বড় ওষুধ কাউন্সেলিং

Send
ফারহানা মান্নান
প্রকাশিত : ১৬:১৮, জানুয়ারি ০৭, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২২, জানুয়ারি ০৭, ২০১৭

ফারহানা মান্নানআমরা প্রসঙ্গক্রমে প্রায়ই বলে থাকি, ‘ওর কাউন্সেলিং দরকার’। কিন্তু সত্যিকার অর্থে কাউন্সেলিং বলতে কী বোঝায়, আর কাদের জন্য কাউন্সেলিং? আসলে যারা কাউন্সেলিং করেন তাদের আমরা কাউন্সেলর বলে থাকি। কাউন্সেলর একজন ব্যক্তির একটি নির্দিষ্ট সমস্যার প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেন এবং ওই ব্যক্তির জীবন বদলে দিতে ভূমিকা রাখেন। জীবনের এমন কোনও সমস্যা যার সমাধান খুঁজেও পাচ্ছি না, যার সমাধানের কথা ভেবে কূল-কিনারা হারিয়ে ফেলছি, যখন মনে করছি শেয়ার করলেই হয়তো ভালো লাগবে, যখন দেখছি জীবনের সমস্যা আমার ওপর প্রভাব বিস্তার করছে এবং আমি নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছি তখন আমরা সমাধানের জন্য বিশেষ ক্ষেত্রে একজন কাউন্সেলরের কথাই ভাবি।
কিন্তু অনেক সময় খুব কাছের মানুষটিও কিন্তু কাউন্সেলরের ভূমিকা পালন করতে পারেন। আবার এমন কোনও পরিচিত মানুষ আছেন, যার সঙ্গে কথা বললেই মন ভালো হয়ে যাচ্ছে; জীবনের জটিল কোনও সমস্যায় এমন সব কাছের বিশ্বস্ত মানুষের কাছে আমরা যেতেই পারি। তবে খুব ভালো হয়, যদি অভিভাবকরা নিজেরাই একজন কাউন্সেলরের ভূমিকা পালন করেন। কারণ একজন সন্তান সম্পর্কে একজন মায়ের চেয়ে আর কেউ বা ভালো জানতে পারেন!
এখন ধরুন আপনার সন্তানের বয়স ৪-৫ বছর অর্থাৎ সে প্রি-স্কুল পর্যায়ে রয়েছে। আপনার চোখে আপনার সন্তান দুষ্টের শিরোমণি লঙ্কার রাজা! সে এক জায়গায় স্থির থাকে না। খেলনা দিলেই ছুড়ে ফেলে ভেঙে ফেলে, কোনও কিছু চাওয়া মাত্রই পেতে চায়, পড়তে বসতে চায় না। এখন এ অবস্থায় আপনি কী করবেন? বিরক্ত হবেন? মনে মনে সন্তানকে অসুস্থ ভেবে কাউন্সেলিং-এর জন্য বিশেষ কারও কাছে নিয়ে যাবেন? আপনি এসব কিছুই করবেন না। আপনি প্রথমে বোঝার চেষ্টা করবেন কেন, তার আচরণ এমন হচ্ছে। আশেপাশের পরিবেশের কোন পরিস্থিতি আপনার সন্তানের আচরণ বদলে দিচ্ছে, তা নিয়ে ভাববেন। সন্তানকে নিয়ে পাশে বসবেন। সময় দেবেন। খুব আস্তে আস্তে গল্প বলে কথা বলা শুরু করবেন। গল্প দিয়ে একটা নৈতিক চরিত্র তার সামনে তুলে ধরবেন। এভাবে আস্তে আস্তে কেবল কথা বলে সময় দিয়ে আপনি আপনার সন্তানের আচরণে পরিবর্তন আনতে পারেন। আপনি রাজা বা রানির গল্পই বলতে পারেন। তাকে বোঝাতে পারেন দুষ্টের পরাজয় ও শিষ্টের জয়!

আমি ২০০৮ কি ২০০৯ সালের একটা ঘটনার কথা বলতে পারি। তখন একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াই। ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্র সব সময় দেখি ক্লাসে চুপচাপ। কখনোই ক্লাসের পড়া তৈরি করে আসে না। বকা দিলেও থাকে একেবারেই নির্বিকার! অনেক বকে এক সময় সেই ছেলেটির প্রতি মনোযোগ দেওয়া বন্ধ করে দিলাম। ওই বছরের শেষ দিকেই স্কুলে বসেই খবর পাই ছেলেটি মারা গেছে। ছেলেটির মা তাকে ও তার ছোট বোনকে নিয়ে আত্মহত্যা করেছে! খবরটা শুনে বেশ ভেঙে পড়ি। ভাবতে থাকি শিক্ষক হিসেবে চাইলে আমার সাধ্যের মধ্যে কী কী করার ছিল। আমি চাইলেই ছেলেটিকে ডেকে নিয়ে কথা বলতে পারতাম। ছেলেটির অভিভাবককে ডেকে আনতে পারতাম। কথা বললে হয়তো সমস্যার সমাধান না হলেও কারণটা জানা যেত! আসলে এ ক্ষেত্রে দেখেছি ছেলেটির জন্য বাবা অথবা মা—কেউই ভালো কাউন্সেলর হতে পারতেন না। ছেলেটিকে এ ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারতো তৃতীয় একজন ব্যক্তি। সেটা ক্লাস টিচার নিজেও হতে পারতেন। কিন্তু কথা হলো ছেলেটি কারও কাছে থেকেই কাউন্সেলিং পায়নি। কাজেই তার পরিণতি হয়েছে মৃত্যু। এ কারণেই পরিবারে সবার আগে অভিভাবক এবং স্কুলে একজন শিক্ষক কাউন্সেলরের ভূমিকা পালন করতে পারেন।

অনেক সময় দেখা যায় মা ও বাবা উভয়ই চাকরি করেন। সন্তানকে সময় দেওয়ার কেউ নেই। অনেক সময় একাকিত্বে ভুগে সন্তানের মধ্যে নানা আবেগিক সমস্যা তৈরি হয়। তখন সন্তানটি দেখা যায় স্কুলে ভালো ফল করছে না। এক সময় সে নিজের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। সে ভাবতে শুরু করে কিছু হচ্ছে না, হবে না। তার সমস্যা টিনেজ বয়সে গিয়ে তখন বড় আকার ধারণ করে। এসব ক্ষেত্রে অভিভাবকের ওপরে নির্ভর করে না থেকে স্কুলের উচিত হবে শিক্ষার্থীকে ডেকে নিয়ে একান্তে কথা বলা। স্কুলে কথা বলার এই দায়িত্বটি একজন প্রফেশনাল কাউন্সেলর পালন করলেই ভালো হয়। প্রাথমিকভাবে ক্লাস টিচারের দায়িত্ব হবে সমস্যায় জড়িত শিক্ষার্থীকে চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনে কাউন্সেলরের কাছে পাঠানো। কাজেই শিক্ষকতা পেশার দায়িত্ব হিসেবে একজন শিক্ষককে তার শিক্ষার্থীদের সমস্যা অনুসন্ধানে ভূমিকা রাখতেই হয়।

আমরা অনেক সময় মনে করি টিনেজ বয়সেই অনেক বেশি কাউন্সেলিং করতে হয় কিন্তু সেটা ঠিক নয়। একজন অভিভাবক শৈশব থেকেই সন্তানের আচরণ লক্ষ করবেন এবং স্কেফোল্ডিং, কাউন্সেলিং ও স্টিমুলেশন দেওয়ার মাধ্যমে সন্তানের সুস্থতার সঙ্গে বেড়ে ওঠায় সহযোগিতা করবেন। কারণ শৈশবের সময়টা সুন্দর না হলে, বেড়ে ওঠা স্বাভাবিক না হলে, আচরণীয় সমস্যা থাকলে গুরুত্ব দেওয়া না হলে একটু বড় হয়ে টিনেজ বয়সে সেটা জটিল হয়। কাজেই পরিবারে সবার আগে অভিভাবক এবং স্কুল পর্যায়ে একজন শিক্ষকই একটু সতর্ক হয়ে একজন কাউন্সেলরের ভূমিকা পালন করতে পারেন।

আসলে কাউন্সেলর না হয়েও এর ভূমিকা পালন করাটা খুব সহজ নয়। কারণ এজন্য খুব ভালো পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা থাকতে হবে, মনোযোগ দিয়ে এবং একইসঙ্গে গুরুত্ব দিয়ে কথা শোনার মানসিকতা থাকতে হবে, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা থাকতে হবে, কোনও কিছু পজিটিভলি দেখার মানসিকতাও থাকতে হবে। তবে কাউন্সেলিং-এর কাজটা জটিল হলেও কার্যকরী। খুব ভালো হয় যদি বাবা-মা এ কাজটা করেন।

একজন শিশু বিশেষজ্ঞের সঙ্গে একবার কথা হয়েছিল। তার নিজের দুই মেয়ে। তার ছোট মেয়ে তাকে প্রশ্ন করে, ‘মা তুমি আমাকে রেখে কাজে চলে যাও ভালো লাগে না। সবার মা স্কুল ছুটির পর নিতে আসে। তুমি আসো না!’ তখন তিনি আমাকে বলেন যে, ‘এক্ষেত্রে অনেক মা হয়তো রেগে গিয়ে একটা ধমক দিতো কিন্তু আমি শিশু বিশেষজ্ঞ বলেই সেটা করতে পারি না। আমি আমার মেয়েকে একদিন বললাম আজ আমি কাজে যাব আর তুমি আমার সঙ্গে আমার কাজে চলো। দেখবে মা কী করে। মেয়েকে আমার কাজের জায়গা হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। সেখানে গিয়ে অসুস্থ সব বাচ্চাদের দেখিয়ে বললাম, দেখো আমি সারাদিন এই বাচ্চাদের দেখি। তুমি কী মনে করো? আমি যদি তোমার সঙ্গে থাকি তাহলে ওদের দেখবে? তখন আমার মেয়ে বলল, মা আমার মনে হয় ওদেরই তোমাকে বেশি প্রয়োজন।’ তিনি আমাকে বললেন, ‘এরপর থেকে তার মেয়ে নাকি তার কাজে যাওয়া নিয়ে আর প্রশ্ন তোলেনি।’

আসলে মূল বিষয়টা হচ্ছে সন্তান লালনের ক্ষেত্রে লক্ষ করা, দেখা যে সমস্যা কোথায় হচ্ছে। এরপর বুদ্ধি করেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া উচিত। আসলে রেগে গিয়ে বা রিয়েক্ট করে সমস্যার সমাধান কখনোই হয় না! তাই কাউন্সেলিং-এর কাজটাও অত সহজ নয়! ধীর স্থির না হলে এ কাজটা অভিভাবক বলি বা শিক্ষকই বলি যে কারও পক্ষে করাটা মুশকিল। তবে ঠিক মতো করতে পারলে কাউন্সেলিং-এর ওপর সত্যি বড় কোনও ওষুধ হয় না! আর কাজে লেগে গেলে এ হয়ে যায় মহৌষধ! তবে এর সঠিক প্রয়োগ সম্পর্কে জানা চাই। বই পড়ে, ইন্টারনেটে দেখে, কোনও কাউন্সেলরের সাহায্য নিয়ে অভিভাবক ও শিক্ষক হিসেবে আপনিও হয়ে উঠতে পারেন একজন চমৎকার কাউন্সেলর! চলুন তবে বুদ্ধি করে চলি, বলি, ভাবি ও সন্তানের হয়ে ওঠি একজন কাউন্সেলররূপী মহৌষধ।

লেখক: শিক্ষা বিষয়ক গবেষক   

farhanamannanm@gmail.com

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ