জঙ্গি দমনে আইএস-এর অস্তিত্ব প্রমাণ কি জরুরি?

Send
তানভীর আহমেদ
প্রকাশিত : ১২:১৬, জুলাই ১১, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:২০, জুলাই ১১, ২০১৬

তানভীর আহমেদগুলশান ট্র্যাজেডির রেশ কাটতে না কাটতে আবারও ঈদের দিন শোলাকিয়ায় হামলা চালিয়েছে জঙ্গিরা। গুলশান হামলার ধরন পুরো জাতিকে স্তম্ভিত করেছে। এই হামলা আমাদের দুর্বল দিকগুলোকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে চিনিয়ে দিয়ে গেছে। টেলিভিশন চ্যানেলে লাইভ সংবাদ প্রচার যেমন সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে, তেমনি গোয়েন্দা ব্যর্থতাও ছিল দৃশ্যমান। রাজধানীর কূটনৈতিক পাড়া গুলশানের মতো জায়গা যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে গণভবনও যে নিরাপদ একথা আমরা বলতে পারিনা। সংদস ভবন, সচিবালয় কিংবা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, শপিং মল থেকে শুরু করে বেডরুম সবখানেই যেন জঙ্গিরা মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে অপেক্ষা করছে! তবে গুলশান হামলার পর সবচেয়ে নিরাপদে রয়েছেন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। বিশ্লেষকরা এতদিন মনে করতেন মাদ্রাসাগুলো জঙ্গি উৎপাদনের কারখানা। গুলশান হামলা যেন মাদ্রাসাগুলোকে জঙ্গি তকমা থেকে নিস্তার দিয়েছে। কারণ জঙ্গিরা ছিল প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ শিক্ষিত তরুণ যুবক। তবে ঢালাওভাবে আক্রমণের শিকার হয়েছেন জঙ্গিদের অভিভাবকরা, যা কাম্য নয়। সন্তানদের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়া থেকে ঠেকাতে অবশ্যই অভিভাবকরা নজরদারি বাড়াবেন। সন্তানদের সঙ্গে দূরত্ব কমাবেন। কিন্ত তরুণরা উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে। অনেক বাবা-মা এধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ত নন। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপের কথা হয়তো তারা জানেন, কিন্তু এ মাধ্যমগুলোর দক্ষ ব্যবহারকারী না হলে এই মাধ্যমে সন্তানদের ওপর নজরদারি করা প্রায় অসম্ভব!  তাই ইচ্ছে থাকলেও অনলাইনে ছেলেমেয়েরা কি করছে, গভীর রাতে বিছানায় স্মার্টফোন কিংবা আই প্যাড নিয়ে তার সন্তান কোন সাইটে ঢুকছে, সেটি মনিটর করা অনেক বাবা মায়ের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। কেননা ১৮ বছর হয়ে গেলে সন্তানের ব্যক্তিগত প্রাইভেসির কারণে বাবা মা সন্তানের কোনও কাজে জোর কিংবা অধিকার খাটাতে পারেন না, আবার প্রযুক্তির এই যুগে এধরনের স্মার্ট ডিভাইস থেকে সন্তানদের দূরেও রাখা যাবে না। তবে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক কিংবা শিক্ষার্থী জঙ্গি সংশ্লিষ্ট কিংবা মদদদাতা হতে পারে, এজন্য সকল প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কে ঢালাওভাবে জঙ্গি তৈরির কারখানা বলা যাবে না। পর্যাপ্ত পরিবেশ, ক্যাম্পাস, লাইব্রেরি, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয় না রেখে শুধুমাত্র বিবিএ, এমবিএ আর ইনফরমেশন টেকনোলজি বিষয় অথবা বাণিজ্যিক বিষয়ে শিক্ষার সুযোগ দিয়ে শপিং সেন্টার, এ্যাপার্টমেন্ট কিংবা ফ্ল্যাটে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার অনুমতি দিয়ে সেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেশপ্রেমিক মেধাবী শিক্ষার্থী বেরিয়ে আসবে, এমন ভাবনাও অবান্তর।
তবে আমাদের মনে হয় বক্তব্য প্রদানে আরেকটু সতর্ক হওয়া জরুরি। গুলশান হামলার মতো স্পর্শকাতর বিষয় বা যেকোনও একটি নাশকতা হলেই কোনও প্রকার তদন্ত ছাড়া, বিচারের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ছাড়া যে কোনও হামলার জন্য বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দোষারোপ করে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ঢালাও মন্তব্য এবং পরবর্তীতে সেই মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে যথাযথ তথ্যপ্রমাণ প্রকাশ না করা, কিংবা অপরাধীদের দিনের পর দিন বিচার প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার কারণে, সরকারের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর যেমন বিশ্বাসযোগ্যতা ও আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে তেমনি প্রকৃত অপরাধীরা বরাবরই থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। ইতোপূর্বে ব্লগার রাজিব হত্যার পর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততার খবর বের হলেও অপরাধীদের শাস্তির খবর সাধারণ মানুষ আর জানতে পারেনি। সেই অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা গেলে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়তো নতুন জঙ্গি তৈরি হতো না। এর আগে ব্লগার, লেখক, প্রকাশক, শিয়া ও আহমেদিয়া সম্প্রদায়ের অনুসারী, ইতালি ও জাপানি নাগরিক, যাজক-পুরোহিত হত্যাকাণ্ডকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে সরকারকে আসলে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। সব হত্যাকাণ্ডই বিরোধী রাজনৈতিক দল ঘটাচ্ছে, এমন বাণী দিলে সেই বাণীর স্বপক্ষে আইনগত পদক্ষেপটাও দেখতে চায় জনগণ।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত গুপ্তহত্যাগুলোর একটিরও চূড়ান্ত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন ও শাস্তি নিশ্চিত করতে পারেনি। বরং বেগুনবাড়ীতে তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিক ও মাদারীপুরে জনতার হাতে যে জঙ্গিরা ধরা পড়লো আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে সেই হত্যাকারী ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হলো! আরও হতাশার কথা হলো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জঙ্গিদের প্রকৃত পরিচয় খুঁজে বের করছে নেটিজেন জার্নালিস্টরা। অথচ এই দায়িত্বটি ছিলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর! রমনায় নারী লাঞ্ছনার ঘটনার সঙ্গে অপরাধীদের ছবিও শনাক্ত করেছিলো তরুণ নেটিজেন জার্নালিস্টরা । আমাদের পুলিশ বাহিনী ও গোয়েন্দাদের দক্ষতা এভাবে বার বার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। পুলিশ বাহিনীতে যে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, দক্ষ ও প্রযুক্তি জ্ঞান সম্পন্ন তরুণ লোকবল নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন, সেটি অনুধাবন করতে হলে আরও কতটি হামলার প্রয়োজন সেটি হয়তো দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাই ভালো বলতে পারবেন। আমাদের পুলিশ বাহিনীর সাহস রয়েছে। প্রয়োজন উন্নত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা ও বেতন কাঠামো পুনর্নির্ধারণ করা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শোলাকিয়ার জঙ্গিদের সঙ্গে বন্ধুকযুদ্ধে পাঞ্জাবি পড়া এক পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখে পুলিশ বাহিনী সম্পর্কে গর্বে বুক ভরে ওঠে। ভিডিওতে দেখলাম কোনও প্রকার লাইফ জ্যাকেট ও হেলমেট ছাড়া সেই পুলিশ কর্মকর্তা সম্মুখ যুদ্ধ করছেন জঙ্গিদের সঙ্গে! এই সাহসকে আরও পেশাদারি করতে হবে। এভাবে যুদ্ধ করলে তরুণ এই সাহসী পুলিশ কর্মকর্তার প্রাণহানির সম্ভাবনা ছিল।

দেশে বিদেশে আরেক শ্রেণির একটি গোষ্ঠী রয়েছে, যারা প্রমাণ করতে চাইছেন বাংলাদেশে আইএস রয়েছে। আর সরকার বাংলাদেশে আইএস-এর অস্তিত্ব অস্বীকার করছে। তাদের উদ্দেশ্য পরিস্কার, বাংলাদেশে আইএস আছে এটি প্রমাণ করতে পারলে ক্ষমতাসীনদের বেকায়দায় ফেলা যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের নাক গলানো সহজ হবে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে নাক গলাতে পারলে বাংলাদেশে পাকিস্তান, ইরাক, আফগানিস্তানের মতো একটা অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে তাদের পছন্দের রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় বসাতে পারবে। ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র আর রিতাকার্টস ও তার সাইট ইন্টেলিজেন্সের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হয়। তবে যে গোষ্ঠীটি এমন দিবা স্বপ্ন দেখছে তাদেরকে বলে রাখি, এই কলাম যখন লিখছি তখন ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার ইরাক আক্রমণের ভুল সিদ্ধান্তের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। এই সিদ্ধান্তের কারণে এখন ব্লেয়ারকে বিচারের মুখোমুখি হয়তো করা হবে, কিন্তু এই অন্যায় যুদ্ধে যে ১৭৯ জন ব্রিটিশ সৈন্য প্রাণ হারালো তাদেরকে কি ফিরিয়ে আনা যাবে? ইরাকের জনগণকে কি সাদ্দাম হোসেনকে ফিরিয়ে দিতে পারবেন  বুশ-ব্লেয়ার? তাই ‘সাধু সাবধান‘ বহুল প্রচলিত এই কথাটিই বলতে হয়। বাংলাদেশকে জঙ্গি মোকাবিলা করতে হলে দেশে জঙ্গি আছে সেই ঘোষণার প্রয়োজন নাই। জঙ্গির যেমন কোন ধর্ম নেই, জঙ্গিদের দেশও নেই। জঙ্গিবাদ হলো একটি ধারণা মাত্র। আইএস-এর জঙ্গিবাদে যারা জড়িয়ে পড়েছে, তারা সারা বিশ্বের জন্য হুমকি। বাংলাদেশে যদি আইএস থাকে তাহলে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, প্যারিস, ইস্তানবুল এমনকি বাগদাদেও জঙ্গি রয়েছে। ব্রিটেনের প্রায় হাজারখানেক হোম গ্রোন জঙ্গি সিরিয়ায় গিয়ে আইএস-এর হয়ে যুদ্ধ করছে। যুক্তরাষ্ট্র কি তার মিত্র ব্রিটেনে গিয়ে বলছে ‘তোমরা স্বীকার করো তোমার দেশে জঙ্গি আছে?‘ তাই বাংলাদেশকে কেন এই প্রশ্ন বারবার করা হচ্ছে তার পেছনের কারণটি খুঁজতে হবে। ব্রিটেনের জঙ্গিদের সঙ্গে বাংলাদেশের জঙ্গিদের পার্থক্য হলো, ব্রিটেন থেকে যে সকল জঙ্গি সিরিয়া গেছে যুদ্ধ করতে, তাদের সকলেই ব্রিটেনে জন্মগ্রহণ করেছে, ব্রিটেনে পড়াশোনা করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের জঙ্গিরা বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করলেও বিদেশে উচ্চ শিক্ষা নিয়েছে। জঙ্গিদের কেউ কেউ মালয়েশিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে। এখন এই তরুণরা উচ্চ শিক্ষায় বিদেশ গিয়ে জঙ্গিবাদে দীক্ষা পেয়েছে, নাকি বাংলাদেশে থেকে অনলাইনে জঙ্গিবাদে ঝুঁকে পড়েছে সেটি নিশ্চয়ই গবেষণার বিষয়। কিন্তু এধরনের জঙ্গিদের নিয়ে বিশ্বব্যাপী সকল দেশের যেমন আলাদা প্রস্তুতি রয়েছে, বাংলাদেশেরও সেধরনের প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলো একে অন্যের প্রতি দোষ না চাপিয়ে জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে জঙ্গি দমনে সর্তক হতে হবে। চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে ৫ শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হবার পর, এফবিআই’র কর্মকর্তা প্রেস ব্রিফিং-এ একটি কথাই বলেছেন, ‘ইউনিটি‘। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য ছাড়া জঙ্গিবাদ মোকাবিলা সম্ভব নয়।

জঙ্গি দমনে তাহলে সরকারের করণীয় কী?

লন্ডনের বেথনাল গ্রিন একাডেমি থেকে দুই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কিশোরী সিরিয়া যাবার পর আমি পূর্ব লন্ডনের রেইন্স ফাউন্ডেশন স্কুল, মালবারী গার্লস স্কুল ও টাওয়ার হ্যামলেটস কলেজের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। জানতে চেয়েছিলাম বেথনাল গ্রিণ একাডেমি থেকে কিশোরী মেয়েরা সিরিয়া গেছে আইএস-এ যোগ দিতে। তাদের স্কুলের শিক্ষার্থীদের আইএস-এ যোগ দেওয়া ঠেকাতে তারা কী ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে?  মালবারী স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা আমাকে জানালেন, তাদের স্কুলে বিশেষ মনিটরিং সেল রয়েছে যারা স্কুলে শিক্ষার্থীদের বিশেষ সাইটে ভিজিট করা মনিটরিং করে থাকে। বিশেষ এক ধরনের সফটওয়্যারের মাধ্যমে তারা স্কুল চলাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের নজরদারি করেন। এই বিষয়গুলো নজরদারি বাড়াতে তাদের বিশেষ টিম রয়েছে। বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ,  মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা জঙ্গিবাদ সংশ্লিষ্ট সাইট ভিজিট করছে কিনা, এবিষয়ে নজরদারি করার জন্য বাধ্যতামূলক সাইবার সিকিউরিটি টিম গঠন করতে পারে সরকার। শুরুতেই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই সিকিউরিটি টিম বসিয়ে দেওয়া হয়তো সম্ভব হবে না। তবে সরকার প্রাথমিকভাবে রাজধানীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাইবার নিরাপত্তা টিম বসানোর ব্যাপারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্দেশনা জারি করতে পারে। যারা তাদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অন লাইন ও মোবাইল ব্যবহারের গতিবিধি মনিটরিং করবে। যাদের সঙ্গে টেলিফোন রেগুলেটরি বডি বিটিআরসি ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ থাকবে।

কয়েক বছর আগে ব্রিটেনের গোয়েন্দারা তথ্য দিলো ব্রিটেনের বেশ কিছু মসজিদের ইমাম খুতবার সময় জঙ্গিবাদকে প্রশ্রয় দিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছে। তারপর থেকে ঝুঁকিপূর্ণ মসজিদগুলোকে চিহ্নিত করে সেখানে খুতবা রেকর্ডিং বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হয়েছে। মসজিদগুলোতেও মনিটরিং অফিসার কর্তৃক তদারকির ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাংলাদেশের যে সকল মসজিদ ও মাদ্রাসা ঝুঁকিপূর্ণ সেখানে জঙ্গিবাদের নেতিবাচক দিক সম্পর্কে কাউন্সেলিং যেমন প্রয়োজন রয়েছে, তেমনি জঙ্গিবাদের বীজ যেন বুনতে না পারে, সেজন্য মসজিদ-মাদ্রাসাগুলোতে নিয়মিতভাবে নজরদারি করার জন্য লোকবল নিয়োগ দিতে হবে। এই সকল কর্মকতাকে নিয়োগ দেবে সরকার, কিন্তু তাদের বেতন দেবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।

বিমানবন্দর ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশে ভ্রমণকারীদের ওপর নজরদারি বাড়ানো।

পূর্ব লন্ডনের বেথনাল গ্রিন একাডেমির দুই কিশোরীর একজন তার বোনের পাসপোর্ট ব্যবহার করে সিরিয়া পাড়ি জমিয়েছিলো। লন্ডনের হিথ্রোতে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে কেমন করে মেয়েটি তার বোনের পাসপোর্ট নিয়ে তুরস্কে উড়াল দিলো, সেটি ছিল আরেক বিস্ময়! সেই ঘটনার পর, নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও ট্র্র্যাভেল এজেন্সিগুলোর সঙ্গে ব্রিটিশ সরকার এক ধরনের চুক্তি করেছে ঝুঁকিপূর্ণ দেশে ভ্রমণকারীদের তথ্য প্রদানে তারা সহায়তা করবে।  সিরিয়া, তুরস্ক, আফগানিস্তান কিংবা পাকিস্তানের মতো ২৮ টি ঝুঁকিপূর্ণ দেশে ব্রিটিশ নাগরিকরা ভ্রমণ করার জন্য টিকিট কাটলেই সেই তথ্য গোয়েন্দাদের কাছে চলে যাবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রয়োজনে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে। বাংলাদেশও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে ভ্রমণকারীদের তথ্যসংগ্রহ করে নজরদারি বাড়াতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণরা ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে ভ্রমণ করলে তাদেরও নজরদারির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। লুটনের ব্রিটিশ বাংলাদেশি একটি পরিবারের ১১ সদস্যকে নিয়ে বাংলাদেশে হলিডেতে যাবার কথা বলে তুরস্ক হয়ে সিরিয়া পাড়ি জমিয়েছে। তাই যেসকল প্রবাসী বাংলাদেশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশে ভ্রমণের জন্য টিকিট কাটবেন তাদেরকেও নজরদারিতে রাখা প্রয়োজন। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে এই নজরদারিতে যেন প্রবাসীরা হয়রানির শিকার না হন। কোনও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে যেন এই পদ্ধতি অনুসরণ না করা হয়।

কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট শক্তিশালী করা

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিএমপি’র অধীনে যে নবগঠিত ইউনিট ‘কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম’ নামে যাত্রা শুরু করেছে তারা যে এখনও গুলশান হামলার মতো শক্তিশালী জঙ্গি হামলা দমনে প্রস্তুত নয় সেটি প্রমাণিত হয়েছে। গুলশানের ঘটনায় জঙ্গি দমন করতে গিয়ে পুলিশের দুই ওসি নিহত হবার মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয় অপারেশনে যাবার আগে জঙ্গিদের হামলার ধরন সম্পর্কে যথেষ্ঠ তথ্য সংগ্রহ ও প্রস্তুতি ছাড়া চলে গিয়েছিল আমাদের পুলিশ বাহিনী। টেলিভিশনের ভিডিওতে যতটুকু দেখলাম পুলিশ যে পিস্তল ব্যবহার করেছে সেটি আবার শেকল দিয়ে তাদের কোমরের সাথে বাঁধা, যেন অপারেশনের সময় হাত থেকে ফসকে না যায়! জঙ্গিরা যেখানে স্নাইপার এ কে ফোরটি সেভেন আর গ্রেনেড ব্যবহার করছে, সেখানে পুলিশের চায়নিজ রাইফেল আর পিস্তল দিয়ে অপারেশন পরিচালনায় নেমে পড়া রীতিমতো নির্বুদ্ধিতা ছাড়া কিছুই নয়। একজন সাদা পোশাকের পুলিশ বা গোয়েন্দা অফিসারকে দেখলাম রক্তাক্ত হাত নিয়ে পিকআপ ভ্যানে উঠছেন, তার পড়নে একটা টি শার্ট! বিস্ময়ের সঙ্গে দেখলাম বুলেট প্রুফ জ্যাকেট, হেলমেট ছাড়া সংবাদিকরাও ছুটে বেড়িয়েছেন সংবাদের নেশায়!  টিভি কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে এভাবে প্রস্তুতি ছাড়া গণমাধ্যম কর্মীদের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সংবাদ সংগ্রহে ঠেলে দেবেন না। যে কথা বলছিলাম, ইংল্যান্ডের মতো দেশও পুলিশ বাহিনী দিয়ে জঙ্গি দমনের দুঃসাহস দেখায়নি। ব্রিটেনে জঙ্গি দমনে রয়েছে বিশেষ বাহিনী এমআই ফাইভ। বিশ্বের অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত থাকে এই বাহিনী, অনেকটা ফায়ার সার্ভিসের মতো ২৪ ঘন্টা তারা তৈরি থাকে। সংবাদ পাওয়া মাত্রই তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। বাংলাদেশের জঙ্গি দমনে অবশ্যই অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত শক্তিশালী কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

যুক্তরাজ্যের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট যেকোনও নাশকতা, হামলা ঠেকাতে সব সময় প্রস্তুত থাকে তাই নয়,  জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া ও জঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষকদেরও খুঁজে বের করে। কিভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অতিদ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারে সে বিষয়েও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে সংস্থাটি। আর আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গি মোকাবিলায় এই বাহিনীর জন্য সরকার বরাদ্দ করেছে আরও ৪ শত মিলিয়ন পাউন্ড।

যে কোনও দুর্যোগে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নিয়মিত প্রেস ব্রিফিং:

র‌্যাবের মহাপরিচালক অপারেশনের সময় বললেন, টিভি চ্যানেলগুলো যেন লাইভ সংবাদ প্রচারে বিরত থাকে, সাংবাদিকরা যেন তাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে তারপর প্রচার করেন। ভালো কথা, অপারেশন চলাকালে, র‌্যাব কিংবা যৌথ বাহিনী বা আইএসপিআর এর দায়িত্বশীল কোনও মিডিয়া ইউনিট যদি গণমাধ্যম কর্মীদের ঘন্টায় ঘন্টায় আপডেট দিতো, তাহলে গণমাধ্যম কর্মীদের কাজে আরও পেশাদারিত্বের প্রমাণ পাওয়া যেত।  এখানেও শিক্ষণীয় বিষয়টি হলো এধরনের দুর্যোগে অবশ্যই তাৎক্ষণিকভাবে একটি দায়িত্বশীল টিমের মাধ্যমে একজন ব্যক্তির মাধ্যমেই সকল সংবাদ লিখিতভাবে প্রচারের উদ্যোগ নিতে হবে। ঘটনা ঘটলো রাত পৌনে নয়টায় আর আইএসপিআর যদি সংবাদ সম্মেলন করে একদিন পর, বিশ্ব মিডিয়া নিশ্চয়ই যৌথ বাহিনীর সংবাদ সম্মেলনে কি বলবে সেটার জন্য একদিন অপেক্ষা করে বসে থাকবে না। যেখানে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো প্রতিঘন্টায়, প্রতি মুহূর্তে লাইভ আপডেটের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এধরনের দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে যথা সময়ে মিডিয়া সেল গঠন করে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা তথ্য সরবরাহ নিশ্চিত করলেই গণমাধ্যম আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক। বাংলা ট্রিবিউনের বিশেষ প্রতিনিধি ও একাত্তর টিভির লন্ডন প্রতিনিধি।

আরও পড়তে পারেন: গুলশান জঙ্গি হামলা: অনেক প্রশ্ন

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ