সংশপ্তক কিংবা স্বীয় পীড়নের গল্প

Send
ফারজানা হুসাইন
প্রকাশিত : ১৭:৪০, মার্চ ০৮, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৪১, মার্চ ০৮, ২০১৭

ফারজানা হুসাইননারী দিবসকে কেন্দ্র করে একটি পণ্যের বিজ্ঞাপন চোখে পড়ল। সুন্দর একঢাল লম্বা চুলের মেয়েটা টলমল চোখে পার্লারে এসেছে চুল কেটে ফেলতে, কারণ তার স্বামী চুলের মুঠি ধরে তাকে শারীরিক নির্যাতন করে—বিজ্ঞাপনের মূল প্রতিপাদ্য এ রকমই।
বিজ্ঞাপনটা দেখে বছর তিনেক আগের এক পার্লারের গল্প মনে পড়ে গেল। ঈদের ঠিক আগে আগে খুলনার এক পার্লারে গিয়েছি আমি আর মা। একে তো বেশ মফস্বল শহর, তার ওপর পার্লারটি কিছুটা ঘরোয়া গোছের। শহুরে কেতাদুরস্ত ভাবসাব এখনও ওই পার্লারে ঢোকেনি তেমন। পার্লারের মালিক ভদ্রমহিলার সঙ্গে আমার মায়ের সখ্যের সূত্রে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে আমরা গল্প করে চলেছি, এদিকে অন্য ভদ্রমহিলারা আসছেন, সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করাচ্ছেন, চলে যাচ্ছেন। হঠাৎ এক ভদ্রমহিলা এসে বেশ কাচুমাচু হয়ে পার্লারের মালিককে জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি যে যে কাজ করিয়েছেন, তার হিসাবের একটা রিসিট দেওয়া যাবে কিনা? রিসিটটা নিয়ে টাকা পরিশোধ না করেই ভদ্রমহিলা মূল গেটের ওপাশে অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন, আবার একটু পরেই টাকা আর রিসিট হাতে ফেরতও আসলেন। ভদ্রমহিলা চলে গেলে আমাদের মা-মেয়ের জিজ্ঞাসুদৃষ্টির সামনে পার্লারের মালিক জানালেন—এ ঘটনা তো হরহামেশাই হয়। স্বামী ভদ্রলোক গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন, স্ত্রী রিসিট দেখালেই স্বামী সেই অনুসারে টাকা দিয়ে পাঠান স্ত্রী মারফত। বিশ্বাস করে স্ত্রীর হাতে রিসিট ছাড়াই টাকা গুঁজে দেওয়া চলে না।
সেদিনের সেই ব্যাখ্যা শুনে হতাশ কণ্ঠে বলেছিলাম, কী লাভ এই সৌন্দর্যবর্ধনের যদি বিশ্বাসই না জন্মালো এ সম্পর্কে। স্বামী ভদ্রলোক হয়তো স্ত্রীর ঘষা-মাজা সুন্দর মুখশ্রী উপভোগ করবেন, কিন্তু এই সুন্দর মুখখানি কতটা বিষ বুকে লুকিয়ে রেখেছে দিনের পর দিন তার খবর কি একবারও জানতে চেয়েছেন?
ফিরে আসি সেই পণ্যটির সাম্প্রতিক বিজ্ঞাপনটিতে। এই বিজ্ঞাপনটির বিশেষত্ব কী? আদতে কিছুই না। নির্যাতিত নারী টলমল চোখে নিজের চুল কেটে ফেলছে এটা একটা নারকেল তেলের ব্র্যান্ডের নারী দিবসের বিজ্ঞাপনের জন্য বেশ চটকদার আইডিয়া হতে পারে কিন্তু এই বিজ্ঞাপন নারীকে ঘুরে দাঁড়াতে শেখায় না মোটেই। আমাদের দেশে নির্যাতনের শিকার নারী বিষ খায়, গলায় দড়ি দেয়, গায়ে আগুন লাগিয়ে নিজেকে পুড়িয়ে মারে কিন্তু ওই পাষণ্ড স্বামীর ঘর ছাড়ে না। পার্লারে যাওয়ার সামর্থ্য আছে এমন নারী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এমন নারী ঘরে পড়ে পড়ে মার খায়, স্বামীর নির্যাতনে দৃষ্টিশক্তি হারায় চিরতরে কিন্তু স্বামী-পরিত্যক্ত এই ট্যাগ নিয়ে সমাজে বাঁচতে চায় না। স্বামী চুল ধরে মারে তাই নিজের সুন্দর লম্বা চুল কেটে ফেলা নির্যাতনের প্রতিবাদ করা নয় মোটেই, বরং তা সেল্ফ হারমিং বা স্বীয় পীড়ন করা। নারী দিবসে নারীমুক্তির কথা বলা উচিত, প্রতিবাদের কথা বলা উচিত, অর্থর্নৈতিক সাবলম্বিতার কথা বলা উচিত, তাই বলে স্বীয় পীড়নের কথা বলা কতটা যুক্তিযুক্ত?

নারী সে তো গৃহলক্ষ্মী; সংসার সুখের হয় রমনীর গুণে। কিন্তু কী তার সে গুণ? সব দুঃখ যন্ত্রণা মুখ বুজে সয়ে যাওয়ার এক অদ্ভূত শক্তি?

কেন প্রতিবাদের রূপ হয় না এমন—যে স্বামী বউ পেটায় তার মাথা মুড়ে ঘোল ঢেলে উল্টো গাধার পিঠে চড়িয়ে সারা পাড়ার লোককে জানানো হচ্ছে যে নারী নির্যাতনের ফল এমনই।
মাঠ থেকে কাজ শেষে বাড়ি ফিরে ভাত না পেলে বউকে তালাক দেওয়ার বিজ্ঞাপন দেখি, কিন্তু প্রতিবাদ কেন এমন হয় না যে, স্বামী গায়ে প্রথমবার হাত তোলার সঙ্গে-সঙ্গেই স্ত্রী চিৎকার করে বলছেন—এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক।
কেন এখনও নারী দিবসে আমরা বিজ্ঞাপন বানাই মেয়েটির টলমল চোখ আর স্বীয় পীড়নের গল্প নিয়ে? আর কতদিন নারীর যন্ত্রণাকে পণ্য করে আমরা পণ্যের পসার সাজাবো, প্রচার বাড়াব? আর কত নারীদিবস পালন করলে চোখে আঙুল দিয়ে এই বিকৃতি দেখিয়ে দেওয়া যাবে সমাজকে?
২. অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে যখন পাহাড়ের ওপরে প্রায় চড়া হয়, তখনই কিছু মানুষের জীবন তার সঙ্গে ছিনিমিনি খেলে, পরাস্ত করতে চায় তাকে। তাইতো এক ধাক্কায় তাকে ফেলে দেয় ওপর থেকে একেবারে নিচে। সেই মানুষগুলো তখন কি করে? চোট নিয়ে আবারও একটু একটু করে ওপরে ওঠে। সবাই হয়তো পুরোপুরি পাহাড় চড়তে পারে না কিন্তু জিতে যাওয়া তো পাহাড় চড়ার মাঝে নয় বরং আবার শুরুর উদ্যমের মধ্যে।

এমনই একজন আমার নানু। এই মহিলার জীবন রূপকথাকে ও হার মানায় কখনও। আমার বন্ধু মহলে আমি ভীষণ একরোখা বলে পরিচিত। রোখ চেপে যাওয়া জীন এই ভদ্রমহিলার কাছ থেকেই আমার পাওয়া।
এমনিতে খুব সাধারণ তিনি। ঋজু শুকনো শরীরে সবসময় সাদামাটা শাড়ি, মাথায় ঘোমটা। স্বল্পাহারী-মৃদুভাষিণী। স্পষ্টভাষী, ভীষণ ধার্মিক কিন্তু প্রগতিপন্থী। সপ্তম শ্রেণিতেই লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে বিয়ে হয়ে গেল। বছর না ঘুরতেই প্রথম সন্তানের আগমন। ১০ বছরে ৪ ছেলেমেয়ে আর স্বামীর সামরিক চাকরির বদৌলতে খাঁটি গাওয়া ঘি দিয়ে পরোটা ভাজা—এসব এক সাদাসিদে আটপৌরে জীবনের কাহিনি হতে পারত। কিন্তু হলো কই? ৭১-এ দেশ জুড়ে গণ্ডগোল। ৪র্থ সন্তান এই আসল বলে পৃথিবীতে, তাই তিনি চলে এলেন গ্রামের বাড়িতে। আছরের আজান পড়তেই সামরিক জলপাই পোশাকে বাড়ির বারান্দায় আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ইকামত দিয়ে নামাজ শেষে বেরিয়ে গেল লোকটা—স্বামীর সঙ্গে সেই শেষ দেখা তার। পরের কয়েকমাস চারিদিকে খুব হই-হট্টগোল, লোকটার কোন খোঁজ নেই। এদিকে নিজের বাবা মুমূর্ষু প্রায়। মাত্র আঁতুড়ঘর থেকে বেরিয়ে মৃতপ্রায় বাবার পাশে বসে গুনগুনিয়ে সুর করে সুরা ইয়াসিন পড়ছেন; এরমধ্যে দেবর এসে জানালো লোকটা আর নেই। বিশ্বাস করেননি তিনি অনেকটা দিন। তাই যুদ্ধ শেষের পরের দিনগুলোতে কত-কত দুপুর সে পুকুর পাড়ে বসে থেকেছে; পুকুর পাড়ে নারকেল সুপারির গাছ; নারকেলবাগানের পরেই বিল, আর তারপরই হাটের মাঝ দিয়ে বাড়ি ফেরার রাস্তা। কোনও একদুপুরে যদি লোকটা বাড়ি ফেরে? হাট থেকে কিনে ফেরে লাল ফুলকোওয়ালা রূপসা নদীর টাটকা মাছ! রাতে বারান্দায় বসে তিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে হারিকেনের আলোয় মাছের ঝোল দিয়ে লোকটা যখন ভাত খাবে, সে তখন রান্নাঘরের বেড়ার ফাঁক দিয়ে ছোটটাকে কোলে নিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখবে। আচ্ছা, ছোট মেয়েটার গায়ের রং তো ময়লা, দেখে কিছু বলবে নাতো উনি? বড় মেয়েটার পড়া তেমন আগায়নি; খুব কি রাগ করবে দেখে? ছেলেটা বেশ ধীরস্থির কিন্ত খুব জেদি, একদম বাপের মতো। কত কত কথা না সে ভাবতো ওই পুকুর পাড়ে বসে। কিন্তু ওই ভাবনাই সার। লোকটা কখনও ফিরে আসেনি আর।

ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের দিনাজপুর বর্ডারের ওই ঘাঁটি নজরবন্দি করে রেখেছিল পাকিস্তানি সেনারা। খুব সাহসী ওই লোকটা তার সঙ্গের সৈন্যদের অস্ত্রসহ রাতের আঁধারে পালাতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু ওই রাতে নিজে পালিয়ে যায়নি কারণ আরও কিছু সৈন্য তখনও আটকা পড়েছিল তার সঙ্গে। তাদের ফেলে তাদের এতখানি বিশ্বাসের খান-ভাই নিজের কথা ভাবতে পারেন না। তাইতো, খান-ভাইয়ের ছেলেমেয়েরা কখনও একটা মাটির ঢিবিকে দেখিয়ে বলতে পারে না—এইটা আমার বাবার কবর। খান-ভাই তার ছোট মেয়েটাকে দেখেনি কোনও দিন।

অনেক রাগ-অভিমান লোকটার ওপর তার। কেন একবারও ভাবলো না তার কথা, বাচ্চাগুলোর কথা? শুধু ভাবলো কিছু সহকর্মীর কথা, তাদের ভরসার কথা আর ভাবলো স্বাধীন দেশের কথা।

তবু, স্বাধীনতা যুদ্ধের এক বীরযোদ্ধার বিধবা তিনি। ১৪-তে বিয়ে আর ২৪-এ বিধবা তিনি। গত ৪৩ বছর এই পরিচয়টাকেই আঁকড়ে ধরে আছেন।
আমি কখনও ওই দুঃসাহসী লোকটাকে দেখিনি। মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। কিন্তু এই অনিরুদ্ধ মহিলাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমার কাছে মুক্তিযুদ্ধ মানে সে, আমার কাছে স্বাধীনতা মানে সব হারিয়ে একটা বিশ্বাস নিয়ে অবিচল থাকা এই মহিলা। গেজেটে নাম ওঠা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মাতামহকে আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন এই মহিলা। ৪৩ বছর আগের শেষ হয়ে যাওয়া অস্ত্রের যুদ্ধের পর আবার গড়ার যুদ্ধ এই মহিলা একা একা করেছেন। সন্তানদের মানুষ করেছেন একা হাতে। আর্থিক চরম অনটন যেমন দেখেছেন, তেমনি চেক বইতে তার সই দিয়ে তোলা হয়েছে লাখ-লাখ টাকা; কিন্তু সেই মধ্যবিত্ত সৈনিকের জীবনাচরণ মেনে চলেছেন এখনও। মানুষকে কয়েকটি টাকার জন্য মনুষত্ব বিকিয়ে দিতে দেখেছেন, কিন্তু কখনও বিশ্বাস হারাননি মানুষের ওপর।
আমি সেই মাতামহ পুরুষ সিংহকে দেখিনি, বরং আমি এক যোদ্ধা নারীকে দেখেছি। আমি শিখেছি, নারীর অন্য নাম সংশপ্তক—যে যোদ্ধা মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও সামনে এগিয়ে যায়।

লেখক: আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ