আমেরিকার প্রগতিশীলরা ভালো, বাংলাদেশেরগুলো খারাপ!

Send
বাকী বিল্লাহ
প্রকাশিত : ১৪:০৭, ফেব্রুয়ারি ০৫, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪৪, মার্চ ০৩, ২০১৮

বাকী বিল্লাহআমেরিকান প্রগতিশীলরা ভীষণ ভালো। শেতাঙ্গ খ্রিস্টান শ্রেষ্ঠত্বের ধারণার জোয়ারের মুখে তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। তারা আক্রান্ত মুসলমান এবং অন্যান্য ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। এমনকি তারা প্রতিরোধের সিম্বল হিসেবে এক হিজাবি নারীর মুখচ্ছবি তুলে এনেছে, শরণার্থীদের অধিকার ও মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছে। টেক্সাসে পুড়িয়ে দেয়া মসজিদ পুননির্মাণের জন্য মার্কিন প্রগতিশীলরা যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইহুদি এবং নাস্তিকরাও রয়েছেন-তারা দুই ঘণ্টার মধ্যে ছয় লাখ ডলারের তহবিল জোগাড় করে ফেলেছেন। পাশের দেশ ভারতের বাম-প্রগতিশীলরাও খুব ভালো। তারা হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসনের মুখে সংখ্যালঘু মুসলমানদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়িয়ে হানাহানি ও দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টাকে প্রতিরোধ করছেন। জেএনইউর বাম-প্রগতিশীল ছাত্ররা কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামীদের সমর্থন করছেন এবং কাশ্মীরের মুসলমান জনগোষ্ঠীর পর ভারত রাষ্ট্রের আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছেন। আহা! বাংলাদেশের সেক্যুলার-প্রগতিশীলরাও যদি তাদের  মতো ভালো হতেন! কিন্তু এরা একদমই ভালো না। বাংলাদেশের ৯২ শতাংশ মানুষ ইসলামের অনুসারী। কিন্তু মুসলমানদের ভাব-অনুভূতির তোয়াক্কা না করে এদেশের প্রগতিশীলরা হিন্দু-বৌদ্ধ ও অন্যান্য বিধর্মীদের অধিকার নিয়ে মেতে থাকে। কোথায় হিন্দুদের বা বৌদ্ধদের মন্দির পুড়িয়ে দেয়া হলো এদের কাজ হচ্ছে শুধু সেগুলোকে খুঁজে খুঁজে বের করে ইসলামকে অপমান করা। এরা আলেম-ওলামাদের কথাকে হেসে উড়িয়ে দেয়, মাদ্রাসা শিক্ষার বিরোধিতা করে। এরা দেশের শত্রু, বাংলাদেশি নামের কলঙ্ক। এরা সেক্যুলার নামে আসলে সেকুলাঙ্গার, প্রগতিশীলের নামে প্রগতিস্টিটিউট। এইসব হিন্দুয়ানি-নাস্তিক্যবাদীদের ঘাড় ধরে দেশ থেকে বের করে দেয়া দরকার।
ওপরের প্যারাটা পড়ে কোনও খটকা লাগলো? না, খটকা লাগার কিছু নেই। আপনি যদি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী বাংলাভাষী হন, দেখবেন এই মতগুলোই খুব সাধারণ মত হিসেবে সামনে আসছে। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই মতগুলো যারা তৈরি করে দিচ্ছেন, তারা নেহাতই আমজনতা নয়- রীতিমত পড়াশোনা জানা তাত্ত্বিক। তারা তাদের বক্তব্যের পক্ষে মার্কস-লেনিন থেকে উদ্ধৃতি দেয়, এডওয়ার্ড সাঈদের লেখার রেফারেন্স দেয়। লালন ফকির, মজনু শাহের নাম তাদের মুখের ডগাতে লেগেই থাকে। এই বিষয়ে বিস্তারিত আলাপে যাওয়ার আগে পূর্বোক্ত প্রসঙ্গটি আবারও একটু দেখে নেই।

যে আমেরিকান প্রগতিশীলরা এদেশের ইসলাম প্রভাবিত বুদ্ধিজীবী ও তাদের অনুসারীদের কাছে এই মুহূর্তে মহত্তম হিসেবে আবির্ভূত; খোদ আমেরিকাতে তাদের কিন্তু গালি দিয়ে ভুত ঝাড়ানো হচ্ছে। যেসব অনলাইন পেজগুলোতে তারা শরণার্থী ও মুসলিমদের পাশে থাকার জন্য, তাদের নানারকম সহযোগিতা দিতে আহবান জানাচ্ছেন বা যেখান থেকে তারা পুড়িয়ে দেওয়া মসজিদের জন্য তহবিল সংগ্রহ করছেন-সেসব পেজে বিপুল সংখ্যক সাদা আমেরিকান ও তাদের বলয়ভুক্ত মানুষ (যারা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছেন) গালাগালির তুবড়ি ছুটিয়ে দিচ্ছেন। তারাও এসব প্রগতিশীলদের আমেরিকার শত্রু ও কুলাঙ্গার হিসেবে অভিহিত করছেন। তাদের মতে, এরা দেশদ্রোহী কারণ তাদের কাছে সংখ্যাগরিষ্ঠ সাদা আমেরিকানদের বা হোয়াইট সুপ্রিমেসির চেয়ে অভিবাসী ও মুসলিম শরণার্থীদের স্বার্থ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে। এবার দেখে নেই, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের কী খেতাব জুটেছিল রাষ্ট্র ও সমাজের কাছ থেকে। জেএনইউ ক্যাম্পাসে বাম ছাত্রনেতাদের উদ্যোগে কাশ্মীরে ভারত রাষ্ট্রের নৃশংসতা ও আগ্রাসনের প্রতিবাদের সভা হয়েছিল। সেই সভা থেকে দেওয়া ‘আজাদী’ স্লোগানকে কেন্দ্র করে গোটা রাষ্ট্র জুড়ে তুলকালাম বেধে যায়। রাষ্ট্রযন্ত্র ও মিডিয়া জেএনইউর প্রতিবাদী ছাত্রদের দেশদ্রোহী ঘোষণা করে। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় জেএনইউ ছাত্র সংসদের সভাপতি কানহাইয়া কুমার সহ বেশ কয়েকজন ছাত্রনেতা জেল খাটেন। এর আগে থেকেই মৌলবাদী বিজেপির ছাত্র সংগঠন এবিভিপি’র সঙ্গে জেএনইউর প্রগতিশীল শিক্ষার্থীদের বিরোধ চলে আসছিলো দলিত ছাত্র রোহিত ভেমুলার মৃত্যুর প্রসঙ্গকে ঘিরে। অসম্ভব মেধাবী রোহিত ইউনিভার্সিটি অব হায়দ্রাবাদের পিএইচডির শিক্ষার্থী ছিলেন। রোহিত ভেমুলা আম্বেদকর স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সক্রিয় অ্যাকটিভিস্ট ছিলেন। তিনি সরব ছিলেন দলিতদের অধিকার রক্ষায়, সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত বিদ্বেষের বিরুদ্ধে। রোহিতের একটিভিটিকে কেন্দ্র করে বিজেপির ছাত্র সংগঠন এবিভিপির পাণ্ডারা তাকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করে এবং তার বিরুদ্ধে নানারকম মিথ্যা অভিযোগ এনে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারে কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করে। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রোহিত আত্মহত্যা করেন। ভারত জুড়ে তার সুইসাইড নোট হয়ে ওঠে হাজার হাজার দলিত ছাত্রের হৃদয়ের প্রতিধ্বনি। রোহিত এবং রোহিতের উত্তরসুরী কানহাইয়ারা মোদির ভারতে এখনও দেশদ্রোহী।

এদেশের সাঈদ পড়া বুদ্ধিজীবীগণ যারা মার্কস-লেনিন-লালন থেকেও প্রভূত উদ্ধৃতি দেন, তারা সাঈদ পড়ে কী শিখলেন? সাঈদ তার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোতে দেখালেন, টেক্সট ও দৃশ্যের রাজনীতি। একটি আধিপত্যশীল জ্ঞানকাঠামো কিভাবে অপরকে দেখে এবং অপরের ইমেজ নির্মাণ করে সেটাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। অপরের ইমেজ কিভাবে কতটুকু বানাতে হবে তার পুরোটাই নির্ধারিত হয় আধিপত্যশীল কেন্দ্রের রাজনৈতিক প্রয়োজন অনুযায়ী। পশ্চিমা দুনিয়ার প্রগতিশীল ও বিবেচক মানুষেরা আজকের আক্রান্ত মুসলমানদের কোন ইমেজে দেখছেন? অস্ত্র ব্যবসা ও যুদ্ধের রাজনীতি বা শেতাঙ্গ আধিপত্যের ঠুলি সরিয়ে সত্য উপলব্ধির জ্ঞানতত্ত্ব দাঁড়া করিয়ে দিয়েছেন সাঈদ বা চমস্কিরা। প্যালেস্টাইনি খ্রিস্টান সাঈদ তার ছোটবেলা থেকেই ইসরায়েলি আধিপত্যবাদের রাজনীতি যে বৈষম্য তৈরি করে তা দেখে বড় হয়েছেন। পরিণত বয়সে ইসরায়েলি আধিপত্যবাদ এবং পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের গাটছড়া এবং তাদের নির্মিত রাজনীতি স্বরূপকে ভেতর থেকে উন্মোচিত করতে পেরেছেন। সাঈদ যদি এই সময়ের ভারতে একজন দলিত বা মনিপুরী অথবা কাশ্মীরি হিসেবে বড় হতেন তাহলে দেখতেন- কিভাবে নব্য হিন্দুত্ববাদ ও করপোরেট পুঁজির মিশেলে মোদির আধিপত্যবাদী ভারত আম্বেদকরের বহুত্ববাদী ভারতের ধারণাকে মিথ্যে করে দিচ্ছে। সমন্বয়বাদের শিক্ষা কিভাবে ওপরতলার ভারতীয় জাতীয়তাবাদ থেকে ক্রমশ ফিকে হয়ে যাচ্ছে। এখন অনিবার্যভাবে সেই প্রশ্নটি চলে আসে যে আলোচনা দিয়ে এই প্যারা শুরু হয়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের একজন বোধসম্পন্ন মানুষের অভিজ্ঞতায় কী কী উপাদান আছে? তিনি ছোটবেলা থেকে কোন ধরনের আধিপত্য এবং বৈষম্য দেখে বড় হয়েছেন?

স্কুলে সহপাঠী হিন্দু ছাত্রটির পরিচয় সে ‘মালাউন’। (সাম্প্রতিককালে শব্দটি তুমুল আলোচিত হয়েছে একজন মন্ত্রীর মন্তব্যের কারণে। ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক আক্রমণের শিকার ব্রাহ্মনবাড়িয়ার নাসিরনগরের হিন্দুদের উদ্দেশ্য করে ‘মালাউন’ শব্দটি প্রয়োগ করেছিলেন মন্ত্রী ) পৃথিবীর অন্যান্য জায়গার নানান সংখ্যাগুরুর মতো বাংলাদেশের একজন সংখ্যাগুরু মুসলমানের পক্ষেও উপলব্ধিতে আনা কঠিন যে ‘মালাউন’ নামক শব্দটা একটা হিন্দু শিশুর মনে কী মারাত্মক হীনমন্যতা ও সংকট তৈরি করতে পারে। এই শিশুদের মধ্যে সবাই কিন্তু চক্রবর্তী বা মুখার্জী নয়-এদের অধিকাংশরাই পাল অথবা শীল কিংবা মুচির সন্তান। বংশপরম্পরায় যারা নিজেদেরকে হেয় জ্ঞান করতে শিখে এসেছে। তার একই পরিচয়ধারীরা ভারতে উঁচু বর্ণের হিন্দুর কাছে নিচু জাত, আর বাঙালি মুসলমানের কাছে সে ‘মালাউন’। কথা হচ্ছিলো অভিজ্ঞতা নিয়ে। বড় হয়ে উঠতে থাকার সঙ্গে সঙ্গে আমরা আরও কী কী অভিজ্ঞতা অর্জন করি?

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা যদি বলি- বোধপ্রাপ্তির প্রথম প্রহরে দেখি টুপি মাথায় দেওয়া এক ভণ্ড সামরিক শাসক যার মাথায় শয়তানি আর মুখে ইসলাম। অন্যদিকে ৪৭’র ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে নিজের ভিটে আকড়ে টিকে থাকা হিন্দু পরিবারের উত্তরপুরুষ মহানন্দ কাকা জমিজমা বেঁচে স্বপরিবারে দেশ ছাড়ে কোনও এক ভোর রাতে। কেন ছাড়ে তা তখন আমার শিশু মাথায় আসে না। আরেকটু বড় হয়ে খবর পাই নিরঞ্জন কাকার মেয়ে দেবযাণীকে কারা যেন উঠিয়ে নিয়ে গেছে। কয়দিন পর জানা যায়, বাগেরহাট শহরের এক নামকরা মাস্তানের সাথে দেবযানী দি’র বিয়ে হয়ে গেছে। মুসলমান বানিয়ে তার নাম দেওয়া হয়েছে রুকাইয়া। আমার জানা এই ইতিহাস অথবা অভিজ্ঞতা যাই বলি না কেন তার খুব বিশেষ কোনও তাৎপর্য নেই। কারণ পাকিস্তান আমলের কথা যদি বাদও দেই- স্বাধীন বাংলাদেশেই এরকম হাজার হাজার ঘটনা ঘটেছে। বাগেরহাট জেলার সদর উপজেলার ডেমা ইউনিয়নের খেগড়াঘাট গ্রামের যে বাড়িটিতে আমার জন্ম- একসময় সেই বাড়ির চারপাশ থেকে সন্ধ্যাবেলা কাসা আর শঙ্খের শব্দ ভেসে আসতো। তখন হারিকেন জ্বালিয়ে আমাদের পড়তে বসানো হত। অনেককাল আগের  নারকেল আর সুপারির বাগান ঘেরা সেসব নির্জন সন্ধ্যায় শঙ্খ আর কাসার মন্দ্রধ্বনিতে আমার মন কোথায় ছুটে যেত, পড়ায় মন বসত না। মাস দুয়েক আগে ওই বাড়িতে বসে কাসা-শঙ্খ দূরে থাক, একটা ঢোলের বাড়িও শুনতে পাইনি। খেগড়াঘাট গ্রামে একসময় শতকরা আশি শতাংশ মানুষ ছিল হিন্দু, এখন সামান্য কিছু পরিবার অবশিষ্ট আছে।

স্বাধীন বাংলাদেশে বাঙালি জাতীয়তাবাদ অথবা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ-এর কোনোটিই এই ভূখণ্ডের মানুষের সমন্বিত আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে পারেনি। যে চেতনা অথবা মতাদর্শের কথাই বলা হোক না কেন- তার ধ্বজ্বাধারীদের রাজনৈতিক চরিত্র বাকি সবকিছুর গতিপথ নির্ধারিত করে দিয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে এতোগুলো বছরে শাসকদের রাজনৈতিক চরিত্রই এখানকার রাষ্ট্রচরিত্র নির্মাণ করেছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের উচ্ছেদীকরণ ও তাদের জমি দখলের উৎসবে শাসক গোষ্ঠীর সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে সম্পৃক্ত থাকা কোনও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাই পিছিয়ে নেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এই পরিসংখ্যানে সবার চেয়ে এগিয়ে আছে। স্বয়ং রাষ্ট্রই বা পিছিয়ে থাকবে কেন? নানারকম উন্নয়ন প্রকল্পের নামে পাহাড়ে ও সমতলে আদিবাসী প্রান্তিক মানুষদের ক্রমাগত তাদের ভূমি ও জীবনযাপন থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান-এর বাইরে অন্যরা এখানে কেবল উচ্ছেদের পরিসংখ্যানে ডাটা হিসেবে লিপিবদ্ধ হওয়ার জন্য টিকে আছে।

এই বাস্তবের ওপর দাঁড়িয়ে আমি অ্যাডওয়ার্ড সাঈদের পাঠ নেই এবং সেই পাঠ আমার কাছে ভীষণ মূল্যবান। সাঈদের অভিজ্ঞতায় আমার প্রাইমারি স্কুলের সহপাঠী ‘মালাউন’ সাধন অথবা এই মুহূর্তে পুলিশি পাহারায় ঘেরাও হয়ে স্কুলে যেতে না পারা গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতাল শিশুটির সঙ্গে গাজায় ইসরায়েলি ট্যাংকের সামনে ইটের টুকরো হাতে দাঁড়ানো কিশোর অথবা সিরিয়ার মাথায় রক্তাক্ত ক্ষত নিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকা শিশুটি- সবকিছু মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। আমি দেখি একটু একটু করে এই রাষ্ট্রের আগ্রাসী হয়ে ওঠা, দেখি আধিপত্যবাদী রাজনৈতিক ইসলামের ঘৃণার চাষবাষ- প্রতিদিন সহস্রবার। আগে জুমার খুতবায় দূরবর্তী ‘ইহুদি-নাসারাদের’ বিরুদ্ধে বিষোদগার শুনে ততটা আতঙ্কিত হতাম না; এখন প্রতিবার শুনি হিন্দু ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের মুণ্ডুপাত। প্রতিদিন বাড়ছে অসহিষ্ণুতা। পুড়ে যাচ্ছে রামু, পুড়ে যাচ্ছে নাসিরনগর-কেবল ইসলাম অবমাননার গুজব উঠিয়ে দিলেই হলো। অথচ গত দুই বছরে কত মানুষ খুন হলো- ব্লগার, লেখক, প্রকাশক, পুরোহিত, ফাদার, বাউল সন্যাসী;  সাধারণ মুসলমানদের হয়ে কেউ একজন গলা উঁচু করে বললেন না যে এই মানুষগুলোর জানমালের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা আমাদের দায়িত্ব, এই খুনোখুনি থামাতে হবে। খুন হয়ে যাওয়ার তালিকায় মাওলানা ফারুকীর নাম আছে, মাজারের খাদেম আছে, ভিন্নমতাবলম্বী পীর আছে। আক্রান্তদের তালিকায়ে আছে শিয়া বা আহমদিয়ারা। কিন্তু মূলধারার ইসলামিক পরিসরে এদের জন্যও কোনও সহানুভূতি নেই, হাহাকার নেই।

আর এসব কথা বলতে গেলেই জ্ঞানপাপী একদল লোকরঞ্জনবাদী আমাদের ইসলাম-বিদ্বেষী তকমা দিয়ে দেবে। আমার এই লেখা থেকেই হয়ত উদ্ধৃত করে দেখিয়ে দেবে- আমি কাসা আর শাঁখের ধ্বনি শুনে মুগ্ধ হই। তার মানে প্রগতিশীলতার নামে আমি কেবল হিন্দুয়ানীর চর্চা করি। আবার ওই একই ব্যক্তি হিজাবকে প্রতিবাদের সিম্বল বানানোয় আমেরিকান প্রগতিশীলদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আমিও ভালোবাসি ইসলামের মানবিক রূপ। বাংলার মুসলমানরা ট্র্যাজেডি ভুলে গেছে, ভালোবাসা ভুলে গেছে। পথে কাঁটা বিছানো বুড়ির জন্য নবীর ভালোবাসার গল্প কেউ বলে না, কারবালার শোকগাঁথার কথা বলতে বলতে কাউকে হাহাকার করতেও শুনি না। যুদ্ধ, ঘৃণা আর জিহাদ ছাড়া আর কিছুর কথা তাদের যেন মনেই নেই।

সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সঙ্গে বাম প্রগতিশীলদের ভাষা ও সংস্কৃতির যোগাযোগের সংকট এসব প্রকৃত সত্যকে আড়ালে রেখে দিচ্ছে। এ নিয়ে আহমদ ছফা বিস্তর লিখেছেন। প্রগতিশীল রাজনীতি ও সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়েছেন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসও লিখেছেন এই বিষয়ে। তার বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘সংস্কৃতির ভাঙা সেতু’তে বাম-প্রগতিশীল কমীটির সাথে গণমানুষের যোগাযোগ বিষয়ে বিশদ আলাপ করেছেন। ঐক্য গড়ার নানারকম সাংস্কৃতিক উপাদানকে চিহ্নিত করেছেন। ছফা বা ইলিয়াসের জন্য এই আলোচনার সূত্র অনেকখানিই প্রস্তুত করে দিয়েছিলেন অধ্যাপক আহমদ শরীফ। কিন্তু আহমদ শরীফ, ছফা ও ইলিয়াসের অবর্তমানে বিরাট এক শূন্যতা তৈরি হয়। একদা ফরহাদ মজহার তাদের কাছাকাছি চিন্তা ও কাজের মধ্যে থাকলেও মাঝখানের বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে দারুণ এক গোজামিলের জন্ম দেন। তিনি শ্রেণিসংগ্রামের সাথে জিহাদকে জুড়ে দিয়ে নতুন এক চমক হাজির করেন। অথচ এখন অবধি এই পুরো সময়ে তিনি বাংলার বাউল দর্শন ও ভাব আন্দোলন প্রসঙ্গে উচ্চকিত ছিলেন। কিন্তু মরমী বাউল-ফকির দর্শনের সঙ্গে রাজনৈতিক ইসলামের প্রত্যক্ষ উপাদান জিহাদের সম্পর্কসূত্র অস্পষ্ট রেখেই ফরহাদ মজহার চমক এবং লোকরঞ্জনের পথে হাঁটা ধরেন।

সেই গোজামিলের তত্ত্ব এখন ফুলে ফলে বিকশিত হয়েছে। এক ফরহাদ মজহারের চিন্তা থেকে শত শত ফরহাদ মজহারের জন্ম হয়েছে। মধ্যপন্থী বিশ্বাসী মুসলমানরা কিছুটা টানাপোড়েনে থাকলেও এদেশের সেক্যুলার প্রগতিশীলদের কাছাকাছিই থেকেছেন সেই মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল থেকে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে তাদের চিন্তার ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ নিয়ে সমন্বয়বাদী ধারা থেকে তাদের ক্রমাগত উগ্রতার দিকে ধাবিত করছে মজহারপন্থীরা। জামাত-হেফাজতসহ অপরাপর রাজনৈতিক ইসলামী গোষ্ঠীর মধ্যে তারা আবিষ্কার করছে শ্রেণিসংগ্রাম, আর প্রগতিশীলদের বিশ্লেষণ করছে শ্রেণি শত্রু হিসেবে।

লালন, মার্কস, ইসলাম মিলিয়ে যে গোজামিল ছাড়া আর কিছুই তৈরি হয়নি তা এতোদিনে নিজেও বুঝে ফেলেছেন ফরহাদ মজহার। দার্শনিকতায় দূর্বল হলেও চিন্তা এবং লেখালেখির দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে সেই গোজামিলকে মোক্ষধামে পৌঁছাতে চাইছেন তিনি। আর তাই আমেরিকার ডানপন্থী বুদ্ধিজীবীদের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্যের পক্ষে ডানপন্থী রাজনীতির নৈতিক বৈধতা দেওয়ার সুবিধাবাদী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছেন। তিনি ও তার কিছু অনুসারীর সাথে পশ্চিমের শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদের তুলনা সবচেয়ে ভালোভাবে যায়; তারা হচ্ছেন পশ্চিমের অল-রাইটের বাংলাদেশি সংস্করণ। আওয়ামী দূঃশাসন-বিরোধী রাজনীতিকে তারা আরো বেশি ডানদিকে এবং ডানপন্থার রাজনীতিকে পুরোপুরি ইসলামপন্থার দিকে টেনে নিয়ে যেতে চান। এখন তিনি ও তার সমর্থকরা সুন্দরবন রক্ষায় জাতীয় কমিটির আন্দোলনসহ সরকারি বলয়ের বাইরে থাকা বামপন্থীদের যেকোনও আন্দোলনের বিরুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছেন ওই কারণেই। সরকারবিরোধী রাজনীতি বাম-প্রগতিশীলদের দিকে হেলে পড়ুক, সেটা তারা কোনোভাবেই হতে দিতে চাইবেন না।

অন্যদিকে মধ্যপন্থী বিশ্বাসী মুসলমানদের যে বিরাট অংশ রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত তাদের ওপর এই তত্ত্বের প্রত্যক্ষ না হলেও পরোক্ষ প্রভাব বিপুল। তারাও ক্রমাগত প্রগতিশীল রাজনীতির বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হয়ে ধর্মকে আকড়ে ধরার রাস্তা বেছে নিচ্ছে। অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে তাদের ইন্টেলেকচুয়াল রসদ জোগাচ্ছেন সরকারের খুবই ঘনিষ্ঠ একজন বুদ্ধিজীবী।

গোটা দুনিয়া নতুন করে উগ্র হয়ে উঠছে। উদার ও সমন্বয়বাদী ধ্যান ধারণার বিপরীতে ধর্ম ও জাতীয়তার মিশেলে ঘৃণার রাজনীতি বিকশিত হচ্ছে। তাকে সঙ্গ দিচ্ছে করপোরেট পুঁজি। ট্রাম্প, মোদি বা হাসিনা-কেউই তার বাইরে নয়। আর তাই আমেরিকা, ভারত বা বাংলাদেশ-সবখানেই ঘৃণার রাজনীতির বেসাতিরা কখনও জাতীয়তা, আঞ্চলিক স্বার্থ ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে ব্যবহার করে প্রগতিশীলদের ঘায়েল করতে চাইছে। এরা গোষ্ঠী স্বার্থের পক্ষে যাচ্ছে বলে আমেরিকান প্রগতিশীলদের বাহবা দিচ্ছে আবার বাংলাদেশের প্রগতিশীলদের মুণ্ডুপাত করছে। কিন্তু সবখানের উদারবাদী প্রগতিশীল ধারা যে আসলে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষিতে একই ভাষায় কথা বলছে সেই সত্যটা জনগণের কাছে উল্টো করে প্রকাশ করছে। এখন প্রগতিশীল বা সেক্যুলারদের নিজেদেরকেই দায়িত্ব নিয়ে গণমানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ব্রিজটা মেরামত করতে হবে। তাদের কাছে প্রকৃত সত্য পৌঁছে দিতে হবে। সেই কাজে বিলম্ব করার আর সুযোগ নেই।

লেখক: রাজনৈতিক কর্মী

.

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ