স্পর্শ বলে কথা

Send
ফারহানা মান্নান
প্রকাশিত : ১৫:০৩, জানুয়ারি ২২, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:০৫, জানুয়ারি ২২, ২০১৭

ফারহানা মান্নানআমার এক গৃহ শিক্ষক ছিলেন। সে যখন ক্লাস টেনে পড়ি সে সময়কার কথা। সেই শিক্ষক গাউসিয়া মার্কেটের নাম করেছিলেন ‘গা ছোঁয়া’। স্যারের অন্যান্য বান্ধবীরা গাউসিয়া মার্কেটে যাওয়ার সময় হাতে পিন রাখতো! কেন সেটা ব্যাখ্যা করার অবশ্যই প্রয়োজন ছিল না। ক্লাস নাইনেরও আগের কথা মনে পড়ে। মা-খালাদের সঙ্গে মার্কেটে গিয়েছি। হঠাৎ এক ‘চ্যাংড়া’ মতো ছেলে সামনে থেকে বেশ জোরে ধাক্কা দিয়ে চলে যায়! খালা সঙ্গে সঙ্গে বললেন সামনে ব্যাগ দিয়ে রাখো। তো মোটামুটিভাবে শৈশব থেকে বুঝতে শুরু করেছিলাম আমি মেয়ে আর মেয়ে হলে নিজেকে নানা স্পর্শ থেকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। তখনও পর্যন্ত স্পর্শের ক্ষেত্রে ছেলেদের নানা অভিজ্ঞতার গল্পগুলো জানা হয়নি।
২০১৩-১৪ সালের দিকে মেয়েদের পাশাপাশি ছেলেদের নানাভাবে আপত্তিজনক স্পর্শের মুখোমুখি হওয়ার গল্প শুনতে শুরু করি (এর আগে অবশ্য কিছু গল্প শুনেছি তবে খুব সিরিয়াসভাবে নয়)। এ সময়টাতে ক্রাইম নিয়ে একটি অনুষ্ঠান টেলিভিশনে (কোন চ্যানেলে তা আর উল্লেখ করলাম না) প্রায় নিয়মিতই দেখতাম। একদিন একটা ঘটনা দেখানো হলো, প্রাইমারিতে পড়ুয়া একটি ছেলে ওয়াশরুমে গেছে। একই সময় তার ক্লাসের একজন পুরুষ শিক্ষকও ওয়াশরুমে গেছেন। শিক্ষক ছেলেটিকে ডেকে নিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে এবং ছেলেটিকে ঘটনাটি কারও কাছে না বলার জন্য শাসায়। ছেলেটি ভয়ে কোনও কথাই বলতে পারে না। বেশ কিছুদিন ধরে ছেলেটির বাবা-মা তাকে চুপচাপ থাকতে দেখে প্রশ্ন করে কিন্তু ছেলেটি উত্তর দেয় না। এক সময় উত্তর না পেয়ে ছেলেটিকে তার বাবা-মা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। ডাক্তার নানাভাবে প্রশ্ন করে ও পরীক্ষা করে জানতে পারেন ছেলেটির সঙ্গে জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। এরপর নানাভাবে ঘটনা প্রকাশ হয়ে যায়। ২০১৪ সালের দিকে আমি নিজে খুব কম স্যাম্পল সাইজ নিয়ে একটা ক্ষুদ্র গবেষণা চালাই। গবেষণায় দেখতে পাই মেয়েদের পাশাপাশি ছেলেরাও শৈশবে তাদের পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমেই নানা আপত্তিকর স্পর্শের মুখোমুখি হয়েছে। কাজেই আমি তখন ভাবতে শুরু করি, স্পর্শের ক্ষেত্রে একটা ছেলে ও মেয়ে উভয়কেই সাবধান হতে হয়।

আসলে কম-বেশি সকল ছেলেমেয়েকেই কিন্তু আপত্তিকর স্পর্শের সামনে পড়তে হয়। আর সেটা না চাইলেও। জুতোর দোকানে গেলেন। জুতো পড়ানোর নামে দোকানী নোংরাভাবে ছুঁয়ে দিতে পারে। বাসে উঠেছেন হয়তো ভীড়ের মধ্যে কেউ ছুঁয়ে দিল! হয়তো বাড়িতেই আছেন। আপনার পরিবারের কোনও আত্মীয় আপনার সুযোগ নিলো। এমন সব ঘটনা ঘটতেই পারে। এখন কথা হলো, পরিণত বয়সে নোংরা উদ্দেশ্যগুলো আগে থেকেই বোঝা যায় কিন্তু সমস্যা হয় শিশু, কিশোর ও বয়ঃসন্ধিকালের ছেলেমেয়েদের নিয়ে।

আমাদের দেশে এ জাতীয় বিষয়ে ছেলেমেয়েরা অভিভাবক বা শিক্ষক কারও কাছ থেকেই আনুষ্ঠানিক শিক্ষা পায় না। দেওয়া হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাবা-মা এ সব ঘটনা সম্পর্কে জানতেই পারেন না! শিশু বয়সের ছেলেমেয়েরা কোনটা খারাপ স্পর্শ আর কোনটা ভালো স্পর্শ এর মধ্যকার পার্থক্যই বুঝতে পারে না।

কিশোর বয়সে খারাপ স্পর্শ বুঝতে পারলেও প্রতিবাদের ভাষাটা জানে না। বয়ঃসন্ধিকালে প্রতিবাদ করতে চাইলেও করতে পারে না সামাজিক মানহানির ভয়ে। এখন এ অবস্থায় ছেলেমেয়েদের স্পর্শ সম্পর্কে প্রস্তুত না করে উপায় নেই।

শিশুদেরকে (মেয়ে ও ছেলে উভয়ের ক্ষেত্রেই বলছি) বোঝাতে হবে, ‘বাবা দেখো অপরিচিত কারও কাছে যাবে না। পরিচিত হলেও মুখে চুমু খেতে দেবে না। পাশে না বসে মুখোমুখি বসবে। কেউ তোমাকে অকারণ স্পর্শ করলে না বলবে’। তবে শিশুকে শুধু বললেই হবে না। স্পর্শ করে বুঝিয়ে দিতে হবে কোনটা ভালো স্পর্শ আর কোনটা খারাপ। কিশোর বয়সে ছেলেমেয়েদেরকে স্পষ্ট কথা বলার ক্ষেত্রে ভরসা দিতে হবে। তাদের মনের ভাবনাকে গুরুত্ব দিতে হবে। বোঝাতে হবে বাবা-মা ছাড়া আর কারও কোলে বসবে না। পাশে বা মুখোমুখি বসবে। কাউকে গায়ে হাত দিয়ে কথা বলার অনুমতি দেবে না। তবে তাই বলে সবাইকেই ভয় পেতে হবে এমন নয়! বোঝাতে হবে ভালো মানুষও আছেন। তবে বোঝাবেন প্রথম দেখায় ভালো ও খারাপ এই দুটোর মধ্যে পার্থক্য না বুঝলে সাবধানেই থাকতে হয়। স্পষ্ট উত্তর দিতে শেখাবেন। লজ্জা বা ভয় কাটিয়ে যে কোনও ঘটনা আপনার কাছে বলার জন্য তৈরি করবেন। বিশেষ করে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে এই জাতীয় বিষয়গুলো গল্পের ছলে বোঝাবেন বা শুনে নেবেন। আর বয়ঃসন্ধিকালের সময়টাতে শেখাবেন কী করে কনফিডেন্সের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে হয়। কী করে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি পড়লে প্রতিবাদ (আমি কিন্তু হৈ চৈ বা চিৎকার চেঁচামেচি করতে বলছি না) করতে হয়। প্রতিবাদের ভাষাও শিখিয়ে দেবেন। বিশেষ করে প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়ানোর ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সতর্ক থাকবেন। পড়ানোর জায়গা নজরের সামনে রাখবেন। বন্ধ রুমে ছেলে বা মেয়েকে টিউটরের কাছে অবশ্যই পড়াবেন না। টিউটরের কাছে পড়তে পাঠানোর ক্ষেত্রে দেখবেন গ্রুপে পড়ছে কিনা আর আবশ্যই পড়ানোর টাইম সম্পর্কে খবর রাখবেন।

মূল বিষয়টা হচ্ছে সচেতন হওয়া আর স্পর্শ সম্পর্কে যথাযথ শিক্ষা দেয়া। তবে শেখানোর ভাষাটা যেন ছেলেমেয়ের কাছে ভীতিকর হয়ে না ওঠে! আপনি আপনার কণ্ঠে, ভঙ্গিতে, ভাষার ব্যবহারে সতর্ক থাকবেন আবার একই সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যও থাকবেন। মনে রাখতে হবে আচরণের সামান্যতম সমস্যা আপনার বাচ্চার ভেতরে বরং উলটো ভীতি তৈরি করবে। কিভাবে বোঝাবেন সে ভাষাটা দরকার হলে একজন কাউন্সেলরের কাছ থেকে শিখে নিতে পারেন। তবে মনে রাখতে হবে বাচ্চা আপনার। বাচ্চার রকম আপনিই সব চাইতে ভালো বুঝবেন। কাজেই কিভাবে বললে ভালো হয় তা বরং অভিভাবক হিসেবে আপনিই ঠিক করুন।

মনে রাখবেন স্পর্শ কথা বলে। এর ভাষা আছে। বাংলা বা ইংরেজি বা অন্য কোনও ভাষা শেখানোর ক্ষেত্রে ঠিক যতখানি কৌশলী হই, স্পর্শের ভাষা শেখানোর ক্ষেত্রে ঠিক ততটাই কৌশলী হতে হবে। কাজেই সবার আগে সচেতন হোন। সন্তানকে সুস্থ শিক্ষা দিন। সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে শেখান।    

লেখক: শিক্ষা বিষয়ক গবেষক   

farhanamannanm@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ