নূর হোসেনরা সরকারি দলের লোক!

Send
সালেক উদ্দিন
প্রকাশিত : ১৮:৫০, জানুয়ারি ১৭, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:০৬, জানুয়ারি ১৭, ২০১৭

Salek Uddin২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাত খুনের মামলার রায় হলো ১৬ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখে। এই রায়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ ২৬ আসামিকে মৃত্যু দণ্ডাদেশ দিয়েছেন। ৭ জনকে ১০বছর এবং বাকি ২ জনকে ৭ বছর করে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন।
সরকারি দল আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নূর হোসেন তার প্রতিপক্ষ  কাউন্সিলর নজরুল ইসলামকে খুন করার জন্য  স্থানীয় র‌্যাব ১১ এর হর্তাকর্তাদের কোটি কোটি টাকা দিয়ে ভাড়া করে এবং তাদের মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৭ এপ্রিল ২০১৪ বেলা দেড়টার দিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে র‌্যাব কর্তৃক অপহৃত হন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজন। তিন দিন পর ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদীতে একে একে ভেসে ওঠে ছয়টি লাশ, পরদিন মেলে আরেকটি লাশ। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে খবর বের হলো র‌্যাব -১১-এর অধিনায়কসহ তিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার জড়িত থাকার কথা। একসঙ্গে সাতজনকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা ও গুমের নৃশংসতায় শিউরে ওঠে মানুষ। ঘটনার সঙ্গে র‌্যাবের একটি ইউনিটের প্রায় সবার জড়িত থাকার খবর সারা দেশের মানুষকে হতবাক ও উদ্বিগ্ন করে তুলে।
নূর হোসেন পালিয়ে যান ভারতে। শুরুতে অভিযুক্ত র‌্যাবের কর্মকর্তাদের গ্রেফতারে গড়িমসি করে পুলিশ। তারপর হাইকোর্টের নির্দেশে তিন কর্মকর্তাকে গ্রেফতার, তাদের নিজ নিজ বাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এরপর গতি পায় মামলার তদন্ত। একে একে বেরিয়ে আসে অপহরণ, খুন ও লাশ গুমের কাহিনী এবং নেপথ্য কারণ।
এই মামলায় দণ্ডিত ৩৫ জনের মধ্যে ২৫ জনই আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। এরা পথভ্রষ্ট ও সহজলভ্য, যাদের কিনতে মোটেই বেগ পায় না নূর হোসেনদের মতো মানুষেরা।
সাদা পোশাকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে বিরোধী দলের কর্মীদের তুলে নিয়ে গিয়ে অস্বীকার করা, এদের মধ্যে কারও আর হদিস না পাওয়া, কাউকে আবার দীর্ঘদিন পরে গ্রেফতার দেখিয়ে আইনসিদ্ধ  করা ইত্যাদি যে অভিযোগ আমাদের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের প্রতি দেশ জুড়ে রয়েছে তা এই ঘটনায় আরও পোক্ত হলো। যা সত্যিই দুঃখজনক।
এই মামলার রায়ে দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের চারিত্রিক স্খলনের চিত্রই শুধু ফুটে ওঠেনি বরং তারচেয়ে মারাত্মক যে চিত্রটি চোখের সামনে ভেসে উঠেছে তা হলো, সরকারি দলে ব্যানারে নূর হোসেনদের মতো সন্ত্রাসীদের অবাধ বিচরণ। এই নূর হোসেনকে দেখলে আমরা কী দেখতে পাই?  তিনি ১৯৮৮ সালে ট্রাক চালকের হেলপার ছিলেন। জাতীয় পার্টি যখন ক্ষমতায় তখন তিনি সেখান থেকে জাতীয় পার্টির ব্যানারে তার সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়েছেন। এরপর বিএনপি ক্ষমতায় এলে তিনি হয়ে যান বিএনপির কঠিন কর্মী। সরকারি দলের ছত্রছায়ায় তার সন্ত্রাসী বাহিনী পুনর্গঠিত হয়। ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে কাজ করে হয়ে যান বিএনপির নেতা। রাতারাতি সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হয়ে যান তিনি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগে দ্রুত যোগ দিতে ভুল করেননি নূর হোসেন। বরাবরের মতো সরকারি দলের ব্যানার ব্যাবহার করে চালিয়ে গেছেন তার সন্ত্রাসী কার্যক্রম। এভাবেই ২০০৮ সালে সংসদ নির্বাচনের পর সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হয়ে বসেন তিনি। চাঁদপুর শীতলক্ষ্যা নদী দখল করে বালু পাথরের ব্যবসা, পরিবহনে চাঁদাবাজি সহ নানা কারণে বারবার আলোচনায় আসে এই নূর হোসেন। তার বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লা থানায় হত্যা মামলা সহ ২২টি মামলা রয়েছে। রাজার মতই জীবনযাপন করছিলেন তিনি। যোগ্যতা একটাই সরকারি দল করেন ।

এই সুবিধার জন্যই নূর হোসেন কখনোই বিরোধী দলে ছিলেন না। বিরোধী দলে থেকে সন্ত্রাস করে খুব একটা সুবিধে করা যায় না। তাই তো জাতীয় পার্টি যখন সরকার গঠন করেছে তখন নূর হোসেন ছিলেন জাতীয় পার্টির কর্মী। জাতীয় পার্টিকে হটিয়ে বিএনপি যখন ক্ষমতায় তখন নূর হোসেনকে আর জাতীয় পার্টিতে খুঁজে পাওয়া যায়নি তিনি হয়ে গেছেন বিএনপির নিবেদিত সেবক। সবশেষে ওয়ান ইলেভেনের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে নূর হোসেনও আর বসে থাকেননি। তাকে আর জাতীয় পার্টি বা বিএনপির কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তিনি আওয়ামী সেনা হয়ে গেছেন। এমন ‘সোনার ছেলে’ দলে বড় প্রয়োজন সেটা ভেবে জাতীয় পার্টি এবং বিএনপির মতো আওয়ামী লীগও বুকে টেনে নিয়েছে সন্ত্রাসী নূর হোসেনকে।

আমাদের সমাজে নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মতো এমন ঘটনা বিরল নয়। নূর হোসেনই আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দিয়ে প্রথম বারের মতো এমন একটি ঘটনা ঘটিয়ে বসেছে তা মনে করারও কোনও কারণ নেই। হতে পারে একসঙ্গে এত প্রভাবশালী মানুষ সহ এত সংখ্যার মানুষ খুন হওয়ায় বিষয়টি প্রশাসন সহ সমাজের সর্বস্তরে আলোড়ন তুলতে সক্ষম হয়েছিল। অথবা খুনিদের পাপের বোঝা বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে এসেছিল যে প্রকৃতি আর সময় দিতে রাজি হয়নি। কিংবা সরকারি দলের অতি প্রভাবশালী কেউ নূর হোসেনের বোঝা আর বইতে চায়নি। তাই এই অধ্যায়ের এমন একটা পরিসমাপ্তি ঘটলো।

আবার নূর হোসেন ও তার দোসরদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলেই সমাজে সন্ত্রাস নির্মূল হয়ে যাবে, সন্ত্রাসীরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ভাড়া করে আর গুপ্তহত্যা চালাবে না, ক্রসফায়ারে বিচারবিহীন মানুষ হত্যা হবে না। এমনও মনে করার কোনও কারণ নেই। এসব নির্মূলের জন্য সমাজের ধারক বাহকদের এবার নড়েচড়ে বসার সময় এসেছে। এখন বড় বেশি প্রয়োজন হচ্ছে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন আনার।

বলতে দ্বিধা নেই দেশের ১৭ কোটি মানুষ এবং তাদের ভাগ্যের উন্নয়ন জিম্মি হয়ে আছে তুলনামূলকভাবে অনেক অনেক ছোট্ট এক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে। এই সন্ত্রাসীরা সরকার পরিবর্তন হলেই দল পরিবর্তন করে। সরকারি দলই তাদের দল। তাদের কাজই সরকারের ক্ষমতাকে ব্যবহার করে দেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানো। প্রত্যেক সরকারই কেন যেন শেষ পর্যন্ত তাদের বরণ করে নেয়। হয়তো মনে করে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্যে এরা অপরিহার্য। এই তথ্য প্রমাণের জন্য কোনও গবেষণার প্রয়োজন নেই। একটু চিন্তা করলেই হিসেব মিলে যায়।    

যে কথটি আবারও বলতে চাই তা হলো, সামাজিক ও রাজনৈতিক চিন্তাধারার আমূল পরিবর্তন আনা সম্ভব না হলে যে মাটিতে নূর হোসেনের ফাঁসির দণ্ডাদেশ কার্যকর হবে সে মাটিতেই আরেক নূর হোসেনের জন্ম হবে। নূর হোসেনরা বাড়তে থাকবে জ্যামিতিক হারে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ