নতুন করে পুরাতন কথা

Send
সালেক উদ্দিন
প্রকাশিত : ১২:৩৮, আগস্ট ২৫, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৫২, আগস্ট ২৫, ২০১৬

Salek Uddinওষুধে ভেজাল, ঢাকার আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম- এ দুটি বিষয় নিয়ে এর আগেও বাংলা ট্রিবিউনে লিখেছিলাম। ২২ এপ্রিল ২০১৬ তারিখের ‘ওষুধে ভেজাল-এ আর নতুন কী’ শিরোনামের একটি লেখায় উল্লেখ করেছিলাম যে, ‘জীবনরক্ষাকারী ওষুধে ভেজাল দেওয়া একটি অমার্জনীয় অপরাধ। এই অপরাধ এদেশে অন্যান্য অপরাধের মতোই তাল মিলিয়ে চলছে। অ্যান্টিবায়োটিক ও ক্যানসারের ওষুধের মতো ওষুধ উৎপাদনেও ভেজাল চলছে দেদারসে ও নির্ভীকচিত্তে। ফলে ভেজাল খেয়ে খেয়ে যে ভয়াবহ রোগ শরীরে বাসা বাঁধছে তা আর ভেজাল ওষুধে দেশের ডাক্তাররা নিরাময় করতে পারছেন না। মুষ্টিমেয় যে কয়জনের পক্ষে সম্ভব হয় তারা বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন, আর যাদের পক্ষে তা সম্ভব নয় তারা ভাগ্যের কাছে আত্মসমর্পণ করে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন।
এই ভয়াবহ অবস্থাটি চলতে দেওয়া যায় না। এই কথাটির গুরুত্ব অনুভব করে ২০১৪ সালে নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদনকারীদের চিহ্নিত করতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ তদন্ত কমিটি গঠন করে। এই কমিটি গত দেড় বছরে ৮৪টি ওষুধ কারখানা পরিদর্শন করে যে প্রতিবেদন জমা দেয় তার প্রেক্ষিতে সংসদীয় কমিটি নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করণের দায়ে ২০টি কোম্পানির উৎপাদন লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া ১৪টি কোম্পানির নন-পেনিসিলিন, পেনিসিলিন ও সেফালস্পেরিন গ্রুপের ওষুধ উৎপাদনের অনুমতি এবং ২২টি কোম্পানির পেনিসিলিন ও সেফালস্পেরিন গ্রুপের ওষুধ উৎপাদনের অনুমতি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সেদিনের লেখায় উপরোক্ত সিদ্ধান্তকে আমরা সাধুবাদ জানিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হবে। কিন্তু না এরপরও ২৮ জুন একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হলো বর্ণিত ৩৪টি কোম্পানির ওষুধ বাজারে বিক্রি হওয়ার খবর। সেই খবরের ওপর ভিত্তি করে ৩১ জুলাই একটি সম্পূরক আবেদন নিয়ে আবারও হাইকোর্টে আসে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ। সেখানে ওই ৩৪ টি কোম্পানির ওষুধ সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধের পাশাপাশি বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশনা চাওয়া হয়। তদানুযায়ী মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদনে ব্যর্থ ২০ কোম্পানির সব ওষুধ এবং ১৪টি কোম্পানির অ্যান্টিবায়োটিক সরবরাহ, বিক্রি বন্ধ ও বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
হাইকোর্টের এই নির্দেশের পরও প্রশ্ন থেকে যায় আগের সিদ্ধান্তের পর এই ৩৪টি কোম্পানি তাদের ওষুধ বাজারে বিক্রির সাহস পেয়েছিল কোত্থেকে? আদেশ অমান্যের বিচার কোথায়? এবারের সিদ্ধান্তও কি কার্যকারী হবে?
২২ এপ্রিলের লেখায় প্রশ্ন রেখেছিলাম এই কোম্পানিগুলো শুধু মুনাফা লাভের লক্ষ্যে জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে জীবন রক্ষার নামে জীবন হরণের মতো ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতের মাধ্যমে লাখো মানুষের প্রাণ হরণের মতো যে অপরাধ করল, তার শাস্তি কি শুধুই ওষুধ উৎপাদনের অনুমতি বাতিল? নাকি এর চেয়ে আরও বহু বহু গুণ বেশি? একটি খুনের জন্য যদি খুনির ফাঁসি হতে পারে তাহলে এই অপরাধের জন্যে শুধু কোম্পানির উৎপাদন লাইসেন্স বাতিলই যথেষ্ট নয়’।
সৃষ্টির আদিকাল থেকেই সমাজে অপরাধ চক্র ছিল এখনও আছে। একটি সমাজে যখন নৈতিকতা ও আইনশৃঙ্খলা কঠিন থাকে তখন এই চক্র ঘাপটি মেরে থাকে। আর যখন মানুষের নৈতিক অবক্ষয় হ্য় আইনশৃঙ্খলা নড়বড়ে হয় তখন অপরাধ চক্রটি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সবদিক বিচার করলে বলতে হয় এই চক্রটির স্বর্ণযুগ চলছে এখন। তাইতো শুধু অর্থ উপার্জনের জন্যে এদেশের শিক্ষিত শিল্পপতি ব্যবসায়ীরা ওষুধে ভেজাল দিয়ে অ্যান্টিবায়োটিকে দুই-নম্বরি করে মানুষ খুন করেও খুনের দায়ে দণ্ডিত হতে হচ্ছে না। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরেও সর্বোচ্চ শাস্তি হয় কোম্পানির উৎপাদন লাইসেন্স বাতিল! ভেজাল ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করণের সঙ্গে জড়িত মানুষগুলো যে সচেতন খুনি এতে নিশ্চয়ই কেউ দ্বিমত করেন না। যদি এইসব খুনিদের একজনের এই অপরাধের দ্বায়ে ফাঁসি হত তবে এদেশের অসৎশিল্পপতি ব্যবসায়ীরা ওষুধে ভেজাল দিয়ে অ্যান্টিবায়োটিকে দুই-নম্বরি করে আর কোনওদিন অর্থ কামানোর সাহস পেত না।

সমাজকে অপরাধ মুক্ত করতে চাইলে এখন প্রয়োজন এধরনের পদক্ষেপের। সমাজবিজ্ঞানী ও সমাজ পরিচালক নিয়ন্ত্রকদের সম্ভবত এখন অনুধাবনের সময় এসেছে। ছাড় দিতে দিতে এদেশের মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। তারা আর ছাড় দিতে রাজি নয়।        

২৯ এপ্রিল ২০১৬ তারিখে ঢাকার আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্পর্কে ‘আবাসিক যখন বাণিজ্যিক’ শিরোনামের একটি লেখায় উল্লেখ করেছিলাম, ‘ঢাকা শহরে আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে এবং আবাসিক এলাকাকে বসবাসের অনুপযোগী করে তুলেছে। বিশেষ করে ঢাকার আভিজাত এলাকা ধানমণ্ডি, গুলশান, বনানী বিশেষত্ব হারিয়েছে। ধানমণ্ডি আবাসিক এলাকা আর আবাসিক নেই। হয়ে গেছে স্কুলপাড়া। গুলশান যেন আরেক মতিঝিল অর্থাৎ অফিসপাড়া। আর বনানী হয়ে গেছে রেস্টুরেন্ট পাড়া। রাতের বনানীকে অনেকটা নাইটক্লাবে ভরপুর নেপালের কাঠমান্ডুর সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। বলা যেতে পারে, ধানমণ্ডি-গুলশান-বনানীতে আবাসিক এলাকার রমণীয় নির্জনতা হারিয়ে গেছে কালের অতল গহ্বরে। পরিণত হয়েছে কোলাহলপূর্ণ বাণিজ্যিক রুক্ষতায়। এছাড়া পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশই গিলে খেয়েছে এর আবাসিক এলাকাগুলোকে। ধানমণ্ডি সংলগ্ন লালমাটিয়া-মোহাম্মদপুরও এ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে নেই।’

আবাসিক এলাকার রমণীয়তা রক্ষাকল্পে সেখান থেকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সমূহ উঠিয়ে দেওয়ার মন্ত্রী পরিষদের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েই লেখাটি লিখেছিলাম। সেই লেখায় মন্ত্রীপরিষদের এই সিদ্ধান্ত প্রকৃতপক্ষে বাস্তবায়িত হবে কিনা সে ব্যাপারে আশংকাও প্রকাশ করেছিলাম। আশংকার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলাম, ‘এর আগে ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত অস্বাস্থ্যকর ট্যানারি ঢাকার অদূরে সাভারে স্থানান্তরের বিষয়টিও ছিল সময়ের দাবি এবং এই দাবির পক্ষে সরকারি সিদ্ধান্ত সর্ব মহলে প্রশংসিত হয়েছিল। বার বার নির্দেশের পরও মালিকরা ট্যানারি সাভারে স্থানান্তর না করায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মহোদয় ট্যানারি স্থানান্তরের জন্য নির্ধারিত সময় বেঁধে আল্টিমেটাম দিয়ে দিয়েছিলেন। বেঁধে দেওয়া সময় পার হওয়ার পরও ট্যানারির মালিকরা ট্যানারি স্থানান্তর করলেন না। মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ও চুপ মেরে গেলেন। এখন আর এ ব্যাপারে তিনি কিছু বলেন না। আশা করছি, আবাসিক এলাকা থেকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সরানোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয়টি সে রকম হবে না।’ 

যা হোক ভেজাল ওষুধ এবং আবাসিককে বাণিজ্যিকমুক্ত বিষয় দুটি এখনও স্তিমিত হয়নি। বলা যেতে পারে দুটো নিয়েই কাজ চলছে। অতিসম্প্রতি ধানমণ্ডি আবাসিক এলাকা থেকে সকল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান উঠিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালত। এর ফলে ধানমণ্ডি থেকে ৫১টি স্কুল ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ এবং ২৪টি হাসপাতাল ও বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবামূলক প্রতিষ্ঠানসহ মোট ২৫৫টি বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে উঠে যেতে হবে। এনিয়ে পড়ে গেছে হৈ চৈ। ক্ষতিগ্রস্তরা পত্র-পত্রিকায় বিবৃতি দিচ্ছেন কলামিস্টরা পক্ষে-বিপক্ষে কলাম লিখছেন। কেউ লিখছেন, ধানমণ্ডির আবাসিক সতীত্ব রক্ষার জন্যে অর্ধ লক্ষ পরিবারকে বলিদান দিতে হচ্ছে। লিখছেন, বিকল্প কর্মসংস্থানের কোনও সুযোগ তৈরি না করে এবং বর্তমান সময়ের বাস্তবতা না হিসাব করে এভাবে অর্ধ লক্ষেরও বেশি পরিবারেকে পথে বসিয়ে দেওয়া একটি বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়। প্রশ্ন করছেন, এসব এলাকার হাসপাতাল ক্লিনিক বন্ধ হয়ে গেলে সব রোগীকে ঠাঁই দেওয়ার মতো সক্ষমতা কি সরকারি হাসপাতালগুলোর আছে? কেউ বলছেন, বনানীতে মাত্র দুটো কী ৩টি 'বৈধ স্পেস' সরকারি বা আধা সরকারি স্কুল আছে, তাদের পক্ষ বাকি ৩০/৪০টি স্কুলের শিক্ষার্থীদের স্থান করে দেওয়া সম্ভব নয়। বলছেন, ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলগুলো তুলে দিলে সেইসব বাচ্চাদের কোথায় ভর্তি করা হবে সে ব্যাপারে কোনও দিকনির্দেশনা নেই। বলছেন, ধানমণ্ডি থেকে স্কুলগুলো সরিয়ে দিলে ৫০ হাজার শিক্ষার্থীর কষ্ট বাড়বে। স্কুল মালিকরা বলছেন, হাজারীবাগের ট্যানারি মালিকদের কারখানা স্থানান্তরের জন্য সরকার লম্বা সময় দিয়েছে। সাভারে জমি দিয়েছে। তেমনি তাদের জন্যও ব্যাংকঋণসহ সেইরকম সরকারি ব্যবস্থা করতে হবে।

স্কুল হাসপাতাল ক্লিনিক সম্পর্কে এইসব কথার প্রেক্ষিতে যে কথা বলতে হয় তা হলো, আবাসিক এলাকায় এসবের প্রয়োজন রয়েছে ঠিকই তবে ব্যাঙের ছাতার মতো যত্রতত্র নয়। উন্নত বিশ্বে প্রত্যেক এলাকার প্রয়োজনে এলাকা ভিত্তিক কিছু স্কুল থাকে। এক এলাকার স্কুলে শুধু সেই এলাকার বসবাসকারীদের ছেলেমেয়েরাই পড়তে পারে। বিশেষ কারণ ছাড়া তারা ছেলেমেয়েদের অন্য এলাকার স্কুলে ভর্তি করতে পারেন না। চিকিৎসাসহ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একই নিয়ম। ফলে সেখানে যানজটের মতো দুর্বিষহ অবস্থার সৃষ্টি হয় না। ধানমণ্ডি গুলশান ও বনানী এলাকায়ই ঢাকার সবচেয়ে নামিদামি বেসরকারি স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল রয়েছে। শুধুমাত্র ব্যবসায়ীক কারণই এসব এলাকায় এসব প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। সবাই ভীড় করছে এসব এলাকায়। ধানমণ্ডি গুলশান ও বনানীর আবাসিক এলাকা তার রমণীয়তা হারিয়েছে। দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে জনজীবন।

এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য আবাসিক এলাকা থেকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সরানোর সরকারি সিদ্ধান্ত যথার্থ বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তবে আবাসিক এলাকাগুলো একেবারে বেসরকারি স্কুল-কলেজ -হাসপাতাল শূন্য করে ফেললেও চলবে না। এসবেরও প্রয়োজন আছে কিন্তু পরিকল্পনা বিহীন ব্যাঙের ছাতার মতো নয়। ব্যাঙের ছাতার মতো প্রতিষ্ঠান অবশ্যই উচ্ছেদ করতে হবে এবং প্রত্যেক আবাসিক এলাকাই কিছু উন্নতমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করতে হবে। এটাও ঠিক যে, এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে। এটাও লক্ষ্য রাখার প্রয়োজন রয়েছে যে, আবাসিক এলাকা থেকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদ অথবা স্থানান্তর এমন একটি প্রক্রিয়ায় হতে হবে তা যেন মানুষের ওপর বিরূপ সামাজিক সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব না ফেলে।    

লেখক: কথাসাহিত্যিক               

আরও খবর: রমেকে ডায়ালাইসিস যন্ত্র বিকল, এসির প্রয়োজন মেটানো হয় ফ্যানে!

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ