behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

সামনে পুলিশ নাকি প্রশ্নবোধক চিহ্ন

মোস্তফা হোসেইন১২:১০, ডিসেম্বর ০২, ২০১৬

মোস্তফা হোসেইনচাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার জনগণকে বলেছেন ডাকাত ধরে পিষে ফেলতে, মাদকের গাড়ি পেলে সেটা জ্বালিয়ে দিতে। শুধু তাই নয় ডাকাত হত্যাকারীদের গ্যারান্টারও হয়েছেন তিনি এবং প্রকাশ্য জনসভাতেই। বিষয়টি উচ্চ আদালতের এখতিয়ারে চলে গেছে। সুতরাং এ নিয়ে আলোচনা নাইবা করা হলো।
এদিকে ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীতে কলেজ জাতীয়করণের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষকদের লাঠিপেটা ও রাবার বুলেট নিক্ষেপের ঘটনায় দুইজন নিহত হওয়ার পর স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা টিভিতে বলেছেন, তারা কলেজ প্রাঙ্গনেই ঢুকেননি। অথচ টিভি প্রতিবেদনে ছবি দেখানো হলো কিভাবে পুলিশ কলেজের ভেতরে ঢুকে পিটুনি দিচ্ছে। আন্দোলনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী সেই কলেজের শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ আহত হওয়ার পর কলেজের ভেতরে তারা অ্যাম্বুলেন্সও ঢোকাতে পারেননি পুলিশি বাধার মুখে। শেষ পর্যন্ত তারা কলেজের পেছন দিক দিয়ে ভ্যান গাড়িতে করে আবুল কালাম আজাদকে সরিয়ে নিয়েছেন হাসপাতালে। কিন্তু তার আগেই আবুল কালাম আজাদ দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন পরপারে।
পুলিশি নির্যাতন চলাকালে সাংবাদিকদেরও কলেজে প্রবেশ করতে দেয়নি পুলিশ। কিন্তু কৌশলে ছবি নেওয়ার কাজটি করে নিয়েছেন সাংবাদিকরা। পুলিশ কর্মকর্তার অসত্য বক্তব্য এবং বাস্তবতা টিভি দর্শকদের হোঁচট খাইয়েছে ব্যাপক। দুই দুইটা মানুষ খুন হয়ে গেলো, কলেজের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিরাপত্তার পরিবর্তে নিরাপত্তাহীন করে তোলার কাজটি করে দিয়েছে স্বয়ং পুলিশ বিভাগ। তারপরও কিভাবে এই পুলিশের ওপর আস্থা থাকে মানুষের?
পরদিন অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য দেখা গেলো টিভিতে। শিক্ষক আবুল কালাম আজাদকে শেষবারের মতো নেওয়া হবে তার প্রিয় কর্মক্ষেত্র কলেজে। পুলিশ দেয়াল দিয়ে দিলো। কলেজে গেলো না আবুল কালাম আজাদের লাশ। জানাজা হলো না কলেজে। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশে বাধা দিয়ে পুলিশ যেমন ক্ষমতা দেখিয়েছে একটা লাশের প্রতি অমানবিক আচরণ করে মাত্রাটা আরও বাড়িয়ে দিলো। শুধু তাই নয়, ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীতে ১৪৪ ধারা জারি করল প্রশাসন। প্রশাসনের ভাষ্য শুনে মনে হয়, সান্ধ্য আইন জারি না করে যেন তারা সাধারণ মানুষকে দয়াই করেছে।

হয়রানি নির্যাতনের এমন উদাহরণ এন্তার। এইতো দিন কয়েক আগে একজন ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, তিনি আর্মি স্টেডিয়াম থেকে রাতে বাসায় ফেরার পথে কিভাবে হয়রানির শিকার হয়েছিলেন।

আমাদের পুলিশ অদক্ষ, সবাই অসততাকে লালন করেন এমন বলা যাবে না। কিন্তু যে মুহূর্তে ময়মনসিংহ কিংবা চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো ঘটনা আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হয় তখন সঙ্গত কারণেই আমাদের হোঁচট খেতে হয়। পুলিশের সিনিয়ার কর্মকর্তার মুখ থেকে যখন আইন অমান্য করার প্রকাশ্য উস্কানি আসে কিংবা মানুষ খুন হওয়ার পরও যখন বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহের চেষ্টা স্বয়ং পুলিশই করতে থাকে তখন মানুষের ভরসাস্থলটা আর থাকে কোথায়। আমরা ভুলে যাই ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই অভিযুক্ত খুনিকে সুদূর কোনও গ্রাম থেকে গ্রেফতার করতে পারে তারা। তারা আমাদের অনেকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা প্রদানেও বিশেষ ভূমিকা রাখে, সেটিও ভুলে যাই। আমাদের ভুলতে হয় বিদেশি কূটনীতিকের চুরি যাওয়া ব্যাগ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন। তারপরও এই দোলচালটা কেন? এটাতো অপ্রত্যাশিত।

অন্যদিকে বরিশালে নতুন নিয়োজিত পুলিশের ডিআইজি সাহেব বলেছেন পুলিশ আর আগের মতো নেই। বিশেষ করে পুলিশের আধুনিকায়নের প্রশ্নে তিনি এই মন্তব্য করেছেন। স্বীকার করতে হবে, আমাদের পুলিশ বাহিনীর দক্ষতা আগের চেয়ে বেড়েছে। তাদের শক্তিও বেড়েছে। সেই হিসাবে ডিআইজি শেখ মুহম্মদ মারুফ হাসানের বক্তব্য অবশ্যই মানতে হবে। কারণ তাদের পক্ষে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কূটনীতিকের চুরি হওয়া ব্যাগ উদ্ধার করার মতো কখনও কখনও দুর্ধর্ষ আসামীকেও গ্রেফতার করতে দেখা যায়। কিন্তু সবক্ষেত্রে এমন ইতিবাচক দেখা যায় না কেন পুলিশকে? প্রতিবন্ধকতা কোথায়?

নাসিরনগরে ঘৃণ্যতম ঘটনা ঘটে গেলো। পুলিশ কিছুই করল না কিংবা করতে পারল না। মানুষগুলো শুধু দেখলো ওদের বাপদাদার ভিটেয় আগুন জ্বলছে, তাদের মন্দিরে মূর্তিগুলো ভাঙচুর হচ্ছে আর তাদের জীবনের অনিশ্চয়তা শুধু বাড়ছেই। জঙ্গিপনার মন্ত্রপাঠ করে যখন মিছিলগুলো চূড়ান্ত অসভ্যতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল পুলিশ তখন মন্দিরের ভাঙা মূর্তির মতো নির্বাক হয়ে রইল।

সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন আসে পুলিশের এই নির্লিপ্ততা এবং যুদ্ধংদেহী আচরণের পেছনে নাটাইটা কোথায়। তারা দেখছে মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, জনআকাঙ্ক্ষা ভুলুণ্ঠিত হচ্ছে সেখানে তারা জনগণের পাশে না দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষ হয় কী করে?

ওপরের ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে পেছনে তাকানো যেতে পারে। অতিসম্প্রতি ঘটে যাওয়া ময়মনসিংহের দিকেই দৃষ্টি দেওয়া যায়। টেলিভিশনেই দেখা গেলো সাধারণ মানুষ সরাসরি অভিযোগ করছে স্থানীয় এমপি ও এমপিপুত্রের বিরুদ্ধে। একবারও ভাবছে না তারা প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর এক বা কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বলছে। তার পরিণতি কী হতে পারে সেই ভাবনাও তারা ভুলে গেছে। যেভাবে আবুল কালাম আজাদকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে, যেভাবে একজন পথচারীকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে এই অভিযোগের সূত্র ধরে তাকেও যে সেদিকেই চলে যেতে হতে পারে। পরিস্থিতি প্রমাণ করে- স্থানীয় মানুষ প্রকাশ্যেই ক্ষমতা ও প্রভাবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠছে।

গাইবান্ধার সাঁওতাল পল্লীর নির্যাতনের দিকে তাকালে সেখানেও একই চিত্র দেখা যাবে। স্থানীয় এমপি মহোদয় ও ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্তরা সরাসরি অভিযোগের আঙুল তোলে ধরেছে। সুতরাং সেখানেও যে ক্ষমতা আর প্রভাবের কাছে দুর্বলেরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। এটা যে ক্ষতিগ্রস্তরাই অভিযোগ করছে তা কিন্তু নয়। গণমাধ্যমে একের পর এক জনপ্রতিনিধিদের প্রত্যক্ষ ভূমিকার কথাই প্রকাশ হচ্ছে।

আর ওই যে ঝালকাঠিতে মত বিনিময় সভায় ডিআইজি সাহেব পুলিশ বাহিনীর পরিবর্তনের কথা বললেন, সেখানে কিন্তু জেনে হোক না জেনে হোক আরেকটি কথা বলে ফেলেছেন। রাষ্ট্রের নির্দেশ পালনকারী কর্মকর্তা হয়ে প্রকাশ্যেই তিনি বলে দিলেন, রাজনৈতিক নেতারা যেন আসামীদের ছাড়িয়ে নেওয়ার তদবির করতে থানায় না আসেন। সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন নলছিটি ও ঝালকাঠি পৌরসভার দুই মেয়রসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। বলাবাহুল্য এই দুইজন আবার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিও। তার মানে পুলিশ জনপ্রতিনিধিদের আচরণকে অনাকাঙ্ক্ষিত বলার সুযোগটি তাদের কাছেই জানিয়ে দিলেন। যে ক’টি বিষয় আলোচনায় এলো এর প্রতিটির পেছনেই এই জনপ্রতিনিধিদেরই নেপথ্য কোথাও আবার প্রকাশ্য ভূমিকা রয়েছে।

তাহলে কি আমরা ধরে নিতে পারি পরিবর্তিত পুলিশের সেবা না পাওয়া এবং জনগণের প্রতিপক্ষ হিসেবে এই বাহিনীকে দেখার পেছনে নাটাইটা ধরে রেখেছেন জনপ্রতিনিধিরাই? এমতাবস্থায় অভিযোগের ডালিটা কার দিকে বাড়িয়ে দেবে মানুষ?

খুব মনে পড়ছে এরশাদ আমলের কথা। এরশাদের মহাপরাক্রমশালী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্বলতার কারণে ক্ষমতার দাপট দেখাতে গিয়ে জনতার বিপক্ষে চলে গিয়েছিল। এরশাদ সরকারের মতো সাধারণ মানুষের মধ্যেও অনেকেই মনে করতে শুরু করেছিল মহাপরাক্রমশালী এরশাদ ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা যাই করুক না কেন তাকে ক্ষমতাচ্যুত করবে এমন ক্ষমতা কারও নেই। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে প্রায় সবকটি রাজনৈতিক দল একাট্টা হয়েও কিছুই করতে পারছিল না। কারণ জনগণ ওই দলগুলোকে ভালো করেই চিনে। কিন্তু ঘটনাটা ঘটলো কী? ছাত্ররা চলে এলো দৃশ্যপটে। যা কারো ভাবনায়ই ছিল না। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মতো তাদেরও একক কোনও নেতৃত্বও ছিল না। এই দল ওইদল এমনিতেই জোড়াতালি অবস্থা ছিল তাদেরও। হলোটা কি? মহাশক্তিধর সামরিক প্রেসিডেন্ট এরশাদকে লেজ গুটিয়ে ক্ষমতা ছাড়তে হলো।

তবে পরিপ্রেক্ষিতটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভয়টা ওখানেই। রাজনৈতিক সংগঠনগুলো এখন স্থবির, সরকারি দল তৃণমূলেও জনগণ থেকে ধীরে ধীরে দূরে চলে যাচ্ছে। ছাত্র রাজনীতি চোখে পড়ে না। তাহলে এই পুলিশ বাহিনী কিংবা সহযোগী বাহিনীগুলো কি পারবে ফুলবাড়ী, গোবিন্দগঞ্জ কিংবা নাসিরনগরের মতো একের পর এক ঘটনা মাধ্যমে জনগণের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজেদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে?

বিশাল একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন আমাদের সামনে চলে আসে। এই চিহ্নটা যদি শক্তিমানদের চোখে পড়ে তাহলেই মঙ্গল।

লেখক- সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ