এবার সব খুনের বিচার হোক

Send
সালেক উদ্দিন
প্রকাশিত : ১৬:০৬, জানুয়ারি ২৫, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৫২, জানুয়ারি ২৫, ২০১৭

 

Salek Uddin২০১৪ সালের এপ্রিলে নারায়ণগঞ্জ হয়ে ওঠে আতঙ্ক ও কান্নার শহর। আর ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের মানুষ বুক ভরে স্বস্তির শ্বাস নেয়। ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল একসঙ্গে সাতজনকে অপহরণের পর ঠাণ্ডা মাথায় হত্যার ঘটনায় শিউরে উঠেছিল নারায়ণগঞ্জসহ সারাদেশের মানুষ। গণমাধ্যমেও ঘটনাটি ছিল আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু।
নারায়ণগঞ্জে সেই সাত খুনের মামলায় পাঁচ বাহিনীর সাবেক ১৬ কর্মকর্তা ও সদস্যসহ ২৬ জনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন আদালত। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন নারায়ণগঞ্জের সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সরকার দলের স্থানীয় নেতা নূর হোসেন ও তার অপরাধজগতের ৯ সহযোগী।
ক্ষমতার দাপটে প্রভাবশালীদের অপরাধ বিভিন্ন সময়ে মাফ হয়ে যাওয়ার প্রচলিত ধারণা ওই দিনের আদালতের রায়ে ভুল প্রমাণিত হলো।
সরকার দলের অতি প্রভাবশালী মানুষ এবং আইন রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সাত খুনের মামলায় জড়িত থাকায় এই মামলায় তাদের কোনও না কোনোভাবে বাঁচানো হবে বলে মানুষ ধারণা করেছিল।
কিন্তু জনমতের প্রতি সরকারের সম্মানের কারণে হত্যাকাণ্ডটির সঠিক রায় হয়েছে বলে মানুষ মনে করছে।
সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা বেড়েছে অনেক। আর বেড়েছে প্রত্যাশাও। তারা আশা করছে, ৭ খুন মামলার মতো প্রভাবশালী মহল কর্তৃক সংঘটিত অন্য খুনের দৃষ্টান্তমূলক বিচার হবে। বিচার হবে নারায়ণগঞ্জের মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যা মামলার। বিচার হবে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার। চট্টগ্রামে পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যার বিচারও দেখতে পাবে দেশবাসী।
এছাড়া তারা আরও দেখতে চায় নারায়ণগঞ্জেরই আলোচিত অন্য সবখুনের বিচার। দেখতে চায় সেখানকার ব্যবসায়ী ভুলু সাহা, সংস্কৃতিকর্মী দিদারুল আলম (চঞ্চল), ব্যবসায়ী আশিক ইসলাম ও ছাত্রলীগ নেতা শহীদুল ইসলাম (মিঠু) হত্যা মামলার প্রকৃত আসামির দণ্ড। ত্বকীসহ নারায়ণগঞ্জের নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের অভিযোগ, এই পাঁচ হত্যার সঙ্গেই জেলার প্রভাবশালী ও বিতর্কিত পরিবারের কোনও না কোনও সদস্যের নাম আসায় মামলার তদন্ত ঠিকভাবে হয়নি।
নারায়ণগঞ্জের মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীকে নারায়ণগঞ্জে নিজ বাসার কাছ থেকে অপহরণ করা হয়। দুই দিন পর তার লাশ পাওয়া যায় শীতলক্ষ্যা নদীতে। উচ্চ আদালত র‌্যাবকে এই মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেন। এরপর র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হন নাসিম ওসমানের ছেলে আজমেরীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী সুলতান শওকত ওরফে ভ্রমর। ভ্রমর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেন, আজমেরীর নেতৃত্বে তার নির্যাতনকেন্দ্রে নির্মম নির্যাতন চালিয়ে ত্বকীকে খুন করা হয় এবং তার লাশ একটি ব্যাগে ভরে টয়োটো এক্স ফিল্ডার গাড়িতে তুলে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। ত্বকী হত্যার তদন্তে আজমেরী ওসমান ও তার ১০ সহযোগীর জড়িত থাকার বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে বলে ২০১৪ সালে র‌্যাবের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র থেকেও জানা গিয়েছিল। কিন্তু একপর্যায়ে তদন্ত স্থবির হয়ে যায়। আজমেরীর বাবা সরকারি দলের প্রয়াত সাংসদ নাসিম ওসমান। আর তার দুই চাচা শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমান বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের দুটি আসনের সাংসদ।
ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি বলেন, নারায়ণগঞ্জের প্রত্যেক মানুষ জানে ত্বকীকে কারা, কেন হত্যা করেছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারলে ত্বকীর খুনের আসামিদেরও প্রকৃত বিচার হওয়া সম্ভব।
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু খুন হয়েছেন ২০১৬ সালের মার্চ মাসে। কুমিল্লা সেনানিবাসের একটি জঙ্গল থেকে ২০ মার্চ রাতে তনুর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। সাধারণ অপরাধীদের পক্ষে সেনানিবাস এলাকায় ঢুকে খুন করে পালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এছাড়া তনুর পরিবার থেকে সেনাবাহিনীর দুই জন সদস্যের নাম এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে সরাসরি অভিযোগ করা হয়েছিল। আর সে জন্যই এই হত্যাকাণ্ডটিকে নিয়ে সব মহলে ব্যাপক আগ্রহ ও চাঞ্চল্য তৈরি হয়। এই হত্যার বিচার দাবিতে সারাদেশে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়। সভা হয়, সমাবেশ হয়, মিছিল হয় মানববন্ধন হয়। তারপরও শুরু থেকেই তদন্ত কাজে ঢিলাঢালা ভাব লক্ষ করা যাচ্ছিল। দুই বার ময়নাতদন্ত করতে হয়েছে। প্রথম ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন সবাইকে অবাক করে দিয়েছিল। এতে মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি, আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি, ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়নি। অনেকেই মনে করেছে কারও স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এরপর দাবির মুখে তনুর লাশ কবর থেকে তুলে দ্বিতীয় দফা ময়নাতদন্ত হলে এবং দীর্ঘ টালবাহানার পর প্রকাশিত সেই প্রতিবেদন দেখার পর ন্যায় বিচার পাওয়া যাবে বলে অধিকাংশ মানুষই আর মনে করছেন না। মনে করছেন ক্ষমতাধর কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে বাঁচানোর জন্যই এ রকমটি করা হচ্ছে। তনুর পরিবারের সদস্যরা তো সরাসরি অভিযোগ করেছেন, সেনাবাহিনীর দুই জন সদস্য তনুকে হত্যা করেছে- যা সংবাদপত্রের মাধ্যমে সবাই তাদের নামসহ জেনেছি। তারা আরও বলেছেন, সেনাবাহিনীর অনুষ্ঠানে গান না গেয়ে শ্রীমঙ্গল বেড়াতে যাওয়ায় প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে তনুকে হত্যা করা হয়েছে।
চৌকস পুলিশ কর্মকর্তা এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু গেল বছর ৫ জুন সকালে ছেলেকে স্কুল বাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় শহরের জিইসি এলাকায় গুলি ও ছুরিকাঘাতে খুন হন। পুলিশ বাহিনীতে চৌকস কর্মকর্তা হিসেবে বাবুল আক্তারের একটা ইমেজ ছিল। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সাহসিকতার জন্য তিনি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও পেয়েছিলেন। সঙ্গত কারণেই সবাই ধরে নিয়েছিল এটা জঙ্গিদের কাজ। পরে পুলিশি অভিযানে এই মামলায় যাদের গ্রেফতার করা হলো, যারা আদালতে হত্যার স্বীকারোক্তি করলো, তারা কেউ জঙ্গি নয়। তাদের কেউ কেউ পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করতো। বিষয়টি আরও ঘোলাটে হয়ে গেলো যখন এসপি বাবুল আক্তারকেই পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে গভীর রাতে বাড়ি থেকে তুলে নিলো এবং বিষয়টি নিয়ে কড়া গোপনীয়তা অবলম্বন শুরু হলো। দৈনিক পত্রিকার মাধ্যমে মানুষ জানলো পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বাবুল আক্তারকে দুটি অপশন দিয়েছেন- তাকে হয় জেলে যেতে হবে, না হয় পুলিশের চাকরিতে ইস্তফা দিতে হবে। বাবুল আক্তার দ্বিতীয় অপশন মেনে নিয়ে চাকরিতে ইস্তেফা দিয়ে এসেছেন।
ত্বকী, তনু ও মিতু তিনটি হত্যাকাণ্ডসহ আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলো নিয়ে আমার মতো অনেকেই পত্রপত্রিকায় কলাম লিখেছিলেন। সত্য উদঘাটনের দাবি তুলেছিলেন এবং প্রকৃত অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেখার বিষয়ে বিশ্বাস করতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছিলেন।
গত ৯ জুলাই ২০১৬ তারিখে বাংলা ট্রিবিউনে ‘তনু ও মিতু হত্যার মিল যেখানে’ শিরোনামের কলামে আমি উল্লেখ করেছিলাম, ‘কুমিল্লার কলেজছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনুর হত্যা আর চট্টগ্রামে পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুর হত্যার প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন হলেও এক জায়গায় অভিন্নতা লক্ষ করা যায়। তা হলো দু’টি হত্যাকাণ্ডের বিষয়েই বেশ রাখঢাক করা হচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে দু’টিই বেশ স্পর্শ কাতর। কেঁচো খুঁড়তে শাপ বের হওয়ার ভয়ে প্রশাসন তটস্থ। দু’টি হত্যারই তদন্ত ঘিরে রহস্য খোলাসা হওয়ার চেয়ে আরও জটিল হতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে কাউকে রক্ষা করার চেষ্টা চলছে’। লিখেছিলাম, ‘দুটি ক্ষেত্রেই গুঞ্জন রয়েছে অপরাধী নিশ্চয়ই এমন কেউ, যাকে রক্ষা করা জরুরি। প্রশ্ন হচ্ছে কেন অপরাধিকে রক্ষা বা আড়াল করতে হবে? সেনাবাহিনীর বা পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য এমনটি করার কথাইবা মানুষের মনে আসবে কেন? আমাদের কেন ভাবতে হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুই এক জন সদস্য অপরাধ করলে তাদের বিচারের আওতায় আনা যাবে না? কেন এতে পুরোবাহিনীর ভাবমূর্তি নষ্ট হবে?’
সেই লেখার সূত্র ধরে এখন জোরগলায় বলতে পারি, সাত খুনের মামলার রায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী র‌্যাবের ভাবমূর্তি মোটেই নষ্ট হয়নি। র‌্যাব তার অবস্থানে অবিচল রয়েছে। উপরন্তু র‌্যাবের ক‘জন অসৎ সদস্যের বহিষ্কার ও বিচারের মধ্য দিয়ে র‌্যাব শুদ্ধ হয়েছে। আরও বেশি আস্থাশীল হয়েছে।
এই মামলায় সরকার দলের কর্মীদের খুনের অপরাধকে ক্ষমা করার কোনও কৌশল গ্রহণ না করে সরকার ও সরকারি দল সম্মানিত হয়েছে। মানুষের আস্থাভাজন হয়েছে। মানুষ আশা করছে ত্বকী, তনু ও মিতুসহ আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলোরও সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হবে। প্রকৃত অপরাধীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাবে। বন্ধ হবে হত্যার সংস্কৃতি।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ