কর্মজীবী মা নাকি ‘কর্মজীবী ও মা’?

Send
ফারজানা হুসাইন
প্রকাশিত : ২০:০২, আগস্ট ২৮, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৪৪, আগস্ট ২৮, ২০১৬

ফারজানা হুসাইন১. সাহানা বাজপেয়ী আমার খুব প্রিয় একজন সঙ্গীতশিল্পী। কয়েকদিন আগে তার ফেসবুকে পোস্ট করা একটা ছবি নজর কাড়লো বলেই আজ লিখতে বসলাম। সাহানা প্রফেশনাল শিল্পী, অনেক স্টেজ প্রোগ্রাম করেন। সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে তিনি গেয়েছেন। এর মাঝেই তার তিন-চার বছরের মেয়েটি তাকে জড়িয়ে ধরে আছে—এমন একটি ছবি সবার সঙ্গে তিনি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে শেয়ার করেছেন। এ ছবিটি একজন কর্মজীবী মায়ের ছবি। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে আরেকটি ছবি সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে ভারতের এক নারী ব্যাংক কর্মকর্তা অফিসের চেয়ার-টেবিলে বসে কাজ করে চলেছেন, পেছনে মেঝেতে দুধের বোতলমুখে শুয়ে আছে তার ছোট্ট জ্বরে আক্রান্ত শিশু সন্তানটি। এটিও একজন কমর্জীবী মায়েরই ছবি।
আমার মা শিক্ষকতা করেছেন আজীবন, বাড়িতে কখনও আমার নানি, কখনও খালা কিংবা কেউ না থাকলে বাড়ির কাজের মেয়েটি আমাদের দেখে রেখেছেন। কিন্তু এমন অনেক দিন আমি মনে করতে পারি, যখন মায়ের স্কুলরুমের অফিসের ওই টেবিলটির পেছনে মেঝেতে মাদুর পেতে পরীক্ষার পড়া পড়েছি, কখনও ক্লান্ত হয়ে চেয়ারের ওপর থেকে তোয়ালেটা নিয়ে ভাঁজ করে বালিশ বানিয়ে মেঝেতেই ঘুমিয়ে গেছি। স্কুলের টিফিনের ঘণ্টা বাজলে মা এসে মাদুরে বসে টিফিন ক্যারিয়ার খুলে বাড়ি থেকে আনা ভাত মুখে তুলে খাইয়েছেন। এই ছবি নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়তো যে কোনও চাকরিজীবী মায়ের সন্তানদের কাছে।
এই ছবিতে আমরা মাকে দেখি, মায়ের স্নেহ দেখি, সন্তান আর কাজের প্রতি মায়েদের সমান আর সমান্তরালে চলা একাগ্রতাও দেখি,  শুধু দেখি না বাবাকে। সন্তান পালনে বাবাদের ভূমিকা অর্থ উপার্জন আর কখনও কখনও পড়া বুঝিয়ে দেওয়ার মধ্যেই সীমিত। সন্তানের অসুস্থতায় বাবারা বিচলিত হন অবশ্যই কিন্তু তাদের কাজ আর বাড়ির মাঝে কোনও অহেতুক ছোটাছুটি করতে হয় না। আমার বাবাসহ আশেপাশের কোনও বাবাকেই আমি কখনও সন্তানের জ্বর হয়েছে বলে কাজে ছুটি নিতে দেখিনি, সন্তানকে নিজের কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়া তো বেশ অকল্পনীয় বিষয়। তারা ঘরে-বাইরে কর্মজীবী বাবা নন বরং তাদের পরিচয় তারা বাইরে কর্মজীবী এবং ঘরে বাবা।
পুরুষতান্ত্রিক আমাদের এই সমাজ ব্যবস্থায় সন্তান জন্মদান আর লালন-পালনে শুধু মায়ের দরকার পড়ে। সনাতনী সমাজে প্রসবকালীন যন্ত্রণায় স্ত্রী তার স্বামীকে পায়নি কাছে, সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানের কান্নার শব্দ শোনার অপেক্ষায় দরজার বাইরে গম্ভীর মুখে পায়চারী করেই পুরুষ তার দায়িত্ব মিটিয়েছে। পাশ্চাত্যে সন্তান প্রসবের সময়ে হাসপাতালে মায়ের সঙ্গে বাবার উপস্থিতি আবশ্যক হওয়াতে আমার পরিচিত অনেক বাঙালি ছেলেকেও প্রবাসে সন্তান জন্মের গল্প বলার সময় শিউরে উঠতে দেখেছি, সন্তান লালন-পালনে তাদের বেশিমাত্রায় সহযোগিতা করতে দেখেছি।

সরকারি আইন অনুসারে সরকারি চাকরিজীবী মায়েরা মাতৃত্বকালীন ছুটি উপভোগ করেন ছয় মাস (এখন অবশ্য অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও মায়েদের এই অধিকার দেওয়া হচ্ছে)। অন্যদিকে দেশের বর্তমান শ্রম আইন অনুযায়ী একজন কর্মজীবী নতুন মা সর্বোচ্চ ১৬ সপ্তাহের মাতৃত্বকালীন ছুটির দাবিদার। বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সরকারের কোনও নির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকার কারণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মায়েদের মাতৃত্বকালীন ছুটি মালিকপক্ষের মজুরি অনুসারে চারমাস থেকে ছয়মাসের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। সুতরাং আমাদের আইন প্রণয়নকারীদের অদূরদর্শিতার কারণে মায়েরাও ভাগ হয়ে যাচ্ছেন সরকারি আর বেসরকারি এই দুই ভাগে। সমাজ পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে শহুরে নাগরিক জীবনে যখন নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি বা একক পরিবারের সংখ্যা বেড়ে চলেছে, তখন পিতৃত্বকালীন ছুটির অভাবে সন্তান জন্মের পর নতুন মাকে একলা হিমশিম খেতে হচ্ছে সন্তানের দেখাশোনার জন্য। ইউরোপের দেশগুলোতে মাতৃত্বকালীন ও পিতৃত্বকালীন ছুটির আইনকানুন বেশ পোক্ত। যুক্তরাজ্যের নতুন মায়েরা পুরো বেতনে ২৬ সপ্তাহ এবং বিনা বেতনে আরও ২৬ সপ্তাহ, মোট ৫২ সপ্তাহ বা এক বছর মাতৃত্বকালীন ছুটি উপভোগ করেন। নতুন বাবাদের জন্য পিতৃত্বকালীন ছুটি পুরও বেতনে ২ সপ্তাহ এবং বেতন ছাড়া আরও দুই সপ্তাহ, মোট চার সপ্তাহ। বিভিন্ন জরিপের ফলাফলে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোকে মানব উন্নয়নের সূচকে প্রগতিপন্থী ও সুখী সমাজের তকমা দেওয়া হয় তাদের পারিবারিক আর পরিবেশগত আইন কানুনের জন্য। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশ সুইডেনে মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটি মোট ১৬ মাস, মা-বাবা এই ছুটি ভাগাভাগি করে নিতে পারেন। যার মধ্যে ন্যূনতম তিনমাসের বাধ্যতামূলক ছুটি বাবাকে নিতে হবে সন্তানের বয়স আট হওয়ার আগেই। সুতরাং শুধু সন্তান জন্মের পরই বাবার ছুটি নয় বরং সন্তানের বেড়ে ওঠার সময়েও বাবাকে ছুটি দেওয়ার বিধান করছে উন্নতবিশ্বের দেশগুলো। এদিকে আমাদের দেশে পিতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ে কথা বললেই লোকে হাসাহাসি শুরু করে। অফিকগুলোতে তো বড় কর্তারা তেড়ে আসেন। আজও লোকের প্রশ্ন করেন- আঁতুড় ঘরে বাবার কাজ কী আবার? অথচ হয়তো তিনিও বাবা হয়েছেন কিংবা কখনও বাবা হবেন।

সম্প্রতি পত্রিকার পাতায় পিতৃত্বকালীন ছুটি বিষয়ে ভারতের নারী ও শিশু কল্যাণমন্ত্রী মেনেকা গান্ধীর করা মন্তব্য আর সেই মন্তব্যের তীব্র বিরুদ্ধ অভিমত পড়ছিলাম। মেনেকা গান্ধী বলেছেন, পিতৃত্বকালীন ছুটির চেয়ে মাতৃত্বকালীন ছুটির নিশ্চয়তার বিধান করা বেশি জরুরি। কারণ ভারতীয় পিতারা এই পিতৃত্বকালীন ছুটিকে অন্য সাধারণ ছুটির মতোই আয়েশের জন্য ব্যবহার করবে। এই মন্তব্যের প্রতিবাদ করে বিবৃতি দিয়েছেন ভারতের নারীবাদী, মানবতাবাদী তথা প্রগতিপন্থী ব্যক্তিবর্গ। তাদের মতামত, মেনেকার এমন মন্তব্য লিঙ্গ-বৈষম্যহীন ভারতের অন্তরায়, এ মন্তব্য কেবল পিতাদের প্রতি বিরুদ্ধ মতবাদ প্রকাশ নয় বরং এই চিন্তাধারা সনাতনী ভারতীয় সমাজের গৎবাঁধা রীতিকে প্রশ্রয় দেয়।
২. এ যুগের মেয়ে যে এই অমোঘ বাণীকে সত্য করতেই আজ হরহামেশাই বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোচ্ছে, দেশে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা দিন দিন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। প্রতিরক্ষা, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরকারি-বেসরকারি চাকরি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষকতাসহ বিভিন্ন পেশা ও উত্পাদনশীল খাতে নারীর সরব অংশগ্রহণ ইতিবাচক।
তবে হতাশার কথা আমাদের কর্মপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এখনও নারীর মেধা আর পরিশ্রমের মূল্যায়ন করা হয় কখনও কখনও। উপরন্তু সন্তানের অসুস্থতার কারণে কাজে ছুটি চাইলে কর্মজীবী মায়েদের অহরহ কটূ কথা আর টিপ্পনি শুনতে হয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আর পুরুষ সহকর্মীদের কাছে। অথচ এই মায়েরা একা একাই কিন্তু সন্তান জন্ম দিয়ে ফেলেননি, ওই অসুস্থ সন্তানদের বাবারাও হয়তো কর্মজীবী। অফিসের যেসব পুরুষ সহকর্মী কর্মজীবী মায়েদের প্রতি বাহানা আর অজুহাতের ব্যঙ্গাত্মক উক্তি ছুড়ে দেন, তাদের কেউই কিন্তু চিরকুমার বা সন্তানহীন নন। তাহলে সন্তানের অসুস্থতায় একা মাকে কেন শুধু অফিসে নতমুখে ছুটির দরখাস্ত দিতে হয়, নারীকেই কেন কর্মজীবী মায়ের উপাধি দেওয়া হয়, আমাদের সমাজে কোনও পুরুষ কেন কর্মজীবী বাবার তকমা পান না কখনও?

পিতৃত্ব পুরুষের পুরুষত্ব বাড়ায়, বংশের নাম রক্ষার পথ দেখায়। অথচ পিতৃত্ব পুরুষের কর্মজীবনে সামান্যই প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে, চব্বিশে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে সমাজের কান কথায় অতিষ্ঠ হয়ে পঁচিশে বিয়ের পিঁড়িতে বসে যে মেয়ে; নতুন সংসার আর চাকরি নিয়ে হিমশিম খেতে খেতেই সে হয়তো অনাগত সন্তানের আগমনী বার্তা শোনে বছর না ঘুরতেই। সংসার-চাকরি-সন্তান এই তিনের বোঝা নারীকেই একা বইতে হয়। বাড়ির বউকে দশটা-পাঁচটা অফিস করার অধিকারটুকু দিয়েই সমাজের বাহবা কুড়ায় পুরুষ। তবে পান থেকে চুন খসলেই সব দোষ গিয়ে পড়ে নারীর ওপর, সন্তানের অসুখে, পরীক্ষার খারাপ ফলাফলে বাবার দোষ নেই কোনও, সব দোষ কর্মজীবী নারীর।
এদিকে কর্মজীবী মায়ের কাজের পরিবেশ কিন্তু সবসময় তার অনুকূলে থাকে না। মাতৃত্ব বেশ ধারালো নখর বসায় তার ক্যারিয়ারে। দেশে আমার এক নারী সহকর্মী মাতৃত্বকালীন ছুটি কাটিয়ে এসে চাকরির প্রমোশনের ইন্টারভিউতে গেলে ওই ইন্টারভিউ বোডের্র সব নামজাদা ব্যক্তিরা তাকে ইনিয়ে-বিনিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল মাতৃত্বকালীন ছুটির ওই ছয়মাস তার প্রমোশনের জন্য প্রয়োজনীয় তিন বছরের কাজের সময়সীমাকে ব্যাহত করেছে। সোজা কথায়, বাচ্চা জন্ম দিতে আমার সহকর্মীর কাজ থেকে ছয়মাসের ছুটিতে ছিল। তাই আগে এই ছয়মাসের ঘাটতি পুষিয়ে দিয়ে তবেই প্রমোশনের ইন্টারভিউ দিতে আসতে হবে। অথচ একই সঙ্গে ইন্টারভিউতে যাওয়া কর্মজীবী সদ্য বাবারা তরতর করে মই বেয়ে ওপরের ধাপে এগিয়ে যায়। এই মাতৃত্বকালীন ছুটি যেন কর্মজীবী নারীর অধিকার নয়, কুড়িয়ে পাওয়া সহানুভূতি মাত্র।
কিন্তু আমাদের সংবিধান অনুযায়ী চাকরিতে প্রবেশে নারীর সম-অধিকারের বিধান রয়েছে। ২৮(১) অনুচ্ছেদে রয়েছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোনও নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না।’ ২৮(২) অনুচ্ছেদে আছে, ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন।’
২৮(৪)-এ উল্লেখ আছে, ‘নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যেকোনও অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোনও কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।’ ২৯(১)-এ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে।’
৩. কর্মজীবী এই নারীরা সন্তান প্রসবের পর নবজাতকের লালন-পালনে পাচ্ছেন না প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা। যেসব নারীর সন্তান দেখাশোনার জন্য পরিবারে কেউ নেই তাদের অনেকেই সন্তানের জন্য কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। আর যারা কষ্ট করে চাকরি করছেন ও সন্তান পালন করছেন তারা দুটি একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন।
সরকারের রাজস্ব বাজেটের আওতায় ঢাকা শহরে সাতটি এবং ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহর রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, খুলনাসহ মোট ১২টি ডে-কেয়ার সেন্টার নিম্নবিত্ত শ্রেণির কর্মজীবী-শ্রমজীবী মহিলাদের শিশুদের জন্য পরিচালিত হচ্ছে। এর বাইরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির কর্মজীবী নারীদের জন্য ঢাকায় ৬টি ডে-কেয়ার সেন্টার মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু এসব ডে-কেয়ার সর্বস্তরের কর্মজীবী নারীদের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হচ্ছে না। এ কারণে শিশুসন্তান ও কর্মস্থল নিয়ে অনেককেই উভয় সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
সন্তান জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শিশুর সুষ্ঠুভাবে বেড়ে ওঠার জন্য শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর কথা। কিন্তু কর্মজীবী মায়েরা এ সুযোগ পাচ্ছেন না। ‘কর্মজীবী নারী’র পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ৫১ দশমিক ৩৫ ভাগ অফিস বা কারখানায় ডে-কেয়ার সেন্টারের অস্তিত্ব নেই। অথচ বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী, যে প্রতিষ্ঠানে ৪০-এর অধিক নারী শ্রমিক আছেন সেখানে ৬ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু সন্তানের জন্য শিশুকক্ষ বা শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের জায়গা থাকতে হবে। কিন্তু এ আইন বাস্তবে মানা হচ্ছে না, যার ফলে সন্তান পালনের জন্য বহু নারী শ্রমিককে কাজ ছেড়ে দিতে হচ্ছে।

এদিকে বিভিন্ন পোশাক কারখানাসহ অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোয় শিশুদের জন্য ‘ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার’ না থাকায় কর্মজীবী মায়েদের বেশ সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এমনকি বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন, সরকারি-বেসরকারি অফিসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার চালুর নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের এখন পর্যন্ত এমন উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি।

পর্যাপ্ত ডে-কেয়ার সেন্টারের অভাব ও কর্মস্থলে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার না থাকায় তারা একদিকে সন্তানের যথাযথ যত্ন নিতে পারছেন না, অন্যদিকে কাজেও মনোযোগ কমছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র।
৪. আমাদের পাড়ার কয়েকটি বাসায় এক দরিদ্র মহিলা কাজ করতেন। এক বাড়িতে কাজ শেষে আরেকটি বাড়ি—এভাবে দিনের শুরু থেকে রাত গড়ানো পর্যন্ত তাকে পাড়ার গলিতে কখনও পানি নিতে আবার কখনও পাড়ার শেষ মাথায় অবস্থিত ডাস্টবিনে ময়লা ফেলতে দেখা যেত। কাজের প্রয়োজনে পাড়ার ধনী বাড়িগুলোতে ওই মহিলার যাতায়াত থাকলেও তার বছর দেড়েকের বাচ্চাটাকে বাড়ির চৌহদ্দিতে জায়গা দেয়নি কোনও বাড়ির মালিক। মাঝে মধ্যেই ওই ছোট্ট বাচ্চাটাকে কোনও বাড়ির গেটের ঠিক বাইরে ধুলোবালির মধ্যে মেঝেতে ছড়ানো মুড়ি খুঁটে খুঁটে খেতে দেখা যেত। সেই দাওয়াতে যোগ দিতো কেবল কয়েকটি কর্কশ কালো কাক। সাহানা বাজপেয়ী কিংবা ভারতের ওই ব্যংক কর্মকর্তা মায়ের মতো আমাদের পাড়ার ওই কাজের মহিলা ও একজন কর্মজীবী মা। সমাজের মুখে চপেটাঘাত করা কাক-মানব সন্তানের একসঙ্গে খাবার খাওয়ার এই নির্বাক ছবিটিও একজন কর্মজীবী মা ও তার সন্তানের। কর্মজীবী মায়ের অধিকারের প্রশ্নে সোচ্চার আমরা যেন এই শিশুটির মাকে ভুলে না যাই।




লেখক: আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও মানবাধিকারকর্মী।

আরও খবর: এ কান্নার জবাব কী?

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ