শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতের এক কিলোমিটারের মধ্যে আরেকটি হামলা কেড়ে নিয়েছে আরও দুইজন দায়িত্বরত পুলিশের প্রাণ। সবাই এক অজানা আতঙ্কের মধ্যে আছেন, পরবর্তী হামলা কোথায় কখন শুরু হয়! বাসের পাশের যাত্রীটি, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছের সহপাঠী, বাজারের ভিড়-ভাট্টায় গা ছুঁয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া মানুষটি- কাকে বিশ্বাস করবো? এদের যে কেউ হতে পারে জঙ্গি। কারণ, জঙ্গিগুলো আমাদের মতই দেখতে, অমানুষগুলোর চেহারা ঠিক মানুষের মতো।
লেখক: আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক

আরও পড়তে পারেন: এটা তো ওদের প্রেমের বয়স!

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ