নারীরা কি জন্ম থেকেই লাজুক?

Send
জেসমিন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৪:৪৯, ফেব্রুয়ারি ০৭, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৫৭, ফেব্রুয়ারি ০৭, ২০১৭

জেসমিন চৌধুরীনারীর লজ্জা বিষয়ক আমার এক পোস্টে এক বন্ধু প্রশ্ন করেছে, ‘লজ্জা বলতে কী বোঝাতে চাস তুই?’ বাংলা অভিধানে এই শব্দের কোনও ব্যাখ্যা পাইনি, বরং কয়েকটি প্রতিশব্দ পেয়েছি-  কুণ্ঠা, লাজ, শরম। কিন্তু এই শব্দগুলার ব্যবহারিক অর্থ না জানলে লজ্জা বলতে বাংলায় ঠিক কী বোঝায় তা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। ইংরেজিতে ‘shyness’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘feeling nervous or timid in the company of others’ অর্থাৎ ‘অন্যের উপস্থিতিতে উৎকণ্ঠিত অথবা ভীত বোধ করা’।
এই অর্থ অনুযায়ী লজ্জা হচ্ছে ব্যক্তিত্বের একটা বৈশিষ্ট্য। কোনও কোনও মানুষ স্বভাবতই লাজুক হয়ে থাকে, তারা সহজে কারও সঙ্গে মিশতে চায় না। অপরিচিত, এমনকি পরিচিত মানুষদের সঙ্গেও কথা বলতে দ্বিধা বোধ করে। নারী বা পুরুষ যে কারও মধ্যেই এই বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। এখন কথা হচ্ছে মানুষ কেন ও কখন লজ্জা বোধ করে? লজ্জা কি জেনেটিক, লৈঙ্গিক, নাকি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কন্ডিশনিংয়ের  ফল?
বিদেশি একটি অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত ‘আর উই বর্ন শাই?’ নামক প্রবন্ধে ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির শাইনেস রিসার্চ ইন্সটিটিউটের পরিচালক, মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক বারনার্ডো জে কারডুচি এই প্রশ্নের উত্তরে দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘মোটেও না। মানুষ কিছুতেই লাজুক হয়ে জন্মাতে পারে না’।  তার এই মতকে তিনি ব্যাখ্যা করেন এভাবে, ‘লজ্জার তিনটি মূল উপাদান হচ্ছে- অতিরিক্ত আত্মসচেতনতা, অতিরিক্ত নেতিবাচক আত্মসমালোচনা, অতিরিক্ত নেতিবাচক আত্মনিবিষ্টতা। আর এই তিনটির জন্যই প্রয়োজন ‘sense of self’ অর্থাৎ আত্মসত্তার উপলব্ধির, যা শিশুর আঠারো মাস বয়সের আগে সৃষ্টিই হয় না। যেহেতু মানুষ আত্মসত্তার উপলব্ধি নিয়ে জন্মায় না, সেহেতু লজ্জা নামক অনুভূতি নিয়েও জন্মানো সম্ভব নয়’।
এই একই প্রবন্ধে তিনি বলেছেন যদিও মানুষ লাজুক হয়ে জন্মায় বলে কোনও প্রমাণ নেই, একটি গবেষণায় (জেরোম কাগান, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি) দেখা গেছে যে শতকরা পনেরো থেকে বিশ ভাগ শিশু  ‘ইনহিবিটেড টেম্পারামেন্ট’ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে যার ফলে নিজের পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রতি তারা থাকে অনেক বেশি প্রতিক্রিয়াশীল। এধরনের শিশুরা অন্য বাচ্চাদের তুলনায় বেশি লাজুক হতে পারে, কিন্তু তাদের মানসিক বিকাশের প্রতি সঠিক যত্ন নেওয়া গেলে বড় হয়েও যে তারা লাজুক হবেই এমন কোনও কথা নেই।

লজ্জা/লাজুকতা সম্পর্কিত তথ্যনির্ভর এই প্রবন্ধের কোথাও লজ্জাকে নারীর সহজাত গুণ বলে উল্লেখ করা তো দূরের কথা, ‘নারী’ শব্দটিও উল্লেখিত হয়নি। অনেকে আবার মনে করেন মানুষ ‘জিনেটিক’ কারণেও লাজুক হতে পারে, কিন্তু এটাই একমাত্র কারণ নয়, এবং জিনেটিক কারণে শুধুমাত্রে নারী লাজুক হতে পারে না। নারী এবং পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই সবগুলো প্রাকৃতিক কারণ সমানভাবে প্রযোজ্য। তাহলে কেন আমাদের দেশে বলা হয়ে থাকে ‘লজ্জা নারীর ভূষণ’?

এটা সত্য যে মেয়েরা, বিশেষ করে আমাদের দেশে, পুরুষদের তুলনায় বেশি লাজুক হয়ে থাকে। এর কারণ হচ্ছে ছোট থেকে তাদেরকে এই বিশ্বাসের সঙ্গে বড় করা হয় যে লজ্জা নারীর সৌন্দর্য এবং আকর্ষণ বাড়ায়। অনেক মেয়ে স্বভাবগত ভাবে লাজুক না হওয়া সত্ত্বেও লাজুক হওয়ার ভান করে কারণ তা না হলে তাকে পুরুষালী বলে মনে হবে, তার নারীসুলভ কমনীয়তা হ্রাস পাবে। কাজেই মেয়েদের লাজুক হওয়ার পেছনের মূল কারণটি জেনেটিক নয়, বরং জেন্ডার স্টিরিওটাইপ।
চিরদিন ‘লজ্জা নারীর ভূষণ’ কথাটা শুনতে শুনতে আমাদের দেশে একটা সাধারণ ধারণা জন্ম নিয়েছে যে, নারী প্রকৃতিগতভাবেই লাজুক। যদি তাই হতো তাহলে পৃথিবীর সব দেশের সব জাতির মেয়েরাই লাজুক হত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে আমরা বাঙালি নারীরাই বেশি লাজুক। এই বিষয়ে অনলাইন ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে দেখলাম গুগল ‘মামা’র ধারণা পুরুষরাই বেশি লাজুক। ইংরেজিতে সার্চ দিলে প্রথমেই গুগল আপনাকে লাজুক পুরুষদের কিভাবে সামলাবেন, সেই উপদেশ দেবে। কারণটা হলো, বাংলাদেশে মেয়েরা যতটা লাজুক, আরও অনেক দেশে পুরুষরাও ঠিক ততটাই লাজুক। যৌক্তিকভাবে দেখলে প্রাকৃতিক কারণে পুরুষের চেয়ে নারীর বেশি লাজুক হওয়ার কথা নয় কিছুতেই। লজ্জা নামক বিষয়টি একটি চারিত্রিক, এমনকি সাংস্কৃতিকভাবে বিকশিত একটি বৈশিষ্ট্য হতে পারে, লৈঙ্গিক নয় কিছুতেই।

আমরা বোধ হয় ইংরেজি ‘shyness’ আর ‘shame’ শব্দদু’টিকে গুলিয়ে ফেলি কারণ বাংলায় দু’টো শব্দের অর্থই হচ্ছে ‘লজ্জা’ অথচ ইংরেজিতে ‘shame’ হচ্ছে নিজের কোনও আচরণের জন্য অনুতপ্ত হওয়া যা স্বভাবজাত লাজুকতা থেকে একেবারেই আলাদা। আমাদের দেশে যখন বলা হয় ‘লজ্জা নারীর ভূষণ’, তখন মানুষের সহজাত বা স্বভাবজাত লজ্জার প্রতি নয়, বরং কিছু নির্ধারিত বিষয়ে নারীর সংকোচের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়। এই বিষয়গুলোও সমাজই স্থির করে দেয়। নারী জোরে কথা বলতে লজ্জা পাবে, নিজের প্রয়োজন ও অধিকারের জানান দিতে লজ্জা পাবে, শরীরের কিছু বিশেষ অঙ্গের কথা বলতে লজ্জা পাবে, মাসিক ঋতুস্রাবের কথা বলতে লজ্জা পাবে, যৌন নির্যাতনের কথা বলতে লজ্জা পাবে, পুরুষের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে লজ্জা পাবে, একা চলাফেরা করতে লজ্জা পাবে, নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিতে লজ্জা পাবে। এক কথায় যা কিছু নারীকে শক্তিমান বানায়, তার সবই করতে লজ্জা পাবে নারী। আমার মতে একে ঠিক লজ্জা বলেনা। ভয় বলে, আরোপিত কুন্ঠা বলে, দুর্বলতা বলে। 

আমাদের দেশ ছাড়া আর কোনও দেশে লজ্জা নামক দুর্বলতাকে এতোটা মাথায় তুলে রাখা হয় বলে আমার জানা নেই। বিলেতে লজ্জাকে খুব ভালো কোনও গুণ হিসেবে লালন করা হয় না, বরং এই স্বভাবজাত লাজুকতাকে কাটিয়ে উঠতে উৎসাহ দেওয়া হয়, কারণ লজ্জা নারী পুরুষ সবার জন্যই নানান ক্ষেত্রে সাফল্যের পথে একটা বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।  কোনও কোনও দেশে পুরুষরা নারীদের থেকে অপেক্ষাকৃতভাবে লাজুক হলেও তাদের লজ্জা বড়জোর ক্লাবে গিয়ে কোনও সুন্দরীকে নাচের প্রস্তাব দেওয়ার পথে বাধার সৃষ্টি করে, স্বাধীন জীবন যাপনের পথে নয়। তার লজ্জাকে পুঁজি করে তাকে পঙ্গু বানিয়ে রাখার চেষ্টা করে না সমাজ। 

আমার এক পুরুষবন্ধু বলছিলেন, ‘আমি কোনোকালে কোনও লাজুক মেয়ে পছন্দ করি নাই। আমার ফ্যান্টাসি যত সাহসী, ইন্ডিপেনডেন্ট মেয়েকে নিয়ে। মেয়ে হলেই লাজুক হতে হবে এমন বিষয়টা বড় রকমের ‘ছ্যাবলামো’ আর ‘ন্যাকামি’।’

আরেক পুরুষবন্ধু বলছিলেন, ‘নারীর জন্য লজ্জা বাঞ্ছনীয়’। আমি বলতে চাই শুধু নারীর জন্য নয়, সকল মানুষের জন্যই লজ্জা বাঞ্ছনীয়। অন্যের উপস্থিতিতে শঙ্কিত হওয়ার লজ্জা নয়, বরং যে কোনও ধরনের অসঙ্গত বা অমানবিক কাজ করতে লজ্জা বোধ করা উচিৎ সকল মানুষের। 

উপরে উল্লেখিত গবেষণা অনুযায়ী ‘ইনহিবিটেড টেম্পারামেন্ট’ নিয়ে জন্মাইনি আমি।  কোনোদিনই স্বভাবত লাজুক ছিলাম না, তদুপরি আমার আব্বা আমাকে ‘মেয়ে মানুষ’ না হতে উৎসাহ দেওয়ার কারণে আরোপিত লজ্জাও কখনও বোধ করিনি। তবে বড় হতে হতে কিছু বিষয়ে লজ্জা পেতে শিখেছি। কোথাও সময়মত পৌঁছাতে না পারলে লজ্জা পাই, কাউকে কথা দিয়ে রাখতে না পারলে লজ্জা পাই,  জরুরি কোনও কাজের কথা ভুলে গেলে লজ্জা পাই,  টাকা ধার চাইতে লজ্জা পাই, কাউকে ভুলে কষ্ট দিয়ে ফেললে লজ্জা পাই,  কেউ বেশি বেশি বা অনর্থক প্রশংসা করলেও লজ্জা পাই।

শুধু আমার প্রতি ঘটে যাওয়া যে কোনও অন্যায়ের কথা চিৎকার করে বলতে লজ্জা পাই না, কারণ আমি জানি এ ক্ষেত্রে লজ্জার অপর নাম ‘ভয়’। আমি ভয় পেতে চাই না- কাউকে, কিছুকে।

লেখকঃ যুক্তরাজ্য প্রবাসী শিক্ষক ও অনুবাদক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ